প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

ডেমুর ব্যর্থতার কুশীলবদের মুখোশ উন্মোচিত হোক

সরকার রেলওয়েকে আধুনিক, নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও যাত্রী সেবামূলক গণপরিবহন হিসেবে গড়ে তুলতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। রেলের উন্নয়নে নেয়া হয়েছে ২০ বছর মেয়াদি মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়ন চলছে চার ধাপে। কিন্তু মহাপরিকল্পনায় এমন কিছু ঘটছে, যেগুলো ‘মহাচুরি’র পর্যায়ে পড়ে। এরই মধ্যে রেলপথ নির্মাণে সর্বাপেক্ষা বেশি নির্মাণব্যয়ের রেকর্ড গড়েছে।

ডেমুর দাম নিয়েও রেলে মতানৈক্য রয়েছে। ২০ সেট ডেমু ট্রেন কেনায় সরকারের ব্যয় হয়েছে ৬৬২ কোটি টাকা। অথচ বিষেশজ্ঞরা বলছেন, এ অর্থে ১০টি ইঞ্জিন ও ১২০টি কোচ কেনা যেত, যাতে নতুন ১০টি ট্রেন পরিচালনা করা সম্ভব। এছাড়া ডেমু ট্রেনের ইঞ্জিন ও বগি সাধারণ ট্রেনের তুলনায় অনেক হালকা ও কম টেকসই। ট্রেনগুলোয় শৌচাগারের ব্যবস্থা না থাকায় দূরপথে ভ্রমণ করতে গিয়েও যাত্রীরা সমস্যায় পড়েন।

রেলওয়ের ক্ষতির কথা বিবেচনা করে আগেই এ ট্রেন কেনার বিপক্ষে মত দিয়েছিল অপারেশন বিভাগ। অন্যদিকে রেলের এক মহাপরিচালক বলেছেন, ‘উন্নত বিশ্বে এ ট্রেন ভালো সেবা দিচ্ছে। রেলকে আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে যাত্রীদের সুবিধার জন্য এ ট্রেন চালু করা হয়েছে। রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, এ সার্ভিসের জন্য ১০টি রুট নির্ধারণ করা হয়। একটি ট্রেন লাভজনক হয়ে উঠতে পারেনি।

ডেমু ট্রেন যাত্রীদের অস্বস্তি বাড়িয়েছে। এতে ভ্রমণ করে তিক্ত অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন তারা। অথচ যাত্রীদের স্বাচ্ছন্দ্যের জন্যই এটি সংযোজন। সাধারণ মানুষ অবশ্য ডেমুকে খেলনা ট্রেন হিসেবে ধরে নিয়েছে। ট্রেনটি সামান্য ধাক্কায় ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে না। আমাদের মনে আছে, ২০১৬ সালে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার চৌমুহনী-মাইজদী রেললাইনের গনিপুর এলাকায় একটি গরুর সঙ্গে ধাক্কা লেগে লাইনচ্যুত হয়েছে যাত্রীবাহী ডেমু ট্রেন। ওই সময় এটি যে টেকসই নয়, তা সাধারণ মানুষের আলোচনায় আসে। কতবার যে ডেমু ট্রেন দুর্ঘটনায় পড়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। শেয়ার বিজের প্রতিবেদক তথ্য-উপাত্ত দিয়ে জানিয়েছেন, ২০ সেটের ১৭টি অচল, প্রকল্প ব্যয়ের ৬৫৪ কোটি টাকাই গচ্চা গেছে। নকশায় ডিজাইন ত্রুটি ও কারিগরি জটিলতায় ঘন ঘন বিকল হয় ট্রেনগুলো। বছরে ১০০ কোটি টাকা মুনাফা হবে, এ যুক্তিতে কেনা হয়েছে ডেমু ট্রেন। অথচ এখন লোকসানই বাড়ছে। ট্রেনগুলো নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়নি, মেরামতেও জালিয়াতি করা হয়েছে নানা জালিয়াতি।

ডেমু ট্রেনের আয়ুষ্কাল ২০ বছর ধরা হলেও এক বছরও ঠিকমতো চলেনি। সামনে-পেছনে দুই ইঞ্জিনবিশিষ্ট ডেমুর একটি কর্মক্ষম থাকলে আকেটি অকেজো থাকে। মেরামতেও রাষ্ট্রের অর্থের অপচয় করা হয়েছে বারবার। প্রধানমন্ত্রী ও  ডেমু ট্রেন নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ২০১৯ সালের ১৬ জুলাই জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় আর ডেমু ট্রেন না কেনার নির্দেশ দেন তিনি।

সুযোগ থাকতেও দুর্নীতি, চুরি ও অব্যবস্থাপনায় রেলওয়েকে লাভজনক করে তুলতে পারিনি আমরা। কারা নি¤œ মানের ইঞ্জিন-কোচ কেনায় জড়িত, সেই কুশীলবদের মুখোশ উন্মোচন করতে হবে। ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হয়ে থাকলে অনিয়ম ‘সরল বিশ্বাসে সংঘটিত হয়েছে’ বলা যাবে না। কোনোভাবেই যেন রাষ্ট্রের অর্থ অপচয় বা লোপাটকারী প্রশ্রয় না পায়।