দিনের খবর মত-বিশ্লেষণ

ডেলিভারিম্যানদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক ব্যবহার করা অনুচিত

মাসুমা সিদ্দিকা: সন্ধ্যা থেকে টুপটাপ বৃষ্টি পড়ছে, দীপার খুব খিচুড়ি আর আচারি মাংস খেতে ইচ্ছা করছিল। কিন্তু খিচুড়ি রান্নার সব উপকরণ বাসায় থাকলেও আচারি মাংসের নেই, আবার তার রান্না করতেও ইচ্ছা করছে না। সে ঝটপট অনলাইনে অর্ডার করে ফেলল, খিচুড়ি আর মাংস। আবার শাহেদরা আজ প্রায় ছয় মাস ধরে বাইরে যায় না। তার বাবা কলেজশিক্ষক। এখন কলেজ বন্ধ। তাই বাইরে যাওয়ার তেমন প্রয়োজনও পড়েনি তাদের। বাসায় থেকে থেকে ছেলেদের শর্টস ও গেঞ্জিগুলো অতিরিক্ত ব্যবহারে কেমন রংহীন আর মলিন হয়ে গেছে। কিন্তু এই কভিড পরিস্থিতিতে বাইরে দোকানে গিয়ে কিনতেও তার মায়ের মন সায় দিচ্ছে না। কী করবেন তিনি? হঠাৎ মনে হলো অনলাইনের দোকানগুলোর কথা। এভাবে প্রতিনিয়ত আমাদের জীবনে অনলাইনের দোকানগুলো অনেক সাহায্য করছে, আর সেই কাজগুলোকে সুচারুরূপে সম্পাদন করে ক্রেতাদের হাতে পৌঁছে দিচ্ছেন ডেলিভারিম্যানরা।

একবার এক ডেলিভারিম্যান বৃষ্টিতে ভিজে তার পার্সেলগুলোকে ডেলিভারি করে যাচ্ছিলেন। তিনি প্রাণপণে চেষ্টা করছিলেন তার পার্সেলগুলো যেন না ভেজে; নিজে বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছিলেন সেদিকে ভ্রƒক্ষেপ ছিল না ছিল তার পার্সেলগুলোকে বৃষ্টি থেকে রক্ষা করার দিকে। সারা দিন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে, রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে যিনি আমাদের প্রতিদিনকার জীবনকে কিছুটা সহজ ও আরামদায়ক করে দিচ্ছেন, তিনিই ডেলিভারিম্যান। আমাদের এই আধুনিক জীবনে যখন আমরা ছোটখাটো কেনাকাটার জন্য বা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের জন্য বাইরে বের হতে চাই না, তখন ঘরে  বসে ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন বা ট্যাবে কয়েকটা ক্লিকের মাধ্যমেই আমাদের ঘরে এসে উপস্থিত হয়ে যায় কাক্সিক্ষত পণ্যটি। আর এই কভিডকালে তো এই প্রয়োজনটা আরও তীব্র। ডেলিভারিম্যানরা দিনের পর দিন তাদের এই কাজটা করে চলেছেন হাসিমুখে, যাদের সঙ্গে অনেক ভোক্তাই হয়তো যথাযথ ব্যবহার করেন না।

আমাদের প্রতিদিনকার জীবনযাত্রা ব্যস্ত থেকে ব্যস্ততর হচ্ছে, যা পৃথিবীরই নিয়ম। কয়েক বছর আগেও আমরা ভাবতে পারতাম না রান্নাঘরে যে লবণটা শেষ হয়ে গেছে, কিংবা মাছ যা নিতে বাইরে না গিয়েই ঘরে বসেই পেয়ে যাব, কিংবা বাচ্চার একটা প্যান্ট ছোট হয়ে গেছে কিন্তু কর্মব্যস্ততার জন্য শপিংয়ে যাওয়ার সময় নেই, সেক্ষেত্রে আমরা ঘরে বসেই পণ্যগুলো পেয়ে যাব। অথচ এই আধুনিক জীবনে প্রচুর অনলাইন ব্যবসা শুরু হয়েছে আর যাতে নিয়োজিত আছেন প্রচুর নারী ও পুরুষ। অনেক মহিলা বাইরে গিয়ে কোনো কাজ করতে পারেন না, বা করার মত সময় পান না, যারা সংসারের পাশাপাশি নিজের জন্য কর্মসংস্থানেরও ব্যবস্থা করছেন এই অনলাইন প্ল্যাটফর্মে। আবার অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনার পাশাপাশি স্বাবলম্বীও হতে চাইছে। তারাও এই অনলাইন ব্যবসায় এসে নিজেদের জন্য এক বিশাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে ফেলেছেন, মেলে ধরেছেন নিজেদের প্রতিভা ও সুপ্ত বাসনাকে সবার সামনে এই অনলাইন ব্যবসায় এসে। আর তাদের সেই ব্যবসাকে আরও ফলপ্রসূ করে তুলছেন এই ডেলিভারিম্যানগুলো যারা কিনা দ্রুততম সময়ে মানুষের হাতে পণ্যগুলো পৌঁছে দিচ্ছেন। করোনাকালে আমরা যখন ঘরবন্দি জীবন কাটিয়েছি, তখন যেমন তাদের পাশে পেয়েছি, তেমনি এখনও কেউ অনেকটাই ঘরবন্দি থেকে তাদের সেবা নিয়ে যাচ্ছি। তারা যখন নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমাদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন, তখন আমাদেরও উচিত তাদের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলা। অনেক সময় আমরা হয়তো কাক্সিক্ষত প্রোডাক্টটা পাই না, যেটার বর্ণনা বা ছবি দেখে আমরা অনলাইনে অর্ডার করি, কিন্তু এতে তো এই ডেলিভারিম্যানদের কোনো দোষ থাকে না। দোষ সেই কোম্পানি বা উদ্যোক্তার, যিনি এই প্রোডাক্ট আমাদের জন্য পাঠিয়েছেন। কিন্তু অনেকেই সেটা আমলে না নিয়ে আমাদের হাতের নাগালে পাওয়া এই ডেলিভারিম্যানগুলোর সঙ্গে অনেক খারাপ ব্যবহার করি, গালমন্দ করি। কিন্তু একটু ভেবে দেখলেই বোঝা যাবে, যে পণ্যের গুণাগুণ বা অর্ডারের সঙ্গে অসামঞ্জস্যের ব্যাপারে তারা নেহাতই অসহায়।

অনেক সময় ডেলিভারিম্যানরা বারবার ক্রেতাকে ফোন দিতে থাকেন তার পছন্দের জিনিসটি নেওয়ার জন্য, কিন্তু তারা ফোন রিসিভ করেন না। হয়তো তারা কোনো কাজে আটকে পড়েন, আবার কখনওবা খামখেয়ালি করেন প্রোডাক্ট না নেওয়ার উছিলায়। আর তার ফলে এই ডেলিভারিম্যানদের কাজে অনেক অসুবিধা হয় বা তারা সঠিকভাবে দিনের ডেলিভারিগুলো দিতে পারেন না। পাশাপাশি যতগুলো ডেলিভারি দেওয়ার কথা, তাও আর পারেন না। ভোক্তার অসুবিধা থাকতেই পারে। সেক্ষেত্রে অবশ্যই আগে থেকে তাদের জানানো দরকার। আবার পছন্দের সময়ে ডেলিভারি চাইতে পারা যায়, আবার কোনো অর্ডার বাতিল করতে চাইলেও সেটা আগেই বলে দেওয়া যায়। আমাদের এই যানজটময় জীবনে রাস্তায় বের হতেই চিন্তা হয়, জ্যামে না জানি কতক্ষণ আটকে থাকতে হয়। অনেক সময় নারীরা কেনাকাটার জন্য শপিং মলে ভিড় জমান বিভিন্ন উৎসব ও অনুষ্ঠান উপলক্ষে। আর সেজন্য শপিং মলগুলোর সামনে প্রায়ই বিরাট জ্যাম লেগে যায়। আর তাই সুযোগ থাকলে অনেকেই সময় বিবেচনা করে বাড়ি থেকে বের হন। ডেলিভারিম্যানরা একসঙ্গে অনেক বাড়ি বা অফিসে ডেলিভারি করে থাকেন। আর তার ফলে সেই পরিবারের মানুষগুলোকে বাসা থেকে কম বেরুতে হয়, আর রাস্তায় ভিড়ও একটু কম হচ্ছে, যা এই যানজটময় নগরজীবনে এক বড় আশীর্বাদ।

বর্তমানে দেশে অনলাইন ব্যবসা অনেক বেড়ে গেছে। জীবনযাপনের সব প্রয়োজনীয় জিনিসই পাওয়া যায় এখানে। জামা-কাপড় থেকে শুরু করে জুতা পর্যন্ত, রান্নাঘরের তেল-লবণ থেকে শুরু করে মাছ ও দুধ পর্যন্ত, আবার ঘর সাজানোর সব শৌখিন জিনিস থেকে গাছ ও বইপত্র পর্যন্ত সবকিছুই এখন পাওয়া যায় অনলাইনে। এমন কিছুই হয়তো পাওয়া যাবে না, যা অনলাইন শপে নেই; আর তাই তো আড়ং, স্বপ্ন ও আগোরার মতো বড় দোকান অনলাইন অপশন রেখেছে। আবার দারাজ, আলিবাবা, আমাজন প্রভৃতি তো রয়েছেই।

প্রায় প্রতিটা জিনিসেরই যেমন ভালো ও মন্দ এই দুটি দিকই আছে, তেমনি এই অনলাইনে কেনাকাটার ব্যাপারেও অনেক সময় প্রতারণার কথা শোনা যায়। অনেকে ভুয়া পেজ খুলে সেখান থেকে ক্রেতাদের প্রতিনিয়ত ঠকাচ্ছেন। আবার অনেকে ছবিতে সুন্দর জিনিস দেখালেও ক্রেতাদের কাছে নি¤œমানের পণ্য পাঠাচ্ছেন। আর তাই সবকিছু যাচাই করে রিভিউ দেখেই পণ্য কেনা উচিত। কিন্তু আমাদের ভোগান্তির ক্ষেত্রেও উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপানোর মতো ডেলিভারিম্যানদের সঙ্গে অযথা অসৌজন্যমূলক ব্যবহার করা অনুচিত। যদি ক্ষেত্রবিশেষে কোনো ডেলিভারিম্যানের আচার-আচরণের ব্যাপারে আমাদের অভিযোগ থাকলে তাদের সঙ্গে হইচই করে নিরর্থক তিক্ততা না বাড়িয়ে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি বা উদ্যোক্তাকে জানানো উচিত।

আজকাল কিছুু ক্ষেত্রে নারী ডেলিভারিম্যানও আমরা দেখছি, যা অবশ্যই ইতিবাচক নারী ক্রেতার জন্য। তারা উদ্যোক্তা হওয়ার পাশাপাশি ভালো সেবা দেওয়ার জন্য নিজেরাই ডেলিভারি দিয়ে যাচ্ছেন। তাই তাদের অবশ্যই সম্মানের চোখেই দেখা উচিত সমাজের আর ১০টা পেশার মতোই। ছেলে বা মেয়ে যে-ই হোক, যারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে আমাদের কাছে পণ্য বয়ে নিয়ে আসেন, তাদের একজন সেবাদানকারীর মতো যোগ্য সম্মান করাটাই হবে প্রকৃত আধুনিকতার পরিচায়ক।

রন্ধনশিল্পী ও ফিন্যান্স লেখক

[email protected]

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..