শেষ পাতা

ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়নে পদ্মা ব্যারাজসহ ৮০ প্রকল্প প্রস্তাব

নিজস্ব প্রতিবেদক:জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত ও বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করে মানুষের জীবনমান উন্নয়নে বাংলাদেশ বদ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০ নামে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে সরকার। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) এটি প্রণয়ন করে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নে প্রাথমিকভাবে ২০৩০ সাল নাগাদ ৮০টি প্রকল্পের মাধ্যমে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে অগ্রভাবে রয়েছে পদ্মা নদীতে বাঁধ (ব্যারাজ) নির্মাণ। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তা চেয়েছে সরকার। উন্নয়ন সহযোগীরাও প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

বদ্বীপ পরিকল্পনা বিষয়ে উন্নয়ন সহযোগীদের অবহিত করতে গতকাল রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এনইসি সম্মেলন কক্ষে এক পরামর্শ সভার আয়োজন করে জিইডি। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম. এ. মান্নান। উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজি বাস্তবায়নবিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব কবির বিন আনোয়ার, উন্নয়ন সহযোগী ও সরকারের বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা।

অনুষ্ঠানে বদ্বীপ পরিকল্পনার ওপর একটি ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন জিইডির সদস্য (জ্যেষ্ঠ সচিব) ড. শামসুল আলম। তিনি জানান, পানিসম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতগুলো মোকাবিলা করাই এ পরিকল্পনার প্রধান উদ্দেশ। পরিকল্পনার আওতায় উত্তম উপায়ে পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় যেসব উদ্যোগ নেওয়া হবে তার মধ্যে রয়েছে নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করা, বন্য নিয়ন্ত্রণ, কৃষিতে সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন, ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নৌপথের উন্নয়ন, নদীর তীর রক্ষার মাধ্যমে ভূমি সুরক্ষা, নদীর স্বকীয়তা রক্ষা, নদী খনন, ভাঙনের ফলে বিলিন হওয়া ভূমি পুনরুদ্ধার ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন। এছাড়া পরিবেশ সুরক্ষা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন করা হবে। এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট ১০টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ এসব কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে।

পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নে প্রথম পর্যায়ে ২০৩০ সাল নাগাদ ৮০টি প্রকল্প বাস্তবায়নের রূপরেখা রয়েছে। এর মধ্যে ৬৫টি ভৌত প্রকল্প। আর ১৫টি প্রাতিষ্ঠানিক ও বদ্বীপ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে জ্ঞান সৃজনবিষয়ক প্রকল্প।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনামন্ত্রী এম. এ. মান্নান বলেন, ‘ডেল্টা পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আমরা সবার সাহায্য-সহযোগিতা চেয়েছি। বিশেষ করে আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত, নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার, চীন আছে, যেখান থেকে আমাদের নদ-নদীর পানি আসে, তাদের সঙ্গে আমাদের সহযোগিতা আরও বাড়াতে হবে এবং এ সহযোগিতা করে আমাদের এগোতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নে এতে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হবে। মূল কথা হলোÑএ কাজটা আমরা স্বাবলম্বীভাবে করতে চাই। টাকা ধার প্রয়োজন হবে, এতে কেউ অংশ নিতে চাইলে সানন্দে তাকে স্বাগত জানাব। আমাদের উন্নয়ন সহযোগীরা রয়েছেন, তাদের আমরা স্বাগত জানাব। কিন্তু আখেরে আমাদের নিজেদের কাজ নিজেরাই করব।’ তিনি আরও বলেন, ‘এ বদ্বীপকে রক্ষা করতে হলে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা করতে হবে, দারিদ্র্য মোকাবিলা করতে হবে। সে কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে, আস্তে আস্তে এ কাজ বাড়বে।’

২০৩০ সাল নাগাদ যেসব প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ সাধু পানির সংরক্ষণাগার সৃষ্টির লক্ষ্যে পদ্মা নদীতে বাঁধ নির্মাণ, যশোরের জলমগ্ন অঞ্চল ভবদহে উন্নতমানের ড্রেনেজ ব্যবস্থা স্থাপন, ভোলা দ্বীপে পানি ব্যবস্থাপনা অবকাঠামো স্থাপন, গড়াই ও পমুর নদীর অববাহিকায় পোল্ডারের যুগোপযোগীকরণ, উপকূলীয় এলাকার লবণাক্তা ভূমিতে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, ঢাকার আশেপাশের নদীগুলো যথাযথমানে সংরক্ষণ করাসহ মোট ৮০টি প্রকল্প পরিকল্পনার প্রথম ধাপে সন্নিবেশ করা হয়েছে।

এদিকে পরিকল্পনাটির বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন উন্নয়ন সহযোগীরা। তবে তারা নদীদূষণ ও নদী দখল রোধ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। একই সঙ্গে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নে যেসব প্রকল্প নেওয়া হবে সেগুলো বাস্তবায়নে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন তারা। বিষয়টি নিজেদের দেশের নীতিনির্ধারণী ফোরামে অন্তর্ভুক্তের বিষয়ে উদ্যোগ নেবেন বলেও জানান বিভিন্ন কূটনৈতিক মিশনের প্রতিনিধিরা।

অনুষ্ঠানে নেদারল্যান্ডস, মালয়েশিয়া, জাপান, ভারত, চীন, কুয়েত, সৌদি আরব, নরওয়ে, ডেনমার্ক, জার্মানি, সুইডেন, বেলজিয়াম, ফ্রান্স, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), বিশ্বব্যাংক, কানাডিয়ান ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট এজেন্সি (সিআইডিএ), ডিপার্টমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট (ডিএফআইডি), জার্মান ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন (জিআইজেড), ইউএনডিপি, আইএমএফ, ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

জিইডির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবছরে মোট বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার দুই লাখ দুই হাজার ৭২১ কোটি টাকা। মোট বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পের সংখ্যা এক হাজার ৫৬৪টি। এর মধ্যে ২৪৮টি প্রকল্প বদ্বীপ পরিকল্পনার সঙ্গে সম্পৃক্ত। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ২১ হাজার ৯১৯ টাকা, যা মোট এডিপির ১০ দশমিক ৮১ শতাংশ।

সর্বশেষ..