দিনের খবর প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

ঢাকায় ডাবল ডেকার ট্রেন চালাতে পারবে না রেলওয়ে

একনেক সভার নির্দেশনা

ইসমাইল আলী: আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত করা হচ্ছে রেলওয়ের ভারবাহী ক্ষমতা। এজন্য কয়েক বছর ধরে নতুন লাইন নির্মাণে ৬০ কেজির (প্রতি মিটার) লোহার পাত (রেল) ব্যবহার করা হচ্ছে, আগে যা ছিল ৪০ কেজির। এতে রেলের ভারবহন ক্ষমতা (এক্সেল লোড) অনেকটা বাড়ছে। ফলে এসব লাইনে চালানো যাবে দ্বিতল কোচ ও ওয়াগন।

যদিও ঢাকা শহরের ভেতর ডাবল ডেকার ট্রেন চালানোয় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে একনেক (জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি)। সম্প্রতি এ-সংক্রান্ত নির্দেশনা দেওয়া হয়, যদিও এটাকে ষড়যন্ত্রের অংশ বলে মনে করছেন রেলওয়ে-সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, রেলওয়েকে আবার পিছিয়ে দিতে কোনো গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে এটা করছে।

সূত্রমতে, গত ৭ জানুয়ারি একনেক সভায় সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরে ‘জরাজীর্ণ, অপ্রশস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে বিদ্যমান বেইলি সেতু এবং আরসিসি সেতু প্রতিস্থাপন (ঢাকা জোন)’ শীর্ষক প্রকল্প পাস হয়। এ সময় চার দফা নির্দেশনা দেওয়া হয় একনেক সভায়, যার কার্যবিবরণী চূড়ান্ত করা হয় ২০ জানুয়ারি।

প্রকল্পটি অনুমোদনের সময় চার দফা নির্দেশনার তিনটি ছিল সওজের জন্য। এ সময় রেলওয়ে-সম্পর্কিত একটি নির্দেশনা দেয় একনেক। এতে বলা হয়, ‘ঢাকা শহরের অভ্যন্তরে ডাবল ডেকার ট্রেন চলাচলের কোনো ব্যবস্থা রাখা যাবে না। ভবিষ্যতে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের এ ধরনের কোনো পরিকল্পনা থাকলেও ঢাকা শহরের বাইরে দিয়ে পৃথক অ্যালাইনমেন্টে তা করতে হবে।

পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সচিব বরাবর গত ২৯ জানুয়ারি একনেক শাখা-১ থেকে এ-সংক্রান্ত একটি চিঠি পাঠানো হয়, যার অনুলিপি যায় রেলপথ মন্ত্রণালয়েও।

জানতে চাইলে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মোফাজ্জেল হোসেন শেয়ার বিজকে বলেন, একনেকের সিদ্ধান্তসহ চিঠির কপি পেয়েছি। তবে সওজের সেতুর সঙ্গে রেলের ডাবল ডেকার ট্রেনের কোনো সংযোগ নেই। তাই বিষয়টি নিয়ে একনেক ও সওজের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।

এদিকে রেলওয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একনেকের নির্দেশনাটি কোনোভাবেই সওজের জরাজীর্ণ, অপ্রশস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে বিদ্যমান বেইলি সেতু ও আরসিসি সেতু প্রতিস্থাপন (ঢাকা জোন) শীর্ষক প্রকল্পের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কারণ ডাবল ডেকার ট্রেন সওজের কোনো সেতুকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে না। এছাড়া বাংলাদেশ রেলওয়ের যাত্রীবাহী ট্রেন সেবার প্রায় পুরোটাই ঢাকাকেন্দ্রিক। আর ঢাকা থেকেই বিভিন্ন রুটে সবচেয়ে বেশি যাত্রী চলাচল করে। ঈদের সময় তা কয়েকগুণ বেড়ে যায়।

তাদের মতে, ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলার মধ্যে কিছু যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল করলেও সেগুলোর যাত্রী তুলনামূলকভাবে কম। এছাড়া ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া বা ঢাকামুখী যে কোনো আন্তঃনগর ট্রেনের বড় অংশের যাত্রী বিমানবন্দর ও টঙ্গী স্টেশনে ওঠানামা করে। এজন্য প্রচুর স্ট্যান্ডিং টিকিটও বিক্রি হয়। তাই ঢাকা ছাড়া অন্য কোনো জেলায় ডাবল ডেকার ট্রেন চালানোর কোনো যুক্তি নেই। আর বাইপাস করে ঢাকার বাইরে দিয়ে ডাবল ডেকার ট্রেন চলাচল করলেও তা কখানোই লাভজনক হবে না।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ওয়ার্ক ফর বেটার বাংলাদেশ (ডব্লিউবিবি) ট্রাস্টের প্রকল্প কর্মকর্তা ও রেল গবেষক মো. আতিকুর রহমান শেয়ার বিজকে বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ডাবল ডেকার ট্রেন চালু করেছে। পার্শ^বর্তী দেশ ভারতও এক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। এতে একই ব্যয়ে দ্বিগুণ যাত্রী বহন করা যায়। ফলে রেলের আয় অনেক বেড়ে যায়। আমাদের মতো জনবহুল দেশে তাই দ্রুত ডাবল ডেকার ট্রেন চালু করা উচিত।

তিনি আরও বলেন, রেলওয়েকে পিছিয়ে দিতে নানা সময় ষড়যন্ত্র হয়েছে। এখনও তা বন্ধ নেই। তাই ঢাকার ভেতর ডাবল ডেকার ট্রেন চালাতে না পারা বা ঢাকা বাইপাস করে ডাবল ডেকার ট্রেন চালুর এ সিদ্ধান্তের কোনো ষড়যন্ত্র আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার। বিশেষত যখন রেলের উন্নয়নে সরকার অনেক বেশি আন্তরিক, তখন এ ধরনের একটি নির্দেশনা অনাকাক্সিক্ষত। তাই সরকারের উচিত এ সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে নেওয়া।

উল্লেখ্য, বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ৬০ কেজির রেল ব্যবহার করা হয়। এগুলোর এক্সেল লোড ৩০ টন। এতে তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী ও ভারী ইঞ্জিন ব্যবহার করা যায়, যা দ্বিতল ওয়াগন ও কোচ টানতে সক্ষম। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও কয়েক বছর ধরে ৬০ কেজির রেল ব্যবহার করা হচ্ছে। দেশটি এরই মধ্যে যাত্রীবহুল কিছু রুটে ডাবল ডেকার ট্রেন চালু করেছে।

এদিকে ঢাকার চারপাশে বৃত্তাকার রেলপথ চালুর পরিকল্পনা করছে রেলওয়ে। এজন্য সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে। এ রুটে ডাবল ডেকার ট্রেন চালুর সুপারিশ করেছিল সংসদীয় কমিটি। ২০১৭ সালের ২৪ এপ্রিল জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত রেলপথ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ সুপারিশ করা হয়।

এ সুপারিশের বিষয়ে স্থায়ী কমিটির সভাপতি এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী বলেন, ‘ভবিষ্যতে ঢাকায় যখন সার্কুলার ট্রেন চালু হবে, তখন যেন ডাবল ডেকার ট্রেন চালু হয়, আমরা সেই সুপারিশ করেছি।’ একই বিষয়ে কমিটির সদস্য খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘আমরা ডাবল ডেকার ট্রেন চালুর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কথা বলেছি। মন্ত্রণালয় বিষয়টি ইতিবাচকভাবে নিয়েছে।’

সূত্রমতে, ঢাকার চারপাশে প্রস্তাবিত প্রায় ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ বৃত্তাকার রেলপথটি রূপগঞ্জের তারাবো সেতু এলাকা থেকে শুরু হয়ে ইস্টার্ন বাইপাস, আবদুল্লাপুর, ডিএনডি বাঁধ, লালবাগ, বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী (প্রথম বুড়িগঙ্গা) সেতু এলাকা ও কদমতলী হয়ে আবার তারাবো গিয়ে শেষ হবে। লেভেল ক্রসিংয়ের ঝামেলা এড়াতে পুরো রেলপথটি হবে এলিভেটেড (উড়ালপথে)। আর বৃত্তাকার এ রেলপথে স্টেশন প্রস্তাব করা হয়েছে ৪০টি।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..