প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

ঢাকার ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়হীন সরকারি সংস্থাগুলো  

 

নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজধানীর বিভিন্ন সেবাদানকারী সংস্থা ও দুই সিটি করপোরেশনের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। এছাড়া ঢাকা শহরের যে মহাপরিকল্পনা রয়েছে তা সামঞ্জস্য হারিয়েছে। অথচ দেশের মোট জাতীয় আয়ের ২০ শতাংশ ঢাকার অবদান। ঢাকা থেকেই কর্মসংস্থান হয় মোট আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের ৪৪ শতাংশ। এদিকে আগামী ২০৩৫ সালের মধ্যে ঢাকার জনসংখ্যা হবে সাড়ে তিন কোটি। এ অবস্থায় ২০৩৫ সালে ঢাকার অবস্থা মাথায় নিয়ে মহাপরিকল্পনা প্রয়োজন।

গতকাল রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে বিশ্বব্যাংক আয়োজিত এক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। ‘২০৩৫ সালে আধুনিক ঢাকার জন্য উন্নয়ন বিকল্পসমূহ’ শীর্ষক এ সেমিনারের উদ্বোধনী সেশনে প্রধান অতিথি ছিলেন স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়নমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, ‘ঢাকার মহাপরিকল্পনা পুরোনো হয়ে গেছে। একে আধুনিক করা প্রয়োজন। এ নিয়ে আমরা কাজ করছি। এর জন্য উচ্চপর্যায়ের কমিটি কাজ করছে। অচিরেই ঢাকাকে কাক্সিক্ষত বাসযোগ্য সিটি হিসেবে গড়ে তুলতে পারব।

দেশের মোট জমির এক শতাংশ হলেও জিডিপিতে শহুরে জনসংখ্যার ৩৬ শতাংশ বসবাস করে ঢাকায়। ৪৪ শতাংশ আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান হয় ঢাকায়। তবে এর অনেক সমস্যা রয়েছে। সরকার ঢাকার উন্নয়নে যুগান্তকারী উদ্যোগ নিয়েছে। ঢাকাকে ২৭০ বর্গকিলোমিটার এলাকা ঢাকার সঙ্গে যুক্ত করে সম্প্রসারণ করা হয়েছে। তবে বিভিন্ন সেবাদানকারী সংস্থা ও দুই সিটি করপোরেশনের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া খুব জরুরি।’

উদ্বোধনী সেশনে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ প্রধান চিমিয়াও ফান এবং সংস্থাটির দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান অর্থনীতিবিদ মার্টিন রামা মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। এতে তারা বলেন, বাংলাদেশকে ৫০তম জন্ম বার্ষিকীতে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে হলে ঢাকা শহরের সম্প্রসারণে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। এজন্য ঢাকার পূর্বাঞ্চলকে বিস্তৃত করার সুযোগ রয়েছে। এজন্য পরিকল্পনা তৈরিতে বিশ্বব্যাংক কাজ করছে।

বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বাংলাদেশের শহুরে জনসংখ্যার ৩৬ শতাংশ ঢাকায় বাস করে। ঢাকা এখন হয়ে উঠেছে বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোর অন্যতম। কিন্তু মহানগরীর দ্রুত সম্প্রসারণের সঙ্গে ঢাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সামঞ্জস্য রাখা যায়নি। এর ফলে বসবাসে অযোগ্য পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে এবং বন্যা ও ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়েছে।

সংস্থাটির কর্তারা আরও জানান, ঢাকার বর্তমান জনসংখ্যা এখন প্রায় দুই কোটি, যা ২০৩৫ সালের মধ্যে সাড়ে তিন কোটি ছাড়াবে। আর যানজটের কারণে প্রতিদিন এ শহরে ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়। এ শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থা দিল্লি শহরের তুলনায় মাত্র অর্ধেক। এ অবস্থার উন্নয়নে পরিকল্পনা, বিনিয়োগ ও উদ্যোগ জরুরি। ঢাকার নগরায়ণ কেন্দ্র থেকে উত্তর দিকে এবং তারপর পশ্চিম দিকে সম্প্রসারিত হয়েছে জানিয়ে বিশ্বব্যাংক কর্তারা বলেন, মহানগরীর পূর্ব এলাকায় নগরায়ণ হওয়া দরকার। এ এলাকাটি এখনও গ্রামীণ রয়ে গেছে। তবে দ্রুত বিকাশ লাভের সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে বিশ্বব্যাংক রাজধানীর এই রূপান্তরে অংশ নেবে বলেও জানান বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর।

উল্লেখ্য, ২০৩৫ সালে ঢাকার অবস্থা সম্পর্কে একটি প্রতিবেদন তৈরির লক্ষ্যে স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে দিনব্যাপী এ সেমিনার আয়োজিত হয়। এতে চারটি সেশনে আলাদাভাবে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করা হয়। দ্বিতীয় পর্বে পিপিআরসির নির্বাহী পরিচালক ড. হোসেন জিল্লুর রহমানের সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হক, ঢাকা দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী, দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী শীলা দীক্ষিত প্রমুখ।

জলাবদ্ধতা নিরসন, পরিকল্পিত নগরায়ণ, ড্রেনেজ ব্যবস্থার অব্যবস্থাপনার জন্য বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ের অভাবকে দায়ী করে বক্তব্য রাখেন ঢাকার দুই মেয়র আনিসুল হক ও সাঈদ খোকন। আনিসুল হক বলেন, ঢাকার বিভিন্ন সমস্যা রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান সমস্যা হচ্ছে জলাবদ্ধতা। এখানে কোনো মাস্টার ড্রেনেজ সিস্টেম নেই। পাশাপাশি জনসংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। বিশ্বব্যাংকও রাজধানী নিয়ে সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ড শুরু করতে দেরি করেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তিনি তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি মোকাবিলার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, বিশ্বব্যাংক ২০৩৫ সালের কথা বলছে কিন্তু ২০১৭ সালের অবস্থা কী, তা নিয়েও ভাবা দরকার। এজন্য সরকারকে সম্পৃক্ত করা দরকার। সবার সঙ্গে সমন্বয়ও প্রয়োজন।

সাঈদ খোকন বলেন, ঢাকা অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে। এর ফলে যানজট, জলাবদ্ধতাসহ বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিয়েছে। তবে এখন আমরা পরিকল্পনামাফিক কাজ করছি। আশা রাখি, আমরা ঢাকার মূল সমস্যা অচিরেই সমাধান করাতে পারব। কিন্তু ওয়াশা, বিদ্যুৎসহ নানা ২৬টি সেবাদানকারী সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয় নেই। এর দায় নিতে হচ্ছে সিটি করপোরেশনকে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী বলেন, ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে সরকারের নানা পরিকল্পনা রয়েছে। সরকার হাতিরঝিল সফলভাবে করেছে। ফলে ঢাকার পূর্ব অংশের সঙ্গে পশ্চিম অংশের যোগাযোগ সহজ হয়েছে। পাশাপাশি ঢাকার চারপাশে চক্রাকার রোড তৈরি হচ্ছে। মেট্রোরেলের কাজ শুরু হয়েছে।

সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানের সঞ্চালনায় অন্য সেশনে বক্তব্য রাখেন বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ কার্যালয়ের লিড অর্থনীতিবিদ ইফফাত শরীফ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক মো. আকতার মাহমুদ, ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং ইনস্টিটিউটের পরিচালক এসএম মাহবুবুর রহমান প্রমুখ।