মত-বিশ্লেষণ

ঢাকার সিটি করপোরেশন নির্বাচন ভোক্তা-অধিকার কি প্রার্থীদের কাছে অগ্রাধিকার পাবে?

এসএম নাজের হোসাইন: বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ: নগরজীবনে বাড়িভাড়া মধ্যবিত্ত ও সীমিত আয়ের জনগোষ্ঠীর জীবনজীবিকা নির্বাহে একটি বড় সমস্যা। সরকার ‘বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১’ করলেও অদ্যাবদি তা আলোর মুখ দেখেনি। এমনকি এই আইনের বিধিমালা প্রণীত হয়নি। আইনটি কোন মন্ত্রণালয় বাস্তবায়ন করবে, তারও কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা নেই। কিন্তু বাড়ির মালিকরা তাদের ইচ্ছামতো বাড়িভাড়া বাড়িয়ে সাধারণ জনগণের জীবনযাত্রাকে অতিষ্ঠ করে তুলছেন। বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন থাকলেও কোনো বাড়ির মালিক এই আইন মানতে নারাজ। সরকার বা সিটি করপোরেশন এই আইন প্রয়োগেও তেমন আগ্রহী নয়, যার কারণে বাড়িভাড়া নগরজীবনে আর একটি বিড়ম্বনার নাম। সিটি করপোরেশন স্থানীয় সরকারের একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাড়িভাড়া নিয়ে ভাড়াটিয়া ও বাড়ির মালিকের মধ্যে কোনো জটিলতা হলে সালিশ করতে এবং এলাকা অনুযায়ী বাড়িভাড়ার একটি তালিকা তৈরি করে দিতে পারে। আবার সীমিত আয়ের ভাড়াটিয়াদের দীর্ঘমেয়াদি কিস্তির ভিত্তিতে আবাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।

ভর্তি বাণিজ্য ও সর্বজনীন শিক্ষা: মানুষ গ্রাম থেকে শহরমুখী হয় দুটি কারণে একটি কর্মসংস্থান, অন্যটি শিক্ষা। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নিজস্ব উদ্যোগে বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করলেও নগরে ব্যাঙের ছাড়ার মতো গজিয়ে উঠছে নানা ধরনের সাইনবোর্ডসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান, যাদের অধিকাংশই বাণিজ্যিক উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এবং প্রতারণার সঙ্গে জড়িত। এছাড়া বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ভর্তির ক্ষেত্রে সরকার-নির্ধারিত ভর্তি ফিসের অতিরিক্ত ফিস আদায়, ইচ্ছামতো টিউশন ফিস আদায়, টিসিতে বছরের টিউশন ফিস আদায়সহ কোচিং বাণিজ্যে নিয়োজিত থাকলেও তাদের কোনো পদক্ষেপ নেই। অন্যদিকে মানসস্মত ও সর্বজনীন শিক্ষা নিশ্চিতে সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নজরদারির অনুপস্থিতিতে এ ভোগান্তির মাত্রা দিন দিন বাড়ছে। তাই এখানে সিটি করপোরেশন নিজস্ব উদ্যোগে আরও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করতে পারে। আবার নগরীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর গুণগত মান নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসনকে নিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সর্বজনীন মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

গৃহকর নির্ধারণ: সিটি করপোরেশনগুলোর বিরুদ্ধে একটি বড় অভিযোগ অতিরিক্ত গৃহকর (হোল্ডিং ট্যাক্স) আদায়ে নৈরাজ্য। সিটি করপোরেশনের রাজস্ব বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী বাড়ি, দোকান ও স্থাপনার মালিকদের বিশাল অঙ্কের গৃহকরের নোটিস দিয়ে পরে তাদের সঙ্গে আপস রফার প্রস্তাব দেন। এ কারণে বিশাল অঙ্কের নোটিস প্রদান করা হলেও সিটি করপোরেশনের কাছে ট্যাক্সের টাকা না গিয়ে এর সিংহভাগই রাজস্ব বিভাগের কিছু কর্মকর্তার পকেটে চলে যাচ্ছে, যার কারণে রাজস্ব বিভাগের প্রতিটি চাকরিই লোভনীয় হয়ে আছে। এ অবস্থায় নগরীর সব বাড়ি ও স্থাপনার তালিকা হালনাগাদ ও ডেটাবেস করা এবং ভোগান্তি নিরসনে ত্রিপক্ষীয় গণশুনানীর আয়োজন করা প্রয়োজন।

সচল ফুটপাত ও ওয়াকওয়ে: পৃথিবীর সবকটি নগরীতে যথেষ্ট সংখ্যক পায়ে হাঁটার পথ বা ওয়াকওয়ে থাকলেও বাংলাদেশের অবস্থা তার বিপরীত। সকাল-বিকাল বা প্রয়োজনে নাগরিকরা যদি হাঁটতে পারে, তাহলে ডায়াবেটিসসহ নানা রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া সহজ হতো। সিটি করপোরেশন রাস্তা সংস্কার করার পরপরই সেগুলো হকারদের দখলে চলে যায়। যদি কোনো অংশ খালি থাকে তাহলে সেটা রিকশা ও ট্যাক্সির স্ট্যান্ড হিসেবে ব্যবহার করা হয়, অথবা দোকান দিয়ে দখল হয়ে থাকে। রাস্তা বা মার্কেটগুলোর সামনে এভাবে হকারদের অবস্থানের জন্য পুরো নগরীর সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে। মেয়র ও ক্ষমতাসীন দলের নেতারা সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য হকার এবং রিকশা বা গ্যারেজ উচ্ছেদে আগ্রহী নয়। আর এ সুযোগে একটি মহল দৈনিক চাঁদা আদায়ের বিশাল ফাঁদ তৈরি করে থাকে। হকারদের কারণে ফুটপাতে জনগণের হাঁটা অকল্পনীয়। ফুটপাত ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের টাকা উপার্জনের অন্যতম হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে, যা নগরীর সুস্থ-সুন্দর পরিবেশকে বিনষ্ট করলেও কেউ ভ্রুক্ষেপ করছে না, কারন এর পেছনে জড়িতরা অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে আছে। 

ভোক্তাদের প্রতিনিধিত্ব: নগরীতে সেবাদানকারী সংস্থায় ভোক্তাদের প্রতিনিধিত্ব না থাকা একটি বড় নাগরিক সমস্যা। আমাদের দেশে আমরা প্রায়ই লক্ষ করে থাকি রেডক্রিসেন্ট সোসাইটির আদলে সেবা সংস্থাগুলোতে ভোক্তা প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকে। সরকারি সেবাদানকারী সংস্থা, বিশেষ করে গ্যাস, ওয়াসা, বিদ্যুৎ, টিঅ্যান্ডটি, হাসপাতাল, সিডিএ, রেল, বিআরটিএ, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ সব সংস্থায় রাজনৈতিকভাবে মনোনীত প্রতিনিধি ও গ্রাহকস্বার্থ বা জনস্বার্থ রক্ষার চেয়ে নিজের আখের গোছানোই মুখ্য হয়ে ওঠে। কারণ এসব সেবা সংস্থায় বোর্ড মেম্বার ও চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পেতে কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে বলে কথা রয়েছে। সিটি করপোরেশনগুলোয় বিভিন্ন উপকমিটিতে ভোক্তাদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা বা ভোক্তা অধিকার খাতে কোনো উপকমিটিও নেই, যার কারণে ভোক্তা ও নাগরিক সংসিøষ্ট কমিটি এবং সেবদানকারী সংস্থায় এখনও সত্যিকারের ভোক্তা প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়নি।

জনঅংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ: দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় আরেকটি জটিল সমস্যা হলো শাসনব্যবস্থায় সমাজের সব শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিত্ব ও অংশগ্রহণের অভাব। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মালিক জনগণ বলা হলেও বর্তমান শাসনব্যবস্থায় সমাজের সব পর্যায়ের নাগরিকের প্রতিনিধিত্ব ও অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত; শুধু জনপ্রতিনিধি নির্বাচন বা ভোট দেওয়া ছাড়া আর কোনো ভূমিকা নেই। একজন জনপ্রতিনিধি যে কোনো সময় পদত্যাগ করতে পারেন, যদি তিনি জনস্বার্থের পরিপন্থি কাজ করে থাকেন। এজন্য সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক চর্চা আবশ্যক। এই সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক চর্চার বিষয়টি রাজনীতিতে অনুপস্থিত থাকায় সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অনিয়ম, অবজ্ঞা ও সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত মূল্যহীন হয়ে পড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে রাষ্ট্রীয় সেবাদানকারী সংস্থার ব্যবস্থাপনায়, যেখানে অনেক খাতে শুধু সরকারি কর্মকর্তারাই নীতিনির্ধারণ করে থাকেন, আবার অনেক জায়গায় সরকারি কর্মকর্তা ও ওই সেক্টরের ব্যবসায়ীরা মিলে নীতিনির্ধারণ করে থাকেন। অথচ এখানে নাগরিকদের অংশগ্রহণ বা যাদের জন্য এই সেবা সার্ভিস, তাদের কোনো প্রতিনিধিত্ব থাকে না।

ডেঙ্গু ও মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ: গতবছর ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া ঢাকাসহ পুরো দেশকে কাঁপিয়ে দিয়েছে। কত পরিবার তাদের প্রিয়জনহারা হয়েছে, তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। তবু কমেনি আশঙ্কা, তবু তৎপর হয়নি সমন্বিত নির্মূল ব্যবস্থাপনা। ডেঙ্গু ও মশা নিধনে বছরব্যাপী সমন্বিত পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। মশার উৎপত্তিস্থল ও পরিবেশ বিনষ্ট করতে হবে।

নদী, জলাভূমি, মাঠ ও উম্মুক্ত স্থান সংরক্ষণ: ঢাকার প্রাণ হিসেবে পরিচিত ১৯ খাল ছিল, যা এখন মুমূর্ষু। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, ধলেশ্বরী ও বংশী নদীর ধারায় গড়ে ওঠা এই নগরে এখন নদীর গন্ধ নেই। ঢাকাকে রক্ষা করতে হলে ঢাকার চারধারের নদী সুরক্ষায় সাহসী ও অগ্রণী হতে হবে। এখানে নতুন প্রজন্মের জন্য খেলা ও বিনোদনের মাঠ এবং নানামুখী সামাজিক-সাংস্কৃতিক আয়োজনের জন্য উম্মুক্ত স্থান একেবারেই নেই। ঢাকাকে বাঁচাতে হলে পর্যাপ্ত জলাভূমি, খাল, লেক, মাঠ ও উম্মুক্ত প্রান্তরগুলোকে পাবলিক প্লেস বা জনপরিসর হিসেবে সুরক্ষা করতে হবে।

বায়ু ও শব্দদূষণ রোধ: বিশ্বের দূষিত শহরগুলোর এক নম্বরে রয়েছে ঢাকা। শব্দদূষণেও কাহিল এই নগর। বায়ু ও শব্দদূষণের ক্ষেত্রে কঠোর আইন থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ নেই। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে যথাযথ পরিবেশ বিধিবিধান মেনে না চলা, ইটভাটা এবং কলকারখানার কালো ধোঁয়ার কারণে বায়ু দূষিত হচ্ছে। যত্রতত্র গাড়ির হর্ন, অযথা কোলাহল ও নৈরাজ্যকারী শব্দদূষণ কঠোরভাবে থামাতে হবে।

পলিথিন ও প্লাস্টিকমুক্ত নগর: ঢাকার জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ পলিথিন ও প্লাস্টিক। পলিথিনের উৎপাদন ও ব্যবহারের প্রতি নজর দেওয়া না হলে এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব নয়। যত্রতত্র এ ধরনের কারখানাগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ যেমন দরকারি, তেমনি প্লাস্টিকের ব্যবহারের অপকারিতা সম্পর্কে ব্যাপকভাবে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। একই সঙ্গে প্লাস্টিক ও পলিথিনের বিকল্প ব্যবহারও নিশ্চিত করা জরুরি।

সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও গণশুনানি: নগরে সেবাদানকারী সরকারি সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে তাদের প্রশাসনিক ও আর্থিক জবাবদিহিকে নাগরিক পরিবীক্ষণের আওতায় আনতে হবে। নাগরিক স্বার্থসাংসিøষ্ট বিষয়ে নিয়োজিত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত নাগরিক সংগঠনগুলোকে সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি নাগরিক স্বার্থসংসিøষ্ট কমিটি ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে সব ধরনের নাগরিকদের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ দান করতে হবে এবং এসব নাগরিক প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে। খাদ্যপণ্যে ভেজাল রোধ, নিরাপদ খাদ্য, গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাড়িভাড়া, হোল্ডিং ট্যাক্স, গণপরিবহন, নগর ব্যবস্থাপনা, শিল্প ও বাণিজ্য প্রভৃতি বিষয়ে নাগরিক ভোগান্তি নিরসনে গ্রাহক, সেবাদানকারী সংস্থা ও ভোক্তা প্রতিনিধি এবং প্রশাসনের সমন্বয়ে ত্রিপক্ষীয় গণশুনানির ব্যবস্থা করতে হবে। (শেষ)

ভাইস প্রেসিডেন্ট

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)

[email protected]

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..