ঢাকায় ৮২ শতাংশ বাসাভাড়া সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি

ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্সের জরিপ

নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজধানীর প্রধান সমস্যাগুলোর একটি হলো আবাসন সমস্যা। প্রতিবছর ঢাকা মহানগরীতে এক লাখ ২০ হাজার নতুন বাসা বা ফ্ল্যাটের দরকার হলেও গড়ে উঠছে মাত্র ২৫ হাজার। এছাড়া ঢাকার ৬৮ শতাংশ বাসিন্দাই ভাড়া বাসায় থাকে। তবে ভাড়াটিয়ার মধ্যে ৮২ শতাংশই মনে করে ঢাকায় বাসাভাড়া সহনীয় মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি।

রাজধানীর আবাসন চিত্র নিয়ে বেসরকারি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে। ‘স্টেট অব সিটিজ: হাউজিং ইন ঢাকা’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনটি গতকাল রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, বিআইজিডি তাদের নিজস্ব জরিপ ছাড়াও সরকার, জাতিসংঘ, এনজিও ও রাজউকের গবেষণা থেকে সহায়তা নেওয়া হয়েছে।

গবেষণা প্রতিবেদনে রাজধানীতে বাসস্থানের পর্যাপ্ততা, নগরবাসীর সামর্থ্য, বাসস্থানে মৌলিক সেবাগুলোর মান এবং দুর্যোগ প্রস্তুতি, ভাড়াটেদের নিরাপত্তা পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আবাসন খাতের শাসনব্যবস্থার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন গবেষণা প্রকল্পটির প্রধান সৈয়দা সেলিনা আজিজ। এতে বাসস্থানের চাহিদা ও সরবরাহের ক্রমবর্ধমান ব্যবধান ও উচ্চমূল্য, ইমারত নির্মাণ বিধি লঙ্ঘন, ভাড়াটেদের নিরাপত্তাহীনতা, ভূমি ব্যবহার ও ভবন নির্মাণের অনুমতি পাওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্যসহ এ খাতের নীতি ও বিধির বিভিন্ন খেলাপ এবং প্রাসঙ্গিক অন্যান্য বিষয়ের বিশ্লেষণ ও সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। এ সময় স্বাগত বক্তব্য দেন বিআইজিডি’র নির্বাহী পরিচালক ড. সুলতান হাফিজ রহমান।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকায় ৬৮ শতাংশ জনগোষ্ঠী ভাড়া বাসায় থাকে। এদের মধ্যে ৫১ শতাংশ বাসাভাড়া গুনতেই সমস্যায় পড়ে। আর ৮০ শতাংশ জনগোষ্ঠীই অপর্যাপ্ত সঞ্চয়ের জন্য বাসা কেনার পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারে না। আর ১১ শতাংশ জনগোষ্ঠী বাসা কেনার ক্ষেত্রে ব্যাংকঋণ গ্রহণ করে। আর ১২ শতাংশ জনগোষ্ঠী বাসা কেনায় পারিবারিক উৎস থেকে ঋণ নিয়ে থাকে।

ঢাকায় ৯৫০ বর্গফুটের বাসাভাড়া গড়ে ১১ হাজার ৫৭৭ টাকা। ৫২ শতাংশ বাড়ির মালিক ইচ্ছামতো ভাড়া নির্ধারণ করে। ৭৫ শতাংশ বাসায় প্রতিবছর ভাড়া বাড়নো হয়। আর ৮৫ শতাংশ বাসায় ভাড়ার জন্য কোনো রসিদ প্রদান করা হয় না। ঢাকায় বসবাসের বিভিন্ন সমস্যাও রয়েছে। এর মধ্যে ৭১ শতাংশের অভিযোগ বাসাবাড়িতে পর্যাপ্ত খোলামেলা জায়গা নেই। ৫৪ শতাংশের অভিযোগ সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ করা হয় না। আর পাঁচ শতাংশের অভিযোগ অগ্নি দুর্ঘটনায় বের হতে বিকল্প ব্যবস্থা নেই।

এতে আরও বলা হয়, ঢাকায় সাত শতাংশ বাসায় প্রতি রুমে চারজনের বেশি বসবাস করে। ১২ শতাংশ বাসায় প্রতি রুমে বাস করে তিনজনের বেশি, ৩৫ শতাংশ বাসায় প্রতি রুমে দুজনের বেশি বাস করে। তবে ৪৬ শতাংশ বাসায় প্রতি রুমে দুজনের কম বাস করে। এছাড়া ৮০ শতাংশ বাসার আয়তন এক হাজার ৪০০ বর্গফুটের চেয়ে। এর মধ্যে এক হাজার বর্গফুটের কম আয়তনের বাসা রয়েছে ৫৫ শতাংশ। তবে ৮০ শতাংশ জনগোষ্ঠীই তাদের পরিবারের তুলনায় বাসার আকার নিয়ে সন্তুষ্ট।

বাড়ির মালিকদের নিজস্ব ফ্ল্যাটের আকার গড়ে এক হাজার ২৬১ বর্গফুট। আর ভাড়া দেওয়া ফ্ল্যাটের আকার গড়ে ৯৫০ বর্গফুট। মাত্র পাঁচ শতাংশ বাসার আকার দুই হাজার বর্গফুটের বেশি। এদিকে ১৭ দশমিক ৭০ শতাংশ ঢাকাবাসী বাসাভাড়া বাবদ আয়ের ১৫ দশমিক ৬০ শতাংশ অর্থ ব্যয় করে। ৩৮ শতাংশ বাসাভাড়া বাবদ ব্যয় করে আয়ের ২৫ দশমিক ১০ শতাংশ, ৩৬ দশমিক ২০ শতাংশ ব্যয় করে আয়ের ৩৪ দশমিক ৭০ শতাংশ ও ৮ দশমিক ১০ শতাংশ ব্যয় করে আয়ের ৪৫ দশমিক ১০ শতাংশ।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে সেলিনা আজিজ বলেন, রাজধানী ঢাকার পুরান ঢাকা, মিরপুর, রামপুরা ও বাড্ডা এলাকার ৪০০ বাড়িতে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, দেশের অধিকাংশ শহরে বসবাসকারী অধিবাসীদের মধ্যে ৪৪ শতাংশ মানুষ ঢাকায় বসবাস করে। এর মধ্যে ৫৬ শতাংশ মানুষের ঢাকায় কোনো নিজস্ব জমি বা বাড়ি নেই। বস্তিবাসীদের নিয়ে হিসেব ৭০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে।

অধিকাংশ মানুষই ব্যাংক লোনে নানা ঝামেলার কারণে লোন নিয়ে ফ্ল্যাট কিংবা বাড়ি কিনতে চান না। বাসাভাড়া ও বাড়ি কেনার ক্ষেত্রে মানুষ প্রাধান্য দেন, তার বাসা থেকে অফিসের দূরত্ব কতটুকু। এর মূল কারণ ঢাকার যানজট।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বেসরকারিভাবে যারা আবাসন ব্যবসা করেন তারা সব সময় ফ্ল্যাট বিক্রির ক্ষেত্রে উচ্চবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষকে টার্গেট করেন। রাজউকের প্রকল্প থেকে ফ্ল্যাট কেনার চেয়ে বেসরকারি কোম্পানির কাছ থেকে ফ্ল্যাট কেনার আগ্রহ বেশি মানুষের।

ব্যাংক লোনের বিষয়ে গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে ঋণ নিয়ে বাড়ি কিংবা ফ্ল্যাট কিনতে গেলে ৭০ শতাংশ টাকা ব্যাংক দেয়। বাকি ৩০ শতাংশ ক্রেতাকে এককালীন পরিশোধ করতে হয়। এজন্য অনেক ক্রেতা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। কারণ এককালীন পরিশোধের টাকাও অনেকের কাছে থাকে না। ফ্ল্যাট বা বাড়ি কেনার এককালীন পরিশোধ ৩০ শতাংশ থেকে কমিয়ে পাঁচ শতাংশ করা যেতে পারে বলে প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া ঋণ পরিশোধের সময় বাড়িভাড়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য করতে পারলে ভাড়াটিয়ারা ফ্ল্যাট কেনায় আগ্রহী হয়ে উঠবেন।