সাক্ষাৎকার

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক এ মুহূর্তে আট লেন করা প্রয়োজন

২০১৫ সালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্প শেষ হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩০ সালে এ মহাসড়কে দৈনিক ৬০ হাজার যানবাহন চলাচলের কথা ছিল। তবে মহাসড়কটিতে গাড়ির সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। ফলে ২০২০ সালেই এ সংখ্যা ৬০ হাজারে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর মূল কারণ, বৈদেশিক বাণিজ্য তথা আমদানি-রফতানি বৃদ্ধি। তাই ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ ছাড়া বিকল্প নেই বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি শেয়ার বিজের সঙ্গে কথা বলেন বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমএ) সহসভাপতি ও কনফিডেন্স সিমেন্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জহির উদ্দিন আহমেদ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাইদ সবুজ

শেয়ার বিজ: আপনারা তো ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের অন্যতম ব্যবহারকারী। এ সড়কে বছরান্তে ১০ শতাংশ হারে যানবাহন বাড়ছে। তাতে কী ধরনের সমস্যায় পড়বেন বলে মনে করছেন?

জহির উদ্দিন আহমেদ: ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক এ মুহূর্তে এক্সপ্রেসওয়ে অর্থাৎ আট লেনের রাস্তা করা প্রয়োজন। তা না হলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে মারাত্মক সমস্যায় পড়বেন ব্যবসায়ীরা। সøথ হয়ে যাবে ইকোনমির চাকা। চার লেন অর্থাৎ এক পাশে দুই লাইন করে; তা দিয়ে ৬০ কিলোমিটারের ওপরে গাড়ি চলানো যায় না। কোনো কারণে যদি একটি লাইন বন্ধ হয়ে যায়, তবে অপর রাস্তা দিয়ে হাইওয়ের সুবিধা পাওয়া যায় না। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোয় রাজধানীর সঙ্গে বাণিজ্যিক শহরগুলোতে ন্যূনতম ৮০ কিলোমিটার গতিতে গাড়ি চলে।

শেয়ার বিজ: আট লেন না হলে ব্যবসায়ীদের অর্থাৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কেমন ক্ষতি হবে?

জহির উদ্দিন আহমেদ: দ্রুত আট লেন না হলে ব্যবসায়ীরা মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বেন। যেমন, একটি ট্রাক ৬০ কিলোমিটার গতির ওপরে চলতে পারে না। যদি ৬০ কিলোমিটার গতিতে চলতে পারে, তবে সাড়ে চার ঘণ্টায় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় পৌঁছাবে। কিন্তু বর্তমানে ৩০-৩৫ কিলোমিটারের ওপরে ট্রাক চলতে পারে না। ফলে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় যেতে ন্যূনতম সাত-আট ঘণ্টা লেগে যায়। সেটা আগামী পাঁচ-ছয় বছর পর ১০-১২ ঘণ্টা লাগতে পারে। তখন ট্রাকগুলো দিনে এক ট্রিপের বেশি দিতে পারবে না। ফলে পরিবহন খরচ বেড়ে যাবে। তাই এখনই আট লেনের কাজ শুরু করতে হবে। তা না হলে আগামী পাঁচ-সাত বছরের মধ্যে আমরা আবার ব্লক হয়ে যাব। আর যদি পাঁচ-ছয় বছর পর কাজ শুরু করে, তাহলে কাজ শেষ হতে আরও ছয়-সাত বছর বেশি সময় লেগে যাবে। এতে ইকোনমির ওপর বড় ধরনের ঋণাত্মক প্রভাব পড়বে। যেখান থেকে বেরিয়ে আসতে অনেক সময় লাগবে।

শেয়ার বিজ: শুধু কি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক আট লেন করতে হবে?

জহির উদ্দিন আহমেদ: না; ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার পুরো অংশটাই আট লেন করতে হবে। আর প্রতিটি বিভাগীয় শহরের সঙ্গে ঢাকার রাস্তা ছয় লেনের করতে হবে, যাতে রাজধানীর সঙ্গে বিজনেস হাবগুলোয় ন্যূনতম ৮০ কিলোমিটার গতিতে গাড়ি চলতে পারে। এতে মহাসড়কে চলাচলকারী ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও কনটেইনারবাহী ট্রেইলার দ্রুত গতিতে চলতে পারবে। একই সঙ্গে বিভাগীয় শহরগুলোর দূরত্ব কমে আসবে।

শেয়ার বিজ: এখন তো সরকার মিরসরাইসহ কয়েকটি স্থানে ইকোনমিক জোন করছে। যদি রাস্তা না বাড়ায়, এগুলো চালু হলে কী সমস্যা হতে পারে?

জহির উদ্দিন আহমেদ: মিরসরাই ইকোনমিক জোন হলে মানুষের মভিলিটি বাড়বে। এখানের ফিনিশ প্রোডাক্টগুলো চট্টগ্রাম বন্দরে আসবে। একই সঙ্গে ইম্পোর্ট আইটেমগুলোও বন্দর থেকে ইকোনমিক জোনে যাবে। তখন এ ৭০ কিলোমিটার অংশে যানজট বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া ইকোনমিক জোনের সঙ্গে রিলেটেড এক্সেসরিজ বা ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ ইন্ডাস্ট্রিগুলো দেশের বিভিন্ন অংশে হতে পারে। এ ইন্ডাস্ট্রিগুলোর সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করতে হলে ছয় থেকে আট লেনের রাস্তা প্রায়োজন।

শেয়ার বিজ: বর্তমান চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়কের মধ্যে দেশের প্রথম টানেল হলে কী ধরনের সুফল পাওয়া যাবে?

জহির উদ্দিন আহমেদ: কক্সবাজার শুধু পর্যটন নগরীই নয়, বর্তমানে এ অঞ্চলটি বিজনেস হাব হিসেবেও কাজ করছে। এখানে এলএনজি টার্মিনাল হয়েছে, গভীর সমুদ্রবন্দর হচ্ছে, কয়লা-বিদ্যুৎকেন্দ্র হচ্ছে। এছাড়া কক্সবাজারে এক্সপোর্ট বেইজ হেভি ইন্ডাস্ট্রি হতে পারে। এজন্য সরকার হয়তো চার বা ছয় লেনের রাস্তা করতে পারে। আমার মতে, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার একসঙ্গেই আট লেনের রাস্তা করা দরকার। তখন দুই ঘণ্টার মধ্যে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার যাতায়াত করা যাবে। তাতে টানেলের শতভাগ সুফল পাওয়া যাবে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বাণিজ্যিক রাজধানীর পাশাপাশি পর্যটন শহরও হয়ে যাবে। পার্বত্য চট্টগ্রামসহ কক্সবাজার নিয়ে পর্যটন কেন্দ্রে বিশাল বাজার সৃষ্টি হবে। যেহেতু চট্টগ্রামে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর রয়েছে। বিদেশি পর্যটকরা সরাসরি চট্টগ্রামে এসে বিভিন্ন হোটেলে উঠবেন এবং এখান থেকে বিভিন্ন স্থান পরিদর্শন করে আবার হোটেলে চলে আসতে পারবেন।

শেয়ার বিজ: এত রাস্তা করতে হলে তো প্রচুর ফান্ডের প্রয়োজন আছে?

জহির উদ্দিন আহমেদ: ফান্ডের প্রয়োজন আছে। তবে এ রাস্তা করতে সরকারের যে টাকা ব্যয় হবে, তা টোলের মাধ্যমে তুলে আনা যাবে। সর্বোচ্চ ১৫-২০ বছর লাগবে। আর আমি টোল নেওয়ার পক্ষে। এখানে সরকার নিজে না করে দেশি-বিদেশি কোম্পানিকে কাজ দিতে পারে। তারা নিজেদের খরচে কাজ করবে। আর টোলের মাধ্যমে লাভসহ ব্যয় তুলে নেবে। একই সঙ্গে সব মহাসড়ক মেরামতের জন্য টোল নেওয়া দরকার।

শেয়ার বিজ: রাস্তা বড় হলে সিমেন্ট ইন্ডাস্ট্রি কি ধরনের সুফল পাবে?

জহির উদ্দিন আহমেদ: ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনা ছাড়া অন্য অঞ্চলে সিমেন্ট ইন্ডাস্ট্রি নেই। যোগাযোগের অসুবিধার কারণে রড ও সিমেন্ট ইন্ডাস্ট্রিগুলোতে ট্রান্সপোর্টেশন কস্ট অনেক বেশি পড়ে। যদি ঢাকা থেকে রাজশাহী, রংপুর, সিলেট প্রভৃতি জায়গায় অল্প সময়ে যাওয়া যেত, তাহলে বিল্ডিং মেটেরিয়ালগুলোর কস্টিং কমে যাওয়ার পাশাপাশি মার্কেটিং কস্টিংও অনেক কমে যেত। এর সুফল কিন্তু দেশের অর্থনীতিতে পড়ত। একই সঙ্গে এটি কৃষির জন্যও সুফল বয়ে আনবে।

শেয়ার বিজ: আপনাকে ধন্যবাদ।

জহির উদ্দিন আহমেদ: আপনাকে ও শেয়ার বিজ পরিবারকে ধন্যবাদ।

সর্বশেষ..