প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

নির্মাণ শুরুর অপেক্ষায় দেশের সর্ববৃহৎ রেলপথ

নিজস্ব প্রতিবেদক: পদ্মা নদীর ওপর বহুল কাক্সিক্ষত সেতুর নির্মাণ শুরু হয়েছে ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে। এর মাওয়া প্রান্তটি অনেকটা ইংরেজি ওয়াই আকৃতির হবে, যার দুপাশ দিয়ে চলে যাবে সড়কপথ আর মাঝ বরাবর থাকবে রেলপথ। এজন্য ঢাকা থেকে মাওয়া হয়ে ভাঙ্গা পর্যন্ত নির্মাণ করা হবে পৃথক রেল সংযোগপথ। পরে তা সম্প্রসারণ করা হবে যশোর পর্যন্ত, যা দেশের সর্ববৃহৎ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প হিসেবে এরই মধ্যে স্বীকৃতি পেয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় রয়েছে ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত ১৬৯ কিলোমিটার ব্রড গেজ মেইন লাইন। এছাড়া ঢাকা-গেন্ডারিয়া পর্যন্ত তিন কিলোমিটার ডাবল লাইন, লুপ, সাইডিং ও ওয়াই কানেকশনস থাকবে ৪৩ দশমিক ২২ কিলোমিটার। অর্থাৎ মোট ২১৫ দশমিক ২২ কিলোমিটার রেল লাইন নির্মাণ করা হবে প্রকল্পটির আওতায়। পাশাপাশি ১০০টি ব্রড গেজ কোচও কেনা হবে।

প্রথম পর্যায় রাজধানীর গেন্ডারিয়া থেকে মুন্সীগঞ্জের মাওয়া হয়ে পদ্মা সেতুর উপর দিয়ে ফরিপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত ৮২ কিলোমিটার ও দ্বিতীয় পর্যায় ভাঙ্গা থেকে নড়াইল হয়ে যশোর পর্যন্ত ৮৫ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ করা হবে। এ প্রকল্পে বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরী নদীসহ ৬৬টি মেজর ও ২২৪টি মাইনর সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ করা হবে। এর মধ্যে ৯টি বড় সেতুর জন্য নদী শাসন লাগবে। এছাড়া এ রেলপথে একটি হাইওয়ে ওভারপাস, ২৯ পয়েন্টে লেভেল ক্রসিং ও ৪০টি আন্ডারপাস নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পটিতে প্রায় ২৩ দশমিক ৩৮ কিলোমিটার ঢালাই করা রেলপথ (ভায়াডাক্ট) নির্মাণ করা হবে। পাথরবিহীন রেলপথ (ব্যালাস্ট লেস ট্র্যাক) তথা নতুন প্রযুক্তির এ রেলপথ দেশে প্রথম নির্মাণ করা হচ্ছে। বুড়িগঙ্গা সেতু পেরিয়ে মুন্সীগঞ্জের পথে এ অংশটি হবে উড়ালপথে।

পুরো রেলপথটি নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১০ হাজার ২৩৯ কোটি টাকা দিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। আর ২৪ হাজার ৭৪৯ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে দেবে চীন সরকার। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি জেলা রেলওয়ের আওতায় আসবে। পাশাপাশি ঢাকা থেকে যশোর ও খুলনা পর্যন্ত সরাসরি ট্রেন চলাচল করতে পারবে, বর্তমানে যা বঙ্গবন্ধু সেতু ও হার্ডিঞ্জ সেতু পেরিয়ে চলাচল করে থাকে।

দুই পর্যায়ে ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা ও ভাঙ্গা-নড়াইল-যশোর রেলপথ নির্মাণে সম্ভাব্যতা যাচাই সম্পন্ন করেছে রেলওয়ে। ১৬৯ কিলোমিটার রেলপথের বিস্তারিত নকশা প্রণয়নও সম্পন্ন হয়েছে। জিটুজি ভিত্তিতে প্রকল্পের দুটি অংশই বাস্তবায়ন করবে চায়না রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি। প্রকল্প প্রস্তাব এর মধ্যে অনুমোদন করেছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। আর ঠিকাদার নিয়োগ প্রস্তাব অনুমোদন করেছে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি ও ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। চায়না রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানির সঙ্গে নির্মাণ চুক্তিও সই করেছে রেলওয়ে।

প্রকল্পটির পরামর্শক হিসেবে কাজ করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)। আজ এ-সংক্রান্ত চুক্তি সই করা হবে। বর্তমানে প্রকল্পটির ঋণ চুক্তির প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে চীন সরকারের কাছে। শিগগিরই এ-সংক্রান্ত প্রস্তাবনা চূড়ান্ত করা হবে রেলওয়ে সূত্র জানায়।

এ ব্যাপারে রেলওয়ে মন্ত্রণালয়ের সচিব ফিরোজ সালাহউদ্দীন শেয়ার বিজকে বলেন, পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগের কাজ এগিয়ে চলছে। দুই পর্যায়ে ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা ও ভাঙ্গা-নড়াইল-যশোর রেলপথ নির্মাণে সম্ভাব্যতা যাচাই সম্পন্ন করা হয়েছে। বর্তমানে প্রকল্পের ঋণ চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে। জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া চলছে। দ্রুত রেলপথটির নির্মাণকাজ শুরু করা হবে।

রেলওয়ের তথ্যমতে, রেলপথটি নির্মাণে প্রায় এক হাজার ৯৬৮ একর জমির প্রয়োজন হবে। এর মধ্যে ২০০ একর সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদফতর ও ৬৮ হেক্টর সেতু কর্তৃপক্ষ থেকে নেওয়া হবে। অবশিষ্ট এক হাজার ৭০০ একর বেসরকারি খাত থেকে জমি অধিগ্রহণ করতে হবে।

ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা অংশে স্টেশন থাকবে ৬টি। এগুলো হলো- কেরানীগঞ্জ, নিমতলা, শ্রীনগর, মাওয়া, জাজিরা ও শিবচর। দ্বিতীয় পর্যায় ভাঙ্গা থেকে নড়াইল হয়ে যশোর পর্যন্ত অংশে নতুন আটটি রেলওয়ে স্টেশন নির্মাণ করা হবে। এগুলো হলো: ভাঙ্গা জংশন, নগরকান্দা, মুকসুদপুর, মহেশপুর, লোহাগড়া, নড়াইল, জামদিয়া ও পদ্মাবিল। এগুলোর বাইরে ঢাকা, গেন্ডারিয়া, ভাঙ্গা, কাশিয়ানী, রূপদিয়া ও সিঙ্গিয়া স্টেশনের অবকাঠামো উন্নয়ন করা হবে।

রেলওয়ের তথ্যমতে, ঢাকা-ভাঙ্গা-যশোর রুটের এ রেলপথে ১২০ কিলোমিটার বেগে ট্রেন চলাচল করতে পারবে। এটি বাস্তবায়ন হলে ঢাকা থেকে মুন্সীগঞ্জ, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুর, নড়াইল হয়ে যশোর পর্যন্ত রেল যোগাযোগ স্থাপিত হবে। রেলপথে ব্যবহার করা হচ্ছে আন্তর্জাতিক মানের ৬০ কেজির রেল। আর এ পথের এক্সেল লোড ধরা হয়েছে ২৫ টন। আর সেতু ও ভায়াডাক্টের এক্সেল লোড ৩২ টন।

রেলওয়ে মহাপরিচালক মো. আমজাদ হোসেন বলেন, ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে ভাঙ্গা-যশোর পর্যন্ত নতুন লাইন স্থাপন বর্তমানে রেলওয়ের সবচেয়ে বড় উন্নয়ন প্রকল্প। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্টরা চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেছে। পদ্মা সেতু উদ্বোধনের দিন থেকে সড়কপথে মোটরযানের পাশাপাশি রেলপথে ট্রেনও চলবে। এ লক্ষ্যে কাজ করা হচ্ছে।

উল্লেখ্য, রেলপথটি নির্মিত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জনগণের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতি হবে। রেলপথে ঢাকা-যশোর রুটের দূরত্ব ২১২ কিলোমিটার, ঢাকা-খুলনার দূরত্ব ১৮৫ ও ঢাকা-দর্শনার দূরত্ব ৪৪ কিলোমিটার হ্রাস পাবে। একই সঙ্গে হ্রাস পাবে ভ্রমণ সময়। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে জিডিপি ১ শতাংশ বাড়বে বলে ধারণা করছে রেলওয়ে।