ঢাকা মেট্রোরেল স্বপ্ন নয়, বাস্তবে

আবুল কাসেম হায়দার: বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় নির্মাণাধীন শহরভিত্তিক রেল ব্যবস্থা হচ্ছে ঢাকা মেট্রো যা আনুষ্ঠানিকভাবে ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট বা সংক্ষেপে এমআরটি নামে পরিচিত। ২০১৩ সালে বর্তমান সরকার ঢাকা মহানগরীর ক্রমবর্ধমান যানবাহন সমস্যা ও পথের দুঃসহ যানজট কমিয়ে আনার লক্ষ্যে কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন। সেই কৌশল অনুযায়ী প্রথমবারের মতো ঢাকা মেট্রোরেল স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়। পরে ২০১৬ সালে প্রণীত সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা অনুযায়ী, মেট্রোরেলের লাইনের সংখ্যা ৩টি থেকে বাড়িয়ে ৫টি করা হয়। প্রথম পর্যায়ে নির্মাণের জন্য উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ২০.১ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি ৬টি লাইনকে নির্বাচন করা হয়। ২০১৬ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২৬ জুন উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এমআরটিলাইন-৬-এর নির্মাণকাজ শুরু হয়। এটি একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। স্মরণীয় কাজ। বাংলাদেশের মতো একটি দেশে মেট্রোরেল নির্মাণ একটি যুগান্তরকারী পদক্ষেপ।

২০১২ সালের ১৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার ঢাকা-ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট তথা মেট্রোরেল প্রকল্প জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) অনুমোদন লাভ করে। প্রথম পর্যায়ে নির্মাণের জন্য এমআরটি-৬ নামক ২০.১০ কিলোমিটার দীর্ঘ পথকে ঠিক করা হয়। এই প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। এই প্রকল্পের সহায়তা হিসেবে জাইকা দেবে ১৬ হাজার ৫৯৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। প্রকল্প পরিকল্পনা অনুযায়ী উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল চালু হলে দুদিক থেকে ঘণ্টায় ৬০ হাজার যাত্রী পরিবহন করা সম্ভব হবে। এমআরটি-৬ চূড়ান্ত রুট অ্যালাইনমেন্ট হলোÑউত্তরা তৃতীয় ধাপ-পল্লবী রোকেয়া সরণির পশ্চিম পাশ দিয়ে চন্দ্রিমা উদ্যান সংসদ ভবন খামারবাড়ি হয়ে ফার্মগেট, সোনারগাঁও হোটেল, শাহবাগ, টিএসসি দোয়েল চত্বর, তোপখানা রোড থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যন্ত। এ রুটের ১৬টি স্টেশন হচ্ছে উত্তর উত্তরা, উত্তরা সেন্টার, উত্তরা দক্ষিণ, পল্লবী, মিরপুর-১১, মিরপুর-১০, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, আগারগাঁও, বিজয় সরণি, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, শাহবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সচিবালয়, মতিঝিল ও কমলাপুর।

ট্রেনে চলাচলের জন্য প্রয়োজন হচ্ছে ১৩.৪৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ, যা নেয়া হবে জাতীয় গ্রিড থেকে। এর জন্য উত্তরা, পল্লবী, তালতলা, সোনারগাঁও ও বাংলা একাডেমি এলাকায় ৫টি বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র থাকবে।

২০১৬ সালে ২৬ জুন এমআরটি-৬ প্রকল্পের নির্মাণকাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০২১ সালের ১৬ ডিসেম্বর এই প্রকল্পের উদ্বোধনের তারিখ নির্ধারিত হয়েছে।

২০১৯ সালে ১৫ অক্টোবর এমআরটি-১ এবং এমআরটি-৫ নামক লাইন দুটি নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয়। এমআরটি-১ প্রকল্পের আওতায় বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর ও নতুনবাজার থেকে পূর্বাচল পর্যন্ত মোট ৩১.২৪ কিলোমিটার পথে মেট্রোরেল নির্মিত হবে। এই প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাপান সরকার দেবে ৩৯ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা, বাকি ১৩ হাজার ১১১ কোটি টাকা দেবে বাংলাদেশ সরকার। এমআরটি-১ প্রকল্পে বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ১৬ দশমিক ২১ কিলোমিটার হবে পাতাল পথ এবং কুড়িল থেকে পূর্বাচল পর্যন্ত ১১ দশমিক ৩৬ কিলোমিটার হবে উড়াল পথে। নতুন বাজার থেকে কুড়িল পর্যন্ত ৩ দশমিক ৬৫ কিলোমিটার আন্ডারগ্রাউন্ড ট্রানজিশন লাইনসহ ৩১ দশমিক ২৮ কিলোমিটার রেললাইন নির্মাণ করা হবে। এই মেট্রোরেলের ১২টি স্টেশন যাবে মাটির নিচে এবং ৭টি থাকবে উড়াল সেতুর ওপর।

এমআরটি-৫ নির্মাণ প্রকল্পে হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার লাইন নির্মাণ করা হবে। এই প্রকল্পের ৪১২ হাজার ২৩৮ কোটি টাকার মধ্যে ২৯ হাজার ১১৭ কোটি টাকা দেবে জাপান এবং বাকি ১২ হাজার ১২১ কোটি টাকা দেবে বাংলাদেশ সরকার। প্রকল্পের ২০ কিলোমিটারের মধ্যে ১৩ কিলোমিটার হবে পাতাল পথে আর বাকি সাড়ে ৬ কিলোমিটার হবে উড়াল পথে।

মানুষের জীবন মান উন্নত করার জন্য সরকার বিগত কয়েক বছর ধরে নানা ধরনের উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে কাজ করছেন। ইতোমধ্যে পদ্মা সেতু নির্মাণের কাজ প্রায় ৭৬ শতাংশ শেষ হয়েছে। দেশের বৃহৎ একটি অংশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে পদ্মা বিশাল অবদান রাখবে। সার্বিক অর্থনীতিতে এই সেতুর প্রভাব অনেক বেশি থাকবে।

ঠিক তেমনি ঢাকা মেট্রোরেল দেশের মানুুষের বিশেষ করে ঢাকা শহরেরর মানুষের জীবনকে অনেক বেশি সহজ ও অর্থবহ করে তুলবে। মানুষ কর্মের সময় অনেক বেশি পাবে। তাতে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে মানুষের কর্মঘণ্টা যোগ হবে। উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। আর্থিকভাবে দেশের মানুষ অনেক বেশি উপকৃত হবে।

অন্যদিকে শহরের যানজট অনেক কমে আসবে। মানুষ অল্প সময়ে নিজ কর্মস্থলে পৌঁছে কাজে যোগদান করতে পারবে। খচরও কম হবে। আর্থিকভাবে সাধারণ মানুষ অনেক বেশি উপকৃত হবে। মানুষের জীবনমান উন্নত হবে।

মানুষের কর্মস্পৃহা বৃদ্ধি পাবে। মানুষের মনের আনন্দ বেড়ে যাবে। কর্মশক্তি তাতে বৃদ্ধি পাবে। মানুষ একটি সুন্দর জীবনের কল্পনা করতে অনেক বেশি উৎসাহী হবে।

দেশের সুনাম বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে। দেশ যে মধ্য আয়ের দেশে পদার্পণ করেছে, তার বার্তা পৃথিবীতে বেশি বেশি করে ছড়িয়ে পড়বে। উন্নত দেশের ঘ্রাণ আমরা অনুভব করতে পারব।

আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গে মেট্রোরেল চালু হয়েছে ১৯৮৪ সাল থেকে। তা আরও বৃদ্ধি পেয়ে নানা দিকের মানুুষের সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে। পৃথিবীর অনেক দেশে মেট্রোরেলই প্রধান ও একমাত্র চলাচলের সহজ বাহন। যেমন সিঙ্গাপুর, হংকং মেট্রোরেল দেখার মতো। উপভোগ করার মতো। কম খরচে, অল্প সময়ে যে কোনো স্থানে যাতায়াত করা খুবই সহজ, অর্থনেতিক কর্মকাণ্ডে মেট্রোরেল খুব বেশি কার্যকরী ভূমিকা রেখে আসছে। একদিন আমাদের দেশেও মেট্রোরেল সবার প্রিয় যানবাহনে পরিণত হবে।

ঢাকা মেট্রোরেল ২০২১ সালে চালু হওয়ার মূল পরিকল্পনায় ছিল। কিন্তু তা সম্ভব হবে না। সময় বেড়ে যাচ্ছে। তাতে ব্যয় ও বেড়ে যাবে। যদি বেশি কম সময়ে নির্মাণকাজ শেষ করা যেত, তত বেশি ব্যয় কমে আসত।

জাপানের আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতায় মেট্রোরেল নির্মাণ হচ্ছে। পদ্মা সেতু যেমন চীনের সার্বিক সহযোগিতায় হচ্ছে, তেমনি জাপানের সহযোগিতায় মেট্রোরেল হচ্ছে। তাই জাপানকে ধন্যবাদ। জাইকাকে অনেক ধন্যবাদ।

দেশে মেগা প্রকল্পের মধ্যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প। এটি নির্মাণ হচ্ছে রাশিয়ার সার্বিক সহযোগিতায়। রাশিয়া আমাদের অকৃত্রিম বন্ধু। বন্ধুত্বের নিদর্শন স্বরূপ রূপপুর বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলেছে।

ঢাকা মেট্রোরেল প্রকল্প আমাদের দেশের মেগা প্রকল্পের মধ্যে অন্যতম। দৃশ্যমান, লাভজনক, সুন্দর প্রকল্প ঢাকা মেট্রোরেল প্রকল্প। সরকারের সবচেয়ে বেশি দৃশ্যবান প্রকল্প ঢাকা মেট্রোরেল প্রকল্প। অন্যটি হচ্ছে পদ্মা সেতু। তাও নিজস্ব অর্থায়নে নির্মাণ। যে পদ্মা সেতু অর্থনৈতিক ঋণ বিশ্বব্যাংক দেয়ার কথা থাকলেও পরবর্তীতে সরকার নিজস্ব অর্থায়নে নির্মাণ; কাজ শুরু করে। সরকার এই ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছিল, সফলও হচ্ছে। হয়তো দ্রুত এ সফলতার ফল আমরা দেখতে পাব।

ঠিক তেমনি ঢাকা মেট্রোরেল প্রকল্প ঢাকা শহরের মানুষের অনেক দিনের কষ্ট লাগব করে জীবন মানের উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।

দ্রুত সময়ের মধ্যে, মজবুত ও টিকসই নির্মাণ হোক ঢাকা মেট্রোরেল প্রকল্প। এই জাতীয় প্রকল্প দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প। যুগ যুগ ধরে এই প্রকল্প থেকে মানুুষ যাতে উপকৃত হতে পারে, সেইরূপ মজবুত ও টিকসই করে নির্মাণ করা সময়ের দাবি।

দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়তে সরকার বদ্ধপরিকর। দুর্নীতিমুক্ত কর্মকাণ্ড সবার কাম্য। যত বেশি দুর্নীতিমুক্ত কাজ হবে, তত বেশি উন্নয়ন সঠিক হবে। ব্যয় হ্রাস পাবে। দেশের অর্থনীতিতে অনেক বেশি ভূমিকা রাখবে। প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি পায় সময় বেশি লাগার কারণে। সময় বেশি লাগার ফলে দুর্নীতিও বেড়ে যায়। চাই দক্ষ, সৎ ও দেশপ্রেমিক কর্মবাহিনী। একমাত্র দেশের যে কোনো মেগা প্রকল্পের ব্যয় কমিয়ে আনতে পারে।

গত ২৯ আগস্ট থেকে মেট্রোরেল পরীক্ষামূলকভাবে উত্তরা থেকে পল্লবী পর্যন্ত চলাচল করবে। তা হবে পারফরম্যান্স টেস্ট। এ পরীক্ষা চলবে ছয় মাস পর্যন্ত।

মেট্রো রেল ও লাইনের নকশা অনুযায়ী, এটি সর্বোচ্চ ১১০ কিলোমিটার গতিতে চলতে পারবে। তবে যাত্রী নিয়ে কত গতিতে চলবে, স্টেশনে কতক্ষণ থামানো হবে এবং ভাড়া কত হবে, এসব বিষয় এখনও চূড়ান্ত হয়নি।

মেট্রোরেলের নকশা প্রণয়ন ও তৈরির দায়িত্বে রয়েছে জাপানের কাওয়াসাকি-মিৎসুবিশি কনসোর্টিয়াম। তাদের অধীনেই সব ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে। যখন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আনুষ্ঠানিভাবে বাংলাদেশকে ট্রেনগুলো হস্তান্তর করবে। তখন বাংলাদেশের নিয়োগ দেয়া চালক ট্রেন চালাবেন। ইতোমধ্যে সরকার চালক নিয়োগ দিয়েছেন, তাদের প্রশিক্ষণ চলেছে। বিদেশেও প্রশিক্ষণ দেয়া হবে।

তবে সব ঠিক থাকলে মেট্রোরেল চালু হবে ২০২৩ সালের জুনের মধ্যে। তবে এই প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত। মেয়াদের পূর্বে মেট্রোরেল চালু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। স্বপ্নের মেট্রোরেল দৃশ্যমান হচ্ছে দ্রুত। উন্নত দেশের আদলে ঢাকা শহরের পরিবর্তন আমরা লক্ষ করছি।

প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি আইএফআইএল ও আবুল কাসেম হায়দার মহিলা কলেজ, সন্দ্বীপ, চট্টগ্রাম

[email protected]

সর্বশেষ..