মত-বিশ্লেষণ

ঢাবি কালো দিবস: গণতন্ত্রের প্রেরণা

 

কাজী সালমা সুলতানা: একটি জাতির আত্মবিকাশ, একটি জাতির পরিচয়, একটি রাষ্ট্রের জন্ম এমন সব ঘটনায় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বদানের ঘটনা বিশ্বে দ্বিতীয়টি নেই। এমনই বিরল গৌরবের অধিকারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। প্রাচ্যের অক্সফোর্ড-খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে গড়ে তোলা হয়েছিল অক্সফোর্ডের আদলেই। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এ অঞ্চলের জ্ঞান-বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা ও শিক্ষার প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে জনগণের অধিকারের প্রশ্নেও এ বিশ্ববিদ্যালয় নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষার নির্ধারিত গণ্ডিতে কখনোই আবদ্ধ থাকেনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। আবার শিক্ষার গুণগত মান রক্ষায় অগ্রণী ভূমিকাকেও কখনোই খাটো হতে দেয়নি। এ কারণেই সনদভিত্তিক শিক্ষার বাইরেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিন্ন পরিচিতি রয়েছে। পরিচিতি রয়েছে মেধা ও মননের বিকাশ এবং মুক্তবুদ্ধিচর্চার পাদপীঠ হিসেবে। পরিচিতি রয়েছে গণতন্ত্রের সূতিকাগার হিসেবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে অনেকেই প্রায়ই প্রশ্ন তুলে থাকেন; প্রশ্ন তুলে থাকেন এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে। আর এর সমাধান হিসেবে অনেকেই ফতোয়া দিয়ে থাকেন ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করার। বিশেষ করে বিভিন্ন সময়ের স্বৈরশাসকেরা প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালিয়েছেন ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করতে। এ প্রচেষ্টার প্রধান লক্ষ্যই হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক ছাত্ররাজনীতিকে বন্ধ করে ক্ষমতাকে নিরাপদ করা। কিন্তু এ জাতির ক্রান্তিকালের প্রতিটি ঘটনায় নেতৃত্বদানের মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গণতন্ত্রের সূতিকাগার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ বিষয়টি অনেক কথিত বোদ্ধারাও ভুলে যান অবলীলায়।
আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে তেমনই একটি দিন, যে দিনটি চিহ্নিত হয়ে আছে কালো দিবস হিসেবে। কি ঘটেছিল আজকের এই কালো দিবসে? ২০০৭ সাল। দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর অসহিষ্ণুতা ও অস্থিরতার মাঝে দেশে জারি করা হয় জরুরি আইন। সামরিক বাহিনীর সমর্থনে গঠন করা হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার। আর সেই সামরিক বাহিনী-সমর্থিত তৎকালীন প্রচণ্ড ক্ষমতাধর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রচনা করেছিল আরও একটি কালো অধ্যায়। আজ সেই ২৩ আগস্ট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কালো দিবস। দেশে সামরিক শাসন ছিল না, কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে ছিল সামরিক বাহিনীর ক্যাম্প। আর এ ক্যাম্প স্থাপন করেই ধারণা করা হয়েছিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়ে গেছে। ২০০৭ সালের ২০-২৩ আগস্ট সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসনামলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী তথা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের ওপর সংঘটিত হয় অমানবিক, বেদনার্ত ও নিন্দনীয় ঘটনা।
সেনানিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ ও জরুরি আইনের কয়েক মাস কেটেও গেছে। সারা দেশে নীরবতা চলছে। আন্দোলন, সংগ্রাম, সভা, সমাবেশ, প্রতিবাদ, বিক্ষোভÑকিছুই নেই দেশে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও কোনো প্রতিবাদ সভা বা কোনো দাবি-দাওয়ার সমাবেশ মিছিল নেই। তাই তৎকালীন ক্ষমতাসীনরা ধারণা করেছিল, সবকিছুই তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ২০ আগস্ট শুরু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে আন্তঃবিভাগ ফুটবল প্রতিযোগিতা। খেলা চলাকালে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছাত্র ও সেনাসদস্যদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। তা এক সময়ে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটায়। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে সেনাসদস্যরা উপস্থিত ছাত্র-শিক্ষকদের লাঞ্ছিত করেন। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে চরম অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। এই অনৈতিক কর্মকাণ্ড ছাত্রদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। খেলার মাঠের ঘটনায় সেনাসদস্যের সঙ্গে ছাত্রদের সংঘর্ষ পর্যন্ত গড়ায়। এ ঘটনার প্রতিবাদে ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীরা জরুরি আইন উপেক্ষা করে প্রতিবাদ মিছিল করেন। বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশ ও সেনাবাহিনী আবারও হামলা চালায়। পরদিন ২১ আগস্ট ক্যাম্পাস উত্তাল হয়ে পড়ে। বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। সারা দেশে শুরু হয় ‘সেনা হটাও’ আন্দোলন। পরদিন ২২ আগস্ট সন্ধ্যায় দেশের প্রধান পাঁচটি শহরে কারফিউ জারি করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। শিক্ষার্থীদের হল ত্যাগ করার জন্য চাপ দেওয়া হয়। বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের ওপর সেনাসদস্যদের পাশাপাশি পুলিশও চড়াও হয়। এ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে রাজশাহী, চট্টগ্রামসহ দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। টানা তিন দিন আন্দোলনের পর ২৩ আগস্ট ছাত্রদের হল ত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়। ওই রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের চার শিক্ষক ও আট ছাত্রকে গ্রেফতারের পাশাপাশি সারা দেশের শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়।
অন্যদিকে শিক্ষক ও ছাত্রদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক ঘটনার প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় খেলার মাঠ থেকে সেনাক্যাম্প গুটিয়ে নেওয়ার দাবি জানান শিক্ষার্থীরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে ছাত্র বিক্ষোভের মুখে কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ থেকে অস্থায়ী সেনাক্যাম্প গুটিয়ে নেওয়া হয়। পরদিন ২৩ আগস্ট রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন ও অধ্যাপক হারুন-অর-রশিদসহ কয়েকজন শিক্ষককে চোখ বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয় অজানা স্থানে।
এছাড়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন শিক্ষককে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সংহতি প্রকাশের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের চার শিক্ষক ও সাত ছাত্রকে গ্রেফতার করা হয়। সারা দেশে ৮২ হাজার ছাত্রকে আসামি করে মামলা করা হয়। শেষ পর্যন্ত অচলাবস্থা ও তীব্র চাপের মুখে আটক ছাত্র-শিক্ষকদের মুক্তি দেওয়া হয়। দীর্ঘ ৬৬ দিন পর ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস খুলে দেওয়া হয়। ছাত্র-শিক্ষকদের ধারাবাহিক আন্দোলনের মুখে মুক্তি পান কারাবন্দি ছাত্র-শিক্ষকরা।
পরের বছর থেকেই ২৩ আগস্টকে ‘কালো দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকরা। প্রতিবছরই ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর নির্যাতনের কথা স্মরণ করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার। এই নির্যাতনের বিচারও দাবি করা হয়। তবে এ ঘটনার একটি ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার ঐতিহ্যগতভাবে গণতন্ত্রের সূতিকাগার ও স্বৈরাচারী দৃষ্টিভঙ্গি কিংবা অগণতান্ত্রিক যে কোনো কিছুর বিরুদ্ধে স্পর্ধিত সাহস, তা আবারও প্রমাণ করে দেয়। সত্য ও ন্যায়ের পথে এ জাতির প্রতিটি ক্রান্তিকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের শিক্ষার্থীরা যে সাহস ও স্পর্ধা দেখিয়েছেন, দেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে তা ঠাঁই পেয়েছে। তাই ২৩ আগস্ট শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ‘কালো দিবস’ নয়, এটি অগণতান্ত্রিক শাসন ও স্বৈরাচারী আচরণের বিরুদ্ধে ছাত্র-শিক্ষকদের সম্মিলিত প্রতিবাদের দৃষ্টান্ত। আগামীতে এ দৃষ্টান্তই এদেশের যে কোনো গণতান্ত্রিক আন্দোলনে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আবির্ভূত হবে। জয়তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জয়তু গণতান্ত্রিক চেতনার সৈনিক ছাত্রসমাজ।

গণমাধ্যমকর্মী
[email protected]

 

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..