প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

তথ্যের সঙ্গে বাস্তব আর বাস্তবের সঙ্গে তথ্য মিলছে না

ড.  আর এম দেবনাথ: সরকারের কথা বিশ্বাস করে এখন বড়ই বিপদে আছি। এতদিন সরকার বলেছে, মানুষ এখন গম বা আটা বেশি খায়। গমের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। চালে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ। আমি তা বিশ্বাস করে দিনের পর দিন লিখেছি, মানুষ গম খায় বেশি। আগে অল্প লোকে গম বা আটা খেত। এমনকি স্বাধীনতার পরপরও মানুষ গম বা আটা খেতে চাইত না। ভাতই ছিল ভরসা। বলা যায়, তিন বেলায়ই ভাত। সেই অবস্থা দিন দিন বদলেছে। মানুষ ধীরে ধীরে সকালে গম বা আটা ধরেছে। সকালের নাশতা মানেই রুটি। তিন বেলার মধ্যে এক বেলা রুটি। বহু লোক ধীরে ধীরে রাতেও ধরেছে আটার রুটি। শুধু মধ্যবিত্ত, বিত্তশালী নয়। গরিব মানুষও, শ্রমজীবীরাও ধীরে ধীরে রুটি ধরেছে। বলা হচ্ছিল, খুবই সুস্থ লক্ষণ এটা। অন্তত চালের ওপর চাপ কমছে। গমের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে। সকালে রুটি নয় শুধু, পাউরুটিও খাচ্ছে লোকজন। এসব কারণেই গম বা ময়দার আমদানি বাড়ছে। শত হোক, আমাদের দেশ গম উৎপাদনের উপযোগী নয়। উত্তরবঙ্গের কিছু জায়গা আছে যেখানে গম হয়। কিন্তু তা সীমিত পরিমাণে। ওই গম দিয়ে আমাদের চাহিদা মেটে না। অতএব ক্রমবর্ধমান গমের চাহিদা মেটানোর জন্য এর আমদানি দিন দিন বাড়ছে। সরকারের সঙ্গে সঙ্গে আমিও এ ধারণার বশবর্তী হয়ে বহুদিন ধরে এভাবেই লিখছি। লিখছি, চালে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ। স্বয়ংসম্পূর্ণ নয় শুধু, কিছু চাল শ্রীলঙ্কায় রফতানিও করেছি। এসবই বলা কথা, লেখার বিষয় ছিল। লিখেছিও। কিন্তু এখন গোল বেধেছে এক জায়গায়। এর কেন্দ্রে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকস (বিবিএস), যা সরকারের একমাত্র পরিসংখ্যান জোগানের সংস্থা। এর সংগৃহীত তথ্যই সবাই ব্যবহার করে। এর বিকল্প পরিসংখ্যানের ব্যবস্থা খুবই কম একমাত্র বাংলাদেশ ব্যাংক ছাড়া, যারা ব্যাংক খাতের তথ্য ও পরিসংখ্যান জোগান দেয়। এহেন বিবিএস ২০১৬ সালে একটা জরিপ করেছে। এর নাম ‘আয়-ব্যয় খানা জরিপ-২০১৬’। ‘ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিচার হাউসহোল্ড সার্ভে-২০১৬’। বস্তুত বাংলাদেশ প্রতি পাঁচ বছর পর এ জরিপ করে।

সর্বশেষ ২০১৬ সালের ‘আয়-ব্যয় খানা জরিপে’ গমের ওপর যে তথ্য দেওয়া হয়েছে, তা পড়ে চক্ষু ছানাবড়া। শুধু গম নয়, চালের তথ্য, আয়-ব্যয়ের তথ্য, বৈষম্যের তথ্য, দারিদ্র্যের জেলাওয়ারি তথ্য ইত্যাদিও চমকপ্রদ ও চিন্তাজাগানিয়া। গমের তথ্যটিই আলোচনায় আনা যাক। এতে বলা হচ্ছে, মাথাপিছু গম খাওয়া (ভোগ) দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। ২০১০ সালে মাথাপিছু ‘গমভোগ’ ছিল ২৬ গ্রাম। ২০১৬ সালে তা হ্রাস পেয়ে হয়েছে মাত্র ১৯ দশমিক ৮৩ গ্রাম। শতাংশের হিসাবে হ্রাসের হার দাঁড়ায় ২৪ শতাংশ। বিশাল হ্রাস। যদি ২০১০ নয় ১৯৯৫-৯৬ সালের তথ্যে যাই, তাহলে দেখা যায় আরও মারাত্মক

খবর। ওই সালে মাথাপিছু গমভোগ ছিল ৩৩ গ্রাম। তাহলে কী দাঁড়াল? ১৯৯৫-৯৬ সালের ৩৩ গ্রাম থেকে ২০১৬ সালে মাথাপিছু ‘গমভোগ’ দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৯ দশমিক ৮৩ গ্রাম। এখন বলুন, যাই কোথায়? সরকার এতদিন কী বলল, আমরাই বা কী লিখলাম, দেশবাসীই বা কী বুঝল? রীতিমতো আহাম্মক বনে গেছি। এখন প্রশ্ন, যদি তাই হবে তাহলে দিন দিন গমের আমদানি বাড়ছে কীভাবে? তথ্যে দেখতে পাচ্ছি, গমের উৎপাদন সবিশেষ বাড়েনি। ২০০৯ সালে সারা দেশে গম উৎপাদন হয় ১০ লাখ ৩৯ হাজার মেট্রিক টন। আর ২০১৬-১৭ অর্থবছরে উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ে হয় মাত্র ১৪ লাখ ৩১ হাজার মেট্রিক টন। অর্থাৎ উৎপাদন সেভাবে বাড়েনি। বস্তুত বাড়ার সবিশেষ সুযোগও নেই। গমের জমি নেই। জমি বাড়ানোর কোনো কায়দাও নেই। ঠিক আছে, গমের উৎপাদন বাড়েনি। কিন্তু আমদানি? আমদানি এত বাড়ল কীভাবে? সরকারি তথ্যে দেখা যাচ্ছে, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে দেশে গম আমদানি হয়েছে ২৪ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন। ২০১০-১১ সালে তা বেড়ে হয় ৩৭ লাখ ৫৩ হাজার টন। পরের দুই বছর বেশ কিছুটা কমে, তারপর আবার বাড়তে থাকে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে গম আমদানির পরিমাণ ছিল ৩৮ লাখ ৪১ হাজার টন। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বেড়ে হয় ৪৩ লাখ ৬৬ হাজার টন। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে গম আমদানি ছিল ৪১ লাখ ৪৯ হাজার টন। এসব তথ্যের অর্থ কী? বিবিএস বলছে, মাথাপিছু গমভোগ দিন দিন কমছে। এ তথ্য দিয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। গমের সঙ্গে আরও কিছু তথ্য দিয়ে তিনি বলেছেন, মানুষের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন হচ্ছে। মানুষ ডিম বেশি খাচ্ছে, মাংস-মাছ বেশি খাচ্ছে, শাকসবজি সামান্য বেশি খাচ্ছে। ভীষণ আনন্দের সংবাদ। এ সংবাদের পাশে গম আমদানির তথ্য কীভাবে খাপ খায় তা এখন বোঝার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিষয়টি আরও জটিল হয়, যখন চালের হিসাবের সঙ্গে যোগ করা হয়। বিবিএস সব তথ্য ধূলিস্যাৎ করে বলছে, শুধু গম নয় বাংলাদেশের মানুষ এখন চালও কম খায়! ১৯৯৫-৯৬ অর্থবছরে মাথাপিছু ‘চালভোগ’ (রাইস কনজামশন)-এর পরিমাণ ছিল ৪৬৪ দশমিক তিন গ্রাম। ২০১৬ সালে তা ৩৬৭ গ্রামে হ্রাস পায়। যদি তাই হয়, তাহলে ১৬ কোটি ৫০ লাখ লোক ধরে চালের প্রয়োজন হয় মোট দুই কোটি ২১ লাখ টন। অথচ আমরা জানি, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেশে চাল উৎপাদন হয়েছে সর্বমোট তিন কোটি ৪৭ লাখ টন। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা ছিল তিন কোটি ৪৮ লাখ টন। তাহলে কী দাঁড়াল? চাল উদ্বৃত্ত হয় প্রচুর। এক কোটি টনের অনেক বেশি। এসবই সরকারি তথ্য। এমতাবস্থায় কাউকে দোষারোপ করা যাবে না যে, এসব তথ্য বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। অতএব শুধু আমার পক্ষে নয়, সরকারের পক্ষেও এসব তথ্য বিব্রতকর যদি না সরকারের কেউ এর ব্যাখ্যা দেয়।

ব্যাখ্যা দেওয়া উচিত। কৃষিমন্ত্রী, খাদ্যমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রীর এসব তথ্য জানা দরকার। সমন্বয় করা দরকার। সর্বোপরি এসব তথ্য প্রধানমন্ত্রীকে জানানো দরকার। প্রকৃতপক্ষে কী হচ্ছে? মাথাপিছু খাদ্য চাহিদা আমাদের কত? খাদ্য বলতে শুধু চাল-গমের কথা বলছি না। চাল-গম বাদেও অনেক জিনিস আছে। ডিম, দুধ, মাছ, মাংস, শাকসবজি, ফলমূল ইত্যাদির মাথাপিছু ভোগ প্রকৃতপক্ষে কতটুকু? বিশেষ করে চাল-গমের। বিবিএসের তথ্য ঠিক ধরে নিলে কোথাও না কোথাও সমস্যা আছে বলতে হয়। হয় উৎপাদনের তথ্যে সমস্যা, নয়তো ভোগের তথ্যে, নয়তো জরিপের গুণগত সমস্যা; নয়তো আমদানির তথ্যে গণ্ডগোল। আমদানি দেখানো হয়েছে, কিন্তু বেসরকারি খাত প্রকৃতপক্ষে আমদানি না করে দেশ থেকে অর্থ পাচার করেছে। বীজের চাহিদা আছে, পশুখাদ্যের বিষয় আছে। জানা যাচ্ছে, দেশে এখন পশুখাদ্যের অভাব। ঘাস বলতে কিছু নেই। ছোটবেলায় আমরা দেখেছি, কৃষকরা ঘাস খাওয়াতেন গরু-মহিষকে। কিন্তু এখন ঘাস নেই দেশে। খড়ও হয় না। খড় মোটা, যা পশুরা খায় না। এমতাবস্থায় অনুমান করা হয়, গমের একটা অংশ পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহার হয়। আবার জানা যায়, ফিশফিডের অভাবও দেশে আছে। মাছের খাদ্য হিসেবেও খাদ্যশস্য খরচ হচ্ছে, বিশেষ করে ভুট্টা। আবার প্রচুর খাদ্যশস্য ইঁদুরে খায়, আনা-নেওয়ায় নষ্ট হয়। এসব মাঠ-জমিনের হিসাব। প্রশ্ন, এসব তো আমলে নিয়েই আমাদের কথা বলতে হবে। আমরা কি এসব আমলে নিয়ে কথা বলি, নাকি সরকারের সাফল্য নিয়ে গর্ব করতে গিয়ে পরিসংখ্যান ওলটপালট করি? এসব কিছুই বুঝি না। তবে একটা জিনিস বুঝি, পরিসংখ্যানগত সমস্যা আমাদের খুবই জটিল এবং এ কারণে প্রতিবছরই নানা বিষয়ে অহেতুক জটিল বিতর্কের সম্মুখীন হই। অথচ এ বিতর্কের কোনো কারণ দেখি না। যেমন দেশে গম, চাল কত উৎপাদন হয়, কত আমদানি হয়, কত গম-চাল ইত্যাদি অন্যান্য খাতে খরচ হয়, মানুষ মাথাপিছু কত গম-চাল খায় এসবের তথ্যে না গিয়েও সাদা চোখে একটি জিনিস পরিষ্কার দেখা যায়, মানুষ আগের তুলনায় চালেভাতে অনেক ভালো আছে। এই যেমন এখন কার্তিক মাস। এ মাসকে বলা হয় ‘মরা কার্তিক’। এ সময়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অভাব-অনটন লেগেই থাকত। মানুষের কষ্টের সীমা থাকত না। এ মাসের আগের মাসে এবার চাল নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। কিছু চাল-গম আমদানি হয়েছে। চাল-গমের ‘স্টকে’ নানা সমস্যা ছিল। এতে সাময়িক অসুবিধা দেখেছি। কিন্তু এ মুহূর্তে অর্থাৎ কার্তিক মাসের মাঝামাঝি সময়ে দেশে চালের কোনো সমস্যা হচ্ছে বলে খবর পাওয়া যায়নি। যা পাওয়া যাচ্ছে, তা হচ্ছে কাজের অভাব। এ সময়ে কাজের অভাব থাকে সারা দেশে। তাই এখন ঢাকা শহরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রচুর রিকশাওয়ালা, এমনকি সুদূর ঠাকুরগাঁওয়ের রিকশাওয়ালা পর্যন্তÑযা আগে কখনও দেখিনি। এটা যেমন সত্য, তেমনি চালের অভাবে ‘মরা কার্তিকে’ মানুষ না খেয়ে আছে, এমন কথা শুনিনি। যে কুড়িগ্রাম দেশের সবচেয়ে গরিব অঞ্চল, যেখানে ৭১ শতাংশ লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে, সেখান থেকেও তেমন খারাপ খবর আসেনি। এটাও বাস্তবিক পক্ষে একটা চিত্র। এখন মুশকিল হচ্ছে তথ্য নিয়ে। তথ্য যা বলেÑবাস্তবে তা হচ্ছে না, বাস্তব যা বলেÑতথ্যে তা পাওয়া যাচ্ছে না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বলব এর একটা সুরাহা করতে। অন্য কারও কথা বললাম না। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, আর কারও কাছে কিছু বলে লাভ নেই। এমতাবস্থায় বলব তাকেই এ সমস্যার সমাধান করতে। আন্তমন্ত্রণালয় তথ্যের সমন্বয় দরকার, দরকার বিবিএসের তথ্যের গুণগত মান বৃদ্ধি। বিবিএস’র হাল আমরা জানি। যাদের দিয়ে মফস্বল থেকে খবর জোগাড় করা হয়, তাদের লেখাপড়া কীÑএসবও জানা চাই। এটাও ঠিক, অন্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যও তাইÑতাদেরও একই অবস্থা। দরকার গুণগত মান বৃদ্ধির। কারণ সঠিক তথ্যের অভাবে পরিকল্পনা করা যায় না; বাস্তব অবস্থা

বোঝা যায় না। সংশয় তৈরি হয়, ভুল বোঝাবুঝি হয়। ভীষণ সমস্যা হয়। এই যেমন এ মুহূর্তে চাল-গমের খবর। আমরা বুঝতে পারছি না আমাদের লোকসংখ্য কত, কত উৎপাদন, কত আমদানি, কত মাথাপিছু ভোগ। দয়া করে এসব ঠিক করুন।

 

অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরর সাবেক শিক্ষক