প্রচ্ছদ শেষ পাতা

তথ্য চেয়ে ছয় মাসে ৭৭ প্রতিষ্ঠানকে নোটিস

অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধি

মুস্তাফিজুর রহমান নাহিদ: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোনো প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর অস্বাভাবিকহারে বৃদ্ধি পেলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে এর কারণ জানতে চেয়ে স্টক এক্সচেঞ্জের পক্ষ থেকে নোটিস প্রদান করা হয়। জবাবে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বরাবরই জানানো হয়, তাদের কাছে শেয়ারদর বৃদ্ধি পাওয়ার মতো কোনো সংবেদনশীল তথ্য নেই।
কোম্পানির দেওয়া এমন উত্তর পেয়ে তুষ্ট থাকেন স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষ। পক্ষান্তরে দীর্ঘদিন দিন থেকে এই গৎবাঁধা উত্তর শুনতে শুনতে অতিষ্ঠ বিনিয়োগকারীরা। তাদের অভিমত, স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষ কঠোর হলে কোম্পানির পক্ষ থেকে ভিন্নধর্মী উত্তর পাওয়া সম্ভব হতো। এতে বিনিয়োগকারীরাও উপকৃত হতেন।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ চলতি মাসের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি থেকে জুন) তালিকাভুক্ত ৭৭ প্রতিষ্ঠানকে দর বৃদ্ধির কারণ জানতে চেয়ে নোটিস দিয়েছে। জবাবে প্রতিটি কোম্পানিই একই উত্তর দিয়েছে। তারা ডিএসই কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছে, কোনো মূল্য সংবেদনশীল তথ্য তাদের কাছে নেই। এরপর অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারদর বৃদ্ধি পেতে দেখা গেছে। বিষয়টিকে হাস্যকর মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি মার্চেন্ট ব্যাংকের প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
এতে উল্লেখ করা হয়েছে, কোম্পানিগুলোর মূল্য বৃদ্ধির কারণ জানতে চেয়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ কিছু কোম্পানিকে গতানুগতিক কারণ দর্শানোর নোটিস প্রদান করলেও কোম্পানিগুলো তাদের শেয়ারগুলোর এই অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধির কোনো কারণ তাদের জানা নেই বলে জানায় এবং এ বিষয়ে পরে তাদের আর কোনো কার্যকর ভূমিকা পালন করতে দেখা যায় না। এ ব্যাপারে তারা গ্রহণযোগ্য ও কার্যকর কোনো সুপারিশও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (বিএসইসি) পাঠায়নি।
এদিকে যেসব কোম্পানির শেয়ারমূল্য অতিরিক্ত বৃদ্ধি পেয়েছে, তাদের মধ্যে কিছু কোম্পানির পরিচালক অতি মূল্যের সুবিধা নিয়ে তাদের গচ্ছিত শেয়ারগুলো মার্কেটে বিক্রি করে দেয়। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তেমন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে দেখা যায়নি। এর ফলে বাধাহীনভাবে ওই শেয়ারগুলোর মূল্য বাড়তে থাকে। এর ফলে মার্কেটের সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। লাভবান হয় কতিপয় অসাধু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান।
তথ্যমতে, জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সংবেদনশীল তথ্য জানতে চেয়ে নোটিস দেওয়া কোম্পানির মধ্যে সবচেয়ে বেশি দর বৃদ্ধি পেতে দেখা গেছে সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্সের শেয়ারের। এই সময়ের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারদর ১৫ টাকা ৩০ পয়সা থেকে বেড়ে ৬৭ টাকা ৮০ পয়সায় লেনদেন হয়। শতাংশের হিসাবে দর বৃদ্ধি পায় ৩৪৩ শতাংশ। পরের অবস্থানে থাকা ইউনাইটেড ইন্স্যুরেন্সের শেয়ারদর বৃদ্ধি পায় ২২৬ শতাংশ। এ খাতের অন্য কোম্পানি প্রভাতি ইন্স্যুরেন্সের শেয়ারদর ১৪৯ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে দেখা গেছে।
কোম্পানির ভাষায় কোনো ধরনের কারণ ছাড়া এই সময়ের মধ্যে অগ্রণী ইন্স্যুরেন্সের শেয়ারদর ১৪২ শতাংশের বেশি বাড়ে। পরের অবস্থানে থাকা মুন্নু সিরামিকের শেয়ারদর বাড়ে ১১১ শতাংশ। একইভাবে মেঘনা পিইটির শেয়ারদর বাড়ে ১০৮ শতাংশের বেশি। এছাড়া তালিকায় থাকা মেঘনা কনডেন্সড মিল্ক, প্যারামাউন্ট টেক্সটাইল, সোনালী আঁশ, রেকিট বেনকিজার, ঢাকা ইন্স্যুরেন্সসহ অন্যান্য কোম্পানির শেয়ারদর সর্বনিম্ন ৩০ দশমিক ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে দেখা গেছে।
বিষয়টি নিয়ে আলাপ করলে করলে বাজারসংশ্লিষ্টরা বলেন, কোম্পানিগুলোকে নোটিস দিলে তারা উত্তর দেয়, কোনো সংবেদনশীল তথ্য নেই। কিন্তু এর কিছুদিন না যেতেই অনেকে কোম্পানিকে সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশ করতে দেখা যায়। অর্থাৎ কোম্পানিগুলো তাদের তথ্য গোপন রেখে নিজেরাই কৃত্রিমভাবে দর বৃদ্ধি করে। এ বিষয়ে তারা ডিএসইসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরও কঠোর হওয়ার আহ্বান জানান।
জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএসইর একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, কোম্পানিগুলো মূল্য সংবেদনশীল তথ্য অনেক সময় গোপন রাখে। কখনও কখনও তাদের কর্মকাণ্ডে আমরা বিষয়টি জানতে পারি। কিন্তু কোনো প্রমাণ ছাড়া আমরা কিছু করতে পারি না। এখানে আইনেরও দুর্বলতা রয়েছে। তবে আমরা বিষয়টি বিএসইসিকে জানাতে পারি, কিন্তু সবসময় তা করা হয় না।
অন্যদিকে বিষয়টি নিয়ে কথা বললে ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিনিয়োগকারীরা। তারা বলেন, কোম্পানির এই গৎবাঁধা উত্তর শুনতে শুনতে আমরা অতিষ্ঠ। অথচ ডিএসই বা বিএসইসি’কে তেমন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে দেখা যায় না। তাদের নীরবতার সুযোগ নেয় কোম্পানি কর্তৃপক্ষ।

সর্বশেষ..