মত-বিশ্লেষণ

তদন্ত ও বিচার বিড়ম্বনায় জনপ্রত্যাশা

আবুজার গিফারী: আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামোর বা সরকারের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হলো আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ ও শাসন বা নির্বাহী বিভাগ। সরকারের যে বিভাগ আইন প্রণয়ন এবং পুরোনো আইন সংশোধন ও পরিবর্তন করে তাকে আইন বিভাগ বলে। বাংলাদেশে বিদ্যমান আইনসভার নাম ‘জাতীয় সংসদ’। অন্যদিকে সরকারের যে বিভাগ আইনানুযায়ী রাষ্ট্রের শাসনকার্য পরিচালনা করে তাকে শাসন বিভাগ বলে। ব্যাপক অর্থে রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে গ্রাম্য পুলিশ পর্যন্ত সবাই শাসন বিভাগের অন্তর্ভুক্ত। আর বিচার বিভাগ বলতে বোঝায়, যে বিভাগ রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে বিচারসংশ্লিষ্ট কাজের সঙ্গে জড়িত। তবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হেনরি সিজউইক বিচার বিভাগের সংজ্ঞায়নটা একটু ভিন্নভাবে দিয়েছেন। তার মতে বিচার বিভাগ হলো সেই বিভাগ যা আইনের ব্যাখ্যা করে এবং আইনের প্রয়োগ করে। সুতরাং আইন বিভাগের কাজ হলো নতুন আইন প্রণয়ন ও পুরোনো আইন সংশোধন করা। শাসন বিভাগের কাজ হলো আইনানুসারে শাসনকাজ পরিচালনা করা এবং বিচার বিভাগের মূল কাজ হলো আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও বিচারকাজ সম্পাদন করা।

বর্তমানে আমাদের দেশে প্রতিনিয়ত নিত্যনতুন ইস্যু মিডিয়ার কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে। আবার কিছু নতুন ইস্যু তৈরি হওয়ার কারণে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছে। যে ইস্যু পত্রিকার প্রথম পাতাজুড়ে ছিল, কয়েক দিনের ব্যবধানে তার স্থান হয় পত্রিকার মাঝের বা শেষ পাতায়। সর্বোপরি একসময় ইস্যুগুলো আমাদের নজরের বাইরে চলে যায়। এ যেন সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘ছাড়পত্র’ কবিতার নতুন সংস্করণ‘এসেছে নতুন ইস্যু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান; জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত আর ধ্বংসস্তূপ-পিঠে চলে যেতে হবে পুরোনো ইস্যুকে।’

বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ তার পরিবারের ১৯ সদস্যকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবি ৩৪ বছর পর অর্থাৎ ২০১০ সালে বাস্তবায়িত হয়। তবে এখানেই বিচার বা তদন্ত শেষ হয়নি, বরং ২০২০ সালের ৭ এপ্রিল ক্যাপ্টেন (অবসরপ্রাপ্ত) আবদুল মাজেদকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ১২ এপ্রিল তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। গণমাধ্যম সূত্র থেকে জানা গেছে, বঙ্গবন্ধুর কয়েকজন খুনি আজও দেশের বাইরে অবস্থান করছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা ও দেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৯ বার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৪টি ঘটনার ক্ষেত্রে মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। তার মধ্যে কেবল চারটি মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। ১৯৮৯ সালে ধানমন্ডিতে হত্যা চেষ্টার রায় আসে ২০১৭ সালে। সময় লেগেছে ২৮ বছর। ১৯৯৪ সালে পাবনার ঈশ্বরদীতে হত্যা চেষ্টার মামলায় রায় আসে ২০১৯ সালে। সময় লেগেছে ২৫ বছর। ২০০১ সালে গোপালগঞ্জে হত্যা চেষ্টার মামলায় রায় আসে ২০১৭ সালে। সময় লেগেছে ১৬ বছর। সর্বশেষ ২০০৪ সালে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে হত্যা চেষ্টার রায় আসে ২০১৮ সালে। সময় লেগেছে ১৪ বছর।

সাগর-রুনী হত্যাকাণ্ড যেটি ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি সংঘটিত হয়েছিল। আট বছর অতিবাহিত হলেও মামলাটি নিষ্পত্তি হয়নি। কলেজছাত্রী সোহাগী জাহান তনুর হত্যা মামলাটিরও ঢিমেতাল অবস্থা। ২০১৬ সালের ২০ মার্চ গণধর্ষণের পর তাকে হত্যা করা হয়। হত্যার চার বছর পার হলেও এখনও মামলার রায় হয়নি। ২০১৩ সালের ৬ মার্চ নিখোঁজ হয় ত্বকী। নির্মমভাবে খুন হওয়ার দুদিন পর শীতলক্ষ্যা নদীর তীর থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। তারপর কেটে গেছে সাত বছর, কিন্তু এখনও মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি তদন্তকারী সংস্থা। বসুন্ধরা গ্রুপের পরিচালক হুমায়ুন কবীর সাব্বির ২০০৬ সালের ৪ জুলাই গুলশানের একটি বাড়িতে খুন হন। কেটে গেছে ১৪ বছর; কিন্তু বিষয়টির নিষ্পত্তি হয়নি, বরং বিভিন্ন মহল থেকে মামলাটি ধামাচাপা দেওয়ার জন্য কোটি কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ উঠছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া হত্যাকাণ্ডের ১৫ বছর পেরিয়ে গেলেও সুষ্ঠু বিচারের জন্য আজও প্রহর গুনছেন তার স্বজনেরা। ২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি ঈদ-পরবর্তী জনসভায় গ্রেনেড হামলায় নিহত হন কিবরিয়াসহ পাঁচ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী এবং আহত হন অন্তত ৭০ জন। ২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সামনে সন্ত্রাসী হামলার শিকার হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও লেখক ড. হুমায়ুন আজাদ। দীর্ঘ ১৬ বছর কেটে গেছে, তবুও বিচার নিষ্পত্তি হয়নি। শুধু এখানেই শেষ নয়, বরং কিছু মামলার রায় হয়ে গেলেও আসামি পক্ষ আপিল করায় আপিল পর্যায়ে আটকে আছে সহস্রাধিক মামলা। যেমন, ফেনীর মাদরাসাছাত্রী নুসরাত হত্যা, নারায়ণগঞ্জের সাত খুন মামলা, গাজীপুরের আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যা মামলা এবং বরগুনায় আলোচিত রিফাত হত্যা মামলার রায় হয়েছে, কিন্তু চারটি মামলাই বর্তমানে আপিল বিভাগে বিচারাধীন। এসব মামলার ফরিয়াদি পক্ষরা আপিল বিভাগের রায়ের আশায় অপেক্ষার প্রহর গুনছেন।

বিচার বিভাগের কাজ দেশের আইন অনুযায়ী শুধু বিচার করা। বিচার বিভাগের কাজকে সহজ করার জন্য বাংলাদেশ পুলিশ ঢের কাজ করে। অপরাধের সব তদন্তই সাধারণত পুলিশ করে থাকে। তদন্ত শেষে পুলিশ আদালতকে ফাইনাল রিপোর্ট বা চার্জশিট দিয়ে থাকে। অপরাধের অস্তিত্ব খুঁজে না পেলে ফাইনাল রিপোর্ট দেয়। যেমন, অভিযুক্ত ব্যক্তির নামে যে অভিযোগটি উঠেছে, সেটির কোনো যৌক্তিকতা নেইÑএ মর্মে রিপোর্ট। অন্যদিকে অপরাধের অস্তিত্ব খুঁজে পেলে পুলিশ আদালতের সামনে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করে। যেমন, অভিযুক্ত ব্যক্তির নামে যে অভিযোগটি উঠেছে সেটি সত্য, এ মর্মে রিপোর্ট। এই চার্জশিট বা ফাইনাল রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই বিচারকরা সাধারণত বিচার করে থাকেন। সুতরাং চার্জশিট বা ফাইনাল রিপোর্টটি অবশ্যই স্বচ্ছ হতে হবে, নতুবা বিচারিক ত্রুটি পরিলক্ষিত হবে। যেটা এ দেশের কোনো নাগরিকই আশা করে না। তবে বর্তমান সময়ে সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যাচ্ছে, পুলিশ এ দুটি তথ্য দিতে কিছু ক্ষেত্রে অন্যায়ের আশ্রয় নিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, একটি ভুল তদন্তের জন্য নিরপরাধ মানুষকে বছরের পর বছর জেলে কাটাতে হচ্ছে। সম্প্রতি জাহালম তার জ্বলন্ত উদাহরণ।

বিচার বিভাগ ১৮ কোটি মানুষের কাছে একটি পবিত্র জায়গা ও বিচার প্রার্থনার শেষ আশ্রয়স্থল। বাংলাদেশ সংবিধানে দুটি অনুচ্ছেদে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করা হয়েছে। ‘অনুচ্ছেদ ৯৪(৪)’-এ বলা হয়েছে, ‘এই সংবিধানের বিধানাবলি সাপেক্ষে প্রধান বিচারপতি এবং অন্যান্য বিচারক বিচারকার্য পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকবেন।’ অনুচ্ছেদ ১১৬ক-তে বলা হয়েছে, ‘এই সংবিধানের বিধানাবলি সাপেক্ষে বিচার-কর্মবিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিগণ এবং ম্যাজিস্ট্রেটগণ বিচারকার্য পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকবেন।’ সুতরাং আমরা বলতে পারি, আমাদের বিচার বিভাগের সম্মানিত বিচারকমণ্ডলী বিচারকাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্বাধীন। তবে বিচার বিভাগের কাছে কিছু আক্ষেপ রয়েছে সাধারণ জনগণের। যেমন, আজ বিচারের দাবি নিয়ে বা অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিতকরণে সাধারণ জনগণকে একের পর এক রাস্তায় নামতে দেখা যাচ্ছেÑকোনো সময় ধর্ষকের ফাঁসি চাই ব্যানারে, খুনির শাস্তি নিশ্চিতকরণ ব্যানারে বা কোনো সময় নিরাপদ সড়ক চাই ব্যানারে। ২০১৮ সালের জুলাই মাসে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের দাবিতে শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নামলে তাদের বিভিন্ন রকমের আশ্বাস দিয়ে ঘরে ফেরানো হয়।

রাজধানীতে ক্যাসিনো ব্যবসা চলছিল, অথচ নিরাপত্তা বাহিনী কিছুই জানে না। এটা নিঃসন্দেহে দুঃখজনক। নোয়াখালীতে মহিলার বিবস্ত্র হওয়ার দৃশ্য স্যোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়ার পরেই নিরাপত্তা বাহিনী পদক্ষেপ নেয়। জনগণ এটা চায় না, বরং তারা দেখতে চায় অপরাধ সংঘটনের আগেই নিরাপত্তা বাহিনীর কাজের তৎপরতা। আমরা স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক। আজ কেন বিচারের দাবিতে জনগণকে রাস্তায় নামতে হচ্ছে, যেখানে দেশের অভ্যন্তরীণ অপরাধ দমনের জন্য সুশৃঙ্খল পুলিশ বাহিনী রয়েছে, স্বাধীন বিচার বিভাগ রয়েছে? জনগণের প্রত্যাশা, অপরাধ সংঘটনের সঙ্গে সঙ্গেই অপরাধীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ তাকে আইনের আওতায় আনবে। অতঃপর বিচার বিভাগ অনতিবিলম্বে বিচার কাজ শেষ করে শাস্তি নিশ্চিত করবেন। আমরা দেখেছি, প্রশাসন যদি চায় তাহলে যে কোনো ঘটনার বিচারকাজ দ্রুত সম্পন্ন করা যায়। যেমন, বাগেরহাটের মোংলায় আশ্রয়ণ প্রকল্প এলাকায় পিতৃহীন সাত বছর বয়সি এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে আসামি আব্দুল মান্নান সরদারকে সাত কার্যদিবসে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছেন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল আদালত।

আইন ও শাসন বিভাগ যেন বিচার বিভাগের ওপর হস্তক্ষেপ না করতে পারে তথা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণে ২০০৭ সালে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথক করা হয়েছে। বর্তমান সংবিধানের ২২নং অনুচ্ছেদে সেটি সন্নিবেশিত হয়েছে। ইংরেজিতে একটি কথা আছে, ‘জাস্টিস ডিলেইড ইজ জাস্টিস ডিনাইড,’ অর্থাৎ বিচার বিলম্বিত হওয়া মানে বিচার না হওয়া। আমরা দেখেছি বিচার দীর্ঘদিন ঝুলে থাকলে একসময় ফরিয়াদি বা আসামি মারা যায়। এমনকি সাক্ষীদের খুঁজে পাওয়া যায় না, তদন্তকারী কর্মকর্তাও অনেক সময় থাকে না, বা অনেকে অবসরে চলে যায়। এভাবেই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে ন্যায়বিচার। ফলে সৃষ্টি হয় বিচারহীনতার সংস্কৃতি। আজ সাধারণ জনগণের বিচার বিভাগের কাছে প্রত্যাশা হলোÑদ্রুত মামলা নিষ্পত্তি, বিচারের ক্ষেত্রে দলমত বিচার না করে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা এবং রায় যথাসময়ে কার্যকর করে মামলা জট কমিয়ে জনগণের অর্থ ও সময় সাশ্রয় করা, সর্বোপরি একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা।

শিক্ষার্থী

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..