প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য: প্রধানমন্ত্রীর বিমানে ত্রুটি মনুষ্যসৃষ্ট

নিজস্ব প্রতিবেদক: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বহনকারী হাঙ্গেরিগামী বিমানে মনুষ্যসৃষ্ট যান্ত্রিক ত্রুটি উদ্দেশ্যমূলক কি না, তা জানতে সুনির্দিষ্টভাবে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা হবে বলে জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন।

বিমান মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর সচিবালয়ে রোববার এক সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী এ কথা জানান।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হাঙ্গেরির বুদাপেস্টে ‘পানি শীর্ষ সম্মেলন-২০১৬’-এ অংশ নিতে ২৭ নভেম্বর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি বিমানে ঢাকা ত্যাগ করেন। হাঙ্গেরি পেঁৗঁছার আগেই যান্ত্রিক ত্রুটিতে প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী  বিমানটি তুর্কেমেনিস্তানের আশখাবাদে জরুরি অবতরণ করে।

এ ঘটনায় ২৮ নভেম্বর বিমান ও পর্যটন, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস এবং বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) আলাদাভাবে কমিটি গঠন করে।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে গত ৩০ নভেম্বর বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বিমানের ইঞ্জিনিয়ারিং ও কারিগরি বিভাগের ছয় কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করার কথা জানান।

মন্ত্রী তখন জানিয়েছিলেন, তেল চলাচলের পাইপে একটি নাট ঢিলা হওয়ার কারণে জ্বালানির চাপ কমে যাওয়ায় উড়োজাহাজকে জরুরি অবতরণ করতে হয়েছে। এক্ষেত্রে হিউম্যান ফেইল্যুর ফ্যাক্টর (মানুষ্য গাফিলতিজনিত বিষয়) প্রধান বলে কমিটি চিহ্নিত করেছে বলেও জানিয়েছিলেন মন্ত্রী।

সর্বশেষ এ ঘটনায় গত ১৪ ডিসেম্বর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের তিনজন শীর্ষ প্রকৌশলীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

বিমানমন্ত্রী বলেন, ‘বিমানের ওয়েল প্রেসার কমে যাওয়ার কারণ সেখানকার বি নাটটি ঢিলা ছিল। একপর্যায়ে এটা নিশ্চিতভাবে বিপজ্জনক হতে পারত। আমাদের সৌভাগ্য আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার কোনো ক্ষতি সাধন হয়নি। কিন্তু এর চেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন আর আসতে পারে না।’

তিনি বলেন, ‘ইতোমধ্যে তার জীবননাশের জন্য বহুবার চেষ্টা হয়েছে। কখনও একেবারে প্রকাশ্যে, কখনও গোপনে। সেক্ষেত্রে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করার জন্য তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।’

গত ১০ ডিসেম্বর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে রিপোর্টের ভিত্তিতে ছয়জন ও পরবর্তী সময় আরও তিনজনসহ মোট ৯ জনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে বলেও জানান মন্ত্রী।

রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন জমা দেওয়ার শেষ সময় ছিল গত বৃহস্পতিবার। তারা আজকে (রবিবার) সকালে প্রতিবেদন তুলে দিয়েছে। বেবিচকের তদন্ত প্রতিবেদনটি ইতোমধ্যে বেবিচকের চেয়ারম্যানের কাছে প্রদান করা হয়েছে। তিনি মেইলে সুপারিশগুলো পাঠাচ্ছেন। তবে মূল বিষয়গুলো আমরা জেনেছি।’

তিনটি তদন্ত প্রতিবেদনেই একটি বিষয় এসেছে জানিয়ে বিমানমন্ত্রী বলেন, ‘পুরো ঘটনাটি অর্থাৎ বি-নাট ঢিলা হওয়ার ব্যাপারটি মনুষ্যসৃষ্ট। তিনটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, এখানে হিউম্যান ফ্যাক্টর ইনভলভ। তবে এ হিউম্যান ফ্যাক্টরটি কি ইনটেশনাল (উদ্দেশ্যমূলক) নাকি আনইনটেশনাল স্বাভাবিকভাবেই এ তদন্ত কমিটিগুলোর পক্ষে সেটা নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি আমাদের যা সাজেস্ট করেছেন ইতোমধ্যে তা আমরা বিবেচনায় নিয়েছি। সেটি হলো এখন নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে এটা কোনো নাশকতামূলক কাজ কি না অথবা অবহেলাজনিত কোনো কাজ কি না সেটা নির্ধারণ করতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এক্ষেত্রে নাশকতার সামান্যতম প্রমাণ পাওয়া গেলে সর্বোচ্চ শাস্তির যে বিধান, অন্যায়ে যে বিধান রয়েছে, সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

‘তিনটি তদন্ত প্রতিবেদন সমন্বিত করে সারসংক্ষেপ তৈরি করে দু-এক দিনের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীসহ তার কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে দেব। সেখানে বসেই সুনির্দিষ্ট করা হবে পরবর্তী পদক্ষেপগুলো কী হবে’ বলেন রাশেদ খান মেনন।

তিনি আরও বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে নিরাপত্তাজনিত সাতটি, ভিভিআইপি ফ্লাইটের নিরাপত্তা নিশ্চিতে চারটি, বেবিচকের জন্য তিনটি, বিমানের জন্য ১০টি সুপারিশ রয়েছে। আর মন্ত্রণালয়ের বিষয়ে বলা হয়েছে, বিমানের ব্যাপারে আরও তাদের কার‌্যাবলি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা। প্রয়োজনে সে সে কার‌্যাবলিতে হস্তক্ষেপ করা, এজন্য যে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়, এখানে আইনের প্রশ্ন হয়তো থাকবে। সে ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য মন্ত্রণালয়কে বলা হয়েছে।’

মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটিতে কতজনকে দায়ী করা হয়েছে জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, ‘সাসপেন্ড হওয়ার ৯ জন তো আছেই। আরও হয়তো এর মধ্যে যুক্ত হবে। তাই সংখ্যা বলাটা এ মুহূর্তে যুক্তিযুক্ত হবে না।’

বিমানের বরখাস্ত হওয়ার ৯ কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে কি নাÑএকজন সাংবাদিক জানতে চাইলে রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘সবার বিরুদ্ধে মামলা করা হবে কি না তা পরীক্ষা করা হচ্ছে। সুপারিশ রয়েছে সুনির্দিষ্টভাবে মামলা করার জন্য, আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য। এটা করা ছাড়া আমাদের সামনে কোনো পথ নেই।’

মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে সুপারিশে এসওপি (স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর) যুগোপযোগী করার কথা বলা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

মামলা কারা করবে এ বিষয়ে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানাব, আমাদের পক্ষ থেকে যদি করতে হয় তবে আমরা করব অথবা বিমান করবে। যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া দেখে এটা ঠিক করা হবে।’

এ ঘটনায় মন্ত্রী হিসেবে আপনার দায় আছে কি নাÑএকজন সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘আমি তো নৈতিক দায় সব সময়ই স্বীকার করি। তার মানে এই নয় যে আমার দায় আছে। আপনাদের বিবেচনায় যদি থাকে, তবে তাই।’

এ সময় বিমান ও পর্যটনসচিব এসএম গোলাম ফারুক উপস্থিত ছিলেন।