দিনের খবর শেষ পাতা

তদারকি জোরদার করছে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ

জেল-জরিমানা নয়

আয়নাল হোসেন: খাদ্যপণ্য উৎপাদক, পরিবেশক ও বিক্রেতাদের এখন থেকে হঠাৎ জেল-জরিমানা না করে তাদের মোটিভেশন কার্যক্রম জোরদার করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ)। খাদ্যপণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে নিরাপদ খাদ্য আইন ও প্রবিধানমালা যাতে যথাযথ অনুসরণ করা হয় সে লক্ষ্যে ব্যবসায়ীদের মোটিভেশন বা উৎসাহ দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এজন্য সরকারের সবগুলোকে সংস্থাকে এক ছাতার নিচে আনারও ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

জানা গেছে, দেশে একসময় খাদ্য সংকট ছিল। মানুষ দুই বেলা পেটভরে খেতে পারতেন না। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি উন্নয়নের কারণে মানুষ এখন আর খাদ্য সংকটে নেই। দেশের প্রায় সব ধরনের খাদ্যই উৎপাদন হচ্ছে। তবে দেশে নিরাপদ খাদ্যের সংকট রয়েছে। একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী নিজেরা দ্রুত ধনী হওয়ার জন্য খাদ্যপণ্যে নানা ধরনের ভেজাল মেশাতেন। উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের অজ্ঞতার কারণে পণ্যে নানা ধরনের অপদ্রব্য মিশ্রিত করছে। আবার অনেকে জেনেশুনেই অপরাধে জড়িয়ে পড়তেন। এ অবস্থা থেকে মানুষকে নিরাপদে রাখতে ১৯৫৯ সালে সরকার পিউর ফুড অর্ডিন্যান্স জারি করে। এরপর ১৯৮৫ সালে বিএসআই আইন, ২০০৯ সালে জাতীয় ভোক্তা অধিকার আইন, ভ্রাম্যমাণ আদালত আইন এবং সর্বশেষ ২০১৩ সালে নিরাপদ খাদ্য আইন তৈরি করে সরকার। খাদ্যপণ্য উৎপাদনে কেউ যাতে ভেজাল উপকরণ মিশ্রিত করতে না পারে সেজন্য নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ দেশের সবগুলো সংস্থাকে এক ছাতার নিচে আনার চেষ্টা করছে। এরই ধারাবাহিকতায় সংস্থাটি এখন ব্যবসায়ীদের জেল-জরিমানার পরিবর্তে প্রথমে তাদের মোটিভেট করার কাজ হাতে নিয়েছে। তাদের এই কার্যক্রমকে সাধুবাদ জানিয়েছে বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান।     

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান এ প্রসঙ্গে শেয়ার বিজকে

বলেন, মোটিভেশন করে যদি ব্যবসায়ীদের সৎ পথে আনা যায়, এর চেয়ে ভালো কিছু আর হতে পারে না। তবে যারা জেনেশুনে খাদ্যে ভেজাল করবে তাদের শাস্তির আওতায় আনতে

হবে। একই সঙ্গে যারা প্রথমবার অপরাধ করবে তাদের ক্ষমতা করা যেতে পারে। কিন্তু বারবার একই অপরাধ করা হলে তাকে ক্রমান্বয়ে শাস্তির পরিমাণ বাড়িয়ে আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন তিনি।

বাংলাদেশ ব্রেড বিস্কুট ও কনফেকশনারী প্রস্ততকারক সমিতির সভাপতি জালাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের নৈতিক দায়িত্ব উৎপাদকদের মোটিভেট করা। আমরা চাই মোটিভেট হতে। যাকে কোনোদিন পড়ানো হয়নি, তাকে হঠাৎ করে পরীক্ষা নেয়া হলে তিনি কী সেটি পারবেন?’ তিনি বলেন, দেশের মানুষ সনাতন পদ্ধতিতে নানা ধরনের খাদ্যপণ্যের ব্যবসা করে আসছেন। সরকারের কোনো সংস্থার পক্ষ থেকে তাদের কখনোই কোনো প্রশিক্ষণ দেয়া হয়নি। কিন্তু হঠাৎ করে প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে জেল-জরিমানা করছে, যা মোটেও কাম্য নয়। কারখানায় পরিদর্শন বা অভিযানের সময় যদি কোনো ত্রুটি পাওয়া যায় সেজন্য সংশ্লিষ্টদের তা সমাধানের পথ এবং তা উত্তরণে সময় দেয়া যেতে পারে বলে জানান তিনি।   

খাদ্য স্পর্শক প্রবিধানমালার ছয় ধারায় মান নিশ্চিতকরণের বিষয়ে বলা আছে। এতে বলা হয়, খাদ্য স্পর্শক ব্যবসায়ী খাদ্য স্পর্শকের মান নিশ্চিতকরণের জন্য নিম্নোক্ত বিষয়সমূহ মেনে চলবে। যথা: (ক) খাদ্য স্পর্শক উৎপাদন এবং উহা সংরক্ষণের যথাযথ মান নিয়ন্ত্রণ; (খ) খাদ্য স্পর্শক উৎপাদনে উৎকৃষ্টমানের কাঁচামালের ব্যবহার; (গ) খাদ্য স্পর্শক উৎপাদনের ক্ষেত্রে ব্যবহƒত কাঁচামাল নির্বাচনে প্রযোজ্য বিধিবিধান প্রতিপালন; (ঘ) খাদ্য স্পর্শক স্থাপনায় যন্ত্রপাতির সঠিক ব্যবহার; (ঙ) খাদ্য স্পর্শক উৎপাদন, ব্যবহার ও বিন্যাসে পর্যাপ্তসংখ্যক প্রশিক্ষিত ও দক্ষ জনবল নিয়োগ; (চ) খাদ্য স্পর্শক উৎপাদনে ব্যবহƒত যন্ত্রাংশের পরিচ্ছন্নতা ও যথাযথ বিন্যাস; এবং (ছ) খাদ্য স্পর্শক বস্তু ও বস্তুকণার সমষ্টির সুনির্দিষ্ট ও সামগ্রিক নির্গমনের পরিমাণ প্রবিধান ৩(২) এ উল্লিখিত সংস্থাসমূহ কর্তৃক স্বীকৃত সর্বশেষ সীমার মধ্যে হতে হবে বলে এই ধারায় বলা আছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশে এক সময় খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারীরা দ্রুত অর্থ উপার্জনের জন্য তাদের পণ্যে নানা ধরনের ভেজাল উপকরণ মিশ্রিত করতেন। 

জানতে চাইলে পণ্যের মান প্রণয়ন ও নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন-বিএসটিআইয়ের পরিচালক (সিএম) প্রকৌশলী সাজ্জাদুল বারী শেয়ার বিজকে বলেন, বিএসটিআইয়ের ম্যাজিস্ট্রেটরা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সময় সংশ্লিষ্টদের মোটিভেট করছেন। যারা অপরাধ করছেন তাদের ন্যূনতম জরিমানার আওতায় আনছেন। উৎপাদনকারীরা যাতে কোনো অপদ্রব্য মিশ্রিত না করেন সে ব্যাপারে মোটিভেশনের কাজ চলমান রয়েছে বলে জানান তিনি।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের পরিচালক ড. সহদেব চন্দ্র সাহা শেয়ার বিজকে বলেন, খাদ্যপণ্য উৎপাদক, পরিবেশক ও বিক্রেতারা যাতে নিরাপদ খাদ্য আইন ও এর প্রবিধানমালা যথাযথ অনুসরণ করে সে ব্যাপারে তাদের মোটিভেশনের কাজ চলছে। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের গাইডলাইন অনুযায়ী চেকলিস্ট তৈরি করা হয়েছে। এতে প্রতিষ্ঠানের মালিক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শ্রমিকরা যাতে নিয়মকানুন মেনে তাদের পণ্য উৎপাদন করে সে বিষয়ে মনিটরিং জোরদার করা হয়েছে। এখন থেকে ব্যবসায়ীরা আর আতঙ্কে থাকবেন না, তাদের প্রতিষ্ঠানে অভিযানে যাওয়ার পর জেল-জরিমানা না করে তাদের ত্রুটিগুলো চিহ্নিত করে সময় দেয়া হবে। এভাবে সবাই নিয়ম মেনে চললে কারও মনেই ভয়ভীতি কাজ করবে না বলে জানান তিনি।   

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..