প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

তবু বিনিয়োগে কমতি কেন?

গতকালের শেয়ার বিজে প্রকাশিত ‘ব্যাংকিং খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য : লাইবোরের কাছাকাছি দেশের কলমানি রেট’ শীর্ষক খবরটি এরই মধ্যে অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। আমাদের প্রতিনিধি জানাচ্ছেন, দেশে কলমানি রেট বর্তমানে এতটাই নিচে অবস্থান করছে যে, তা আন্তর্জাতিক লেনদেনে আন্তব্যাংক সুদহার নির্ধারণকারী প্রতিষ্ঠান লন্ডন লাইবরের অফার রেটের কাছাকাছি চলে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও লাইবর ওয়েবসাইট সূত্রে জানা যায়, জানুয়ারিতে লাইবরে গড় কলমানি রেট ছিল দুই দশমিক ৫০ শতাংশ; যেখানে একই সময়ে বাংলাদেশের গড় কলমানি রেট ছিল তিন দশমিক ৫০ শতাংশ। স্পষ্টত মাসিক গড় হিসাবে লাইবর রেটের সঙ্গে বাংলাদেশের কলমানি রেটের পার্থক্য মাত্র এক শতাংশ। তবে এটা গড় মাসিক হিসাব। দৈনিক ও সাপ্তাহিক হিসাবে লাইবর অফার রেট এবং আমাদের কলমানি রেট নাকি আরও কাছাকাছি চলে যায়।

ভাবনার আরও বিষয় রয়েছে। ঘটনাটিকে বিচ্ছিন্ন হিসেবে নেওয়ার সুযোগ কম। প্রাপ্ত তথ্যমতে, এক বছর আগেও লাইবরের গড় রেট ও বাংলাদেশের কলমানি রেটের পার্থক্য ছিল এক দশমিক ৬৫ শতাংশ! প্রসঙ্গত বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ও নির্বাহী পরিচালক ড. মো. আক্তারুজ্জামান শেয়ার বিজের কাছে মন্তব্যে জানিয়েছেন, ‘বাংলাদেশের কলমানি রেট লাইবরের রেটের কাছাকাছি হলেও তা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে খুব বেশি প্রভাব ফেলবে বলে মনে হয় না। ব্যাংকগুলোর ঋণ চাহিদা কমলে কলমানি রেটও কমবেÑএটাই অর্থনীতির স্বাভাবিক গতি।’ কেউ কেউ তার প্রথম মন্তব্যের সঙ্গে একমত যে, কলমানি রেটের ওই ব্যবধান অর্থনীতিতে তেমন প্রভাব ফেলতে সক্ষম হবে না। বিষয়টি ঘুরিয়ে এভাবেও দেখা যায়, কলমানি রেটের ব্যবধান কমছে মানে স্থানীয় অর্থনীতিতে বেসরকারি ঋণ তথা বিনিয়োগ চাহিদা কমছে। আর তা নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকও যে চিন্তিত, সেটি বোঝা যায় জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে বাংলাদেশ ব্যাংক জারিকৃত সার্কুলার দেখে। সেখানে বলা হয়, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কলমানি মার্কেট থেকে ঋণ গ্রহণের সীমা বাড়ানো হয়েছে। আগে নিট সম্পদের ১৫ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ নেওয়া যেতো; এখন ইকুইটির ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ নেওয়া যাবে!

স্পষ্টত ইস্যুটিকে টেকনিক্যালি দেখানোর সুযোগ নেই। বরং আলোচ্য ঘটনা নির্দেশ করে, এখন আশানুরূপ বিনিয়োগ হচ্ছে না দেশে। তার কারণ কীÑসেটি খতিয়ে দেখা দরকার। দেশে একটা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রয়েছে অনেক দিন ধরে। সরকার অবকাঠামো উন্নয়নে জোর দিয়েছে। তারপরও বিনিয়োগে কাক্সিক্ষত গতিশীলতা নেই কেন? কারও কারও ধারণা, এখানে সুলভে গ্যাস-বিদ্যুৎ প্রাপ্তি একটা ফ্যাক্টর। সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধিতে জোর দিয়েছে এবং তাতে উৎপাদনও বেড়েছে অনেকটা। তবে বলা যাবে না, উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি গ্যাস-বিদ্যুৎ বাবদ ব্যয় সহনীয় রাখার জন্য নেওয়া হয়েছে জোর প্রচেষ্টা। দ্বিতীয়ত, বড় বিনিয়োগ স্বভাবত কম ঘটে। বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি বিনিয়োগ অন্যতম ভরসা। সেক্ষেত্রে আমাদের জন্য বিশেষ বিপত্তি হলো, ব্যাংক থেকে বৃহৎ ঋণগ্রহীতারা যত সহজে ও যে পরিমাণ ঋণ পানÑতা ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের কপালে জোটে না। তাদের জন্য একদিকে ঋণ প্রক্রিয়াটা যেমন জটিল, তেমনি প্রকৃতপক্ষে যতটুকু ঋণ দরকার, ততটুকু পান না। উপরন্তু সন্ত্রাসবাদে অর্থায়নের হুমকি সৃষ্টি করেছে বাড়তি জটিলতা। এক্ষেত্রে স্বভাবতই সন্দেহ চাপে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ওপর। সার্বিক বিনিয়োগ বাড়াতে এসব সমস্যার সৃজনশীল সমাধানই কাম্য।