সুশিক্ষা

‘তরুণদের বিশ্বমানের কর্মদক্ষ করে তোলা সিকেএইচ নেটওয়ার্কের লক্ষ্য’

মো. কামরুল হাসান ইন্টারন্যাশনাল স্পিকার ও কোচ। তিনি সিকেএইচ (কোচ কামরুল হাসান) নেটওয়ার্কের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও। একইসঙ্গে সেনসি-উইসডমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। সম্প্রতি এক আলাপচারিতায় তার ক্যারিয়ার, সফলতার গল্প ও সিকেএইচ নেটওয়ার্কের নানা বিষয় উঠে আসে। পাঠকদের জন্য তা সংক্ষেপে তুলে ধরেছেন হাসানুজ্জামান পিয়াস

ক্যারিয়ারের পেছনের গল্প থেকে শুরু করতে চাই

মো. কামরুল হাসান: ১৯৯৪ সালে এসএসসি পরীক্ষা দিলাম। বেশ ভালো রেজাল্ট হলো। সিদ্ধান্ত নিলাম, ঢাকায় আসব। বাংলাদেশের অন্যতম সেরা ঢাকা কলেজে পড়তেই হবে, এমন ইচ্ছা ছিল তখন। ভর্তিও হলাম ঢাকা কলেজে। শুরুটা ভালো হলেও ধীরে ধীরে জীবন বাঁক নিল। ১৭ বছরের কিশোর তখন। এর সঙ্গে যোগ হলো উদ্দাম স্বাধীনতা। এ দুইয়ে মিলে যেটা হওয়ার সেটাই হলো। পড়ালেখা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লাম। এইচএসসি পরীক্ষায় খারাপ রেজাল্ট হলো। জীবনে প্রথম ধাক্কা খেলাম! কিন্তু না, হার মানা যাবে না। ঘুরে দাঁড়ালাম, সিদ্ধান্ত নিলাম, থামা যাবে না। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম। মুখোমুখি হলাম জীবনের এক কঠিন বাস্তবতার। নিজের উপার্জনে পড়ালেখা চালাতে হবে। শুরু হলো নিজের উপার্জনে পথচলা।

১৯৯৭ সালে ঢাকার রাস্তায় এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা বিক্রি শুরু করলাম। গুলশানের সিগন্যালে বই বিক্রি করি। এখনও নিজের গাড়িতে চলার সময় কোনো কিশোরকে বই বিক্রি করতে দেখলে এক মুহূর্তের জন্য হলেও থমকে যাই। আল্লাহর অশেষ মেহেরবানিতে আমার ইচ্ছাশক্তি ও বিশ্বাসের বলে চাকরি পেয়ে যাই। মার্কেট অ্যাকসেস নামের সে প্রতিষ্ঠানে খণ্ডকালীন চাকরি শুরু করি। এরপর ভ্যানিকে (বর্তমানে লংকাবাংলা) যোগ দিই। কাজ ছিল ক্রেডিট কার্ড বিক্রি করা। এ কার্ড বিক্রি একদিন আমাকে পৌঁছে দিল এইচএসবিসি ব্যাংকের গুলশান ব্র্যাঞ্চের দরজায়। আমার কাজের দক্ষতা ও নিষ্ঠা দেখে সেখানকার ম্যানেজার মেজবাহ উদ্দিন আহমেদ আমাকে চাকরির অফার দিলেন। তখনও আমার গ্র্যাজুয়েশন শেষ হয়নি। ২০০১ সালে এইচএসবিসি ব্যাংকে যোগ দিই। এরপর আর থামিনি কোনোদিন।

ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট

কামরুল হাসান: এইচএসবিসি ব্যাংকে যোগ দেওয়ার আগে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে খণ্ডকালীন চাকরি করেছি, রাস্তায় বই বিক্রি করেছি। তবে ক্যরিয়ারের শুরুতে এইচএসবিসি’র মতো বহুজাতিক একটি ব্যাংকে চাকরি পাওয়া সত্যিই জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। এজন্য আমি সবসময় ধন্যবাদ দিতে চাই মেজবাহ উদ্দিন ভাইকে। ২০০১ থেকে ২০১৯-এই ১৮ বছরে কাজ করেছি এইচএসবিসি, জেটিই, এরিকসন, হুয়াওয়ে, ডান অ্যান্ড ব্র্যাডশিট ও ব্র্যাক ব্যাংকে। চাকরির ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য ২০১৪ সালে ব্র্যাক ব্যাংক চেয়ারম্যান এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড অর্জন করি। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, চীন, ভারত, থাইল্যান্ড, ইংল্যান্ড, নেপাল, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রশিক্ষণ নিয়েছি। রবিন শর্মা, জন ম্যাক্সোয়েল, মার্শাল গোল্ডস্মিথ, পল মার্টেনেলি, ড. পিটার চি, রঞ্জন দে সিলভাসহ সাকসেস ম্যাগাজিন-খ্যাত ড্যারেন হার্ডির মতো খ্যাতনামা প্রশিক্ষকদের কাছে প্রশিক্ষণ নিয়েছি। বিশ্ববিখ্যাত জন ম্যাক্সওয়েল থেকে পেলাম ইন্টারন্যাশনাল স্পিকার অ্যান্ড কোচ সার্টিফিকেট। ২০১৭ সালে সেনসি ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে যৌথভাবে শুরু করি নিজের প্রতিষ্ঠান সেনসি উইসডম।

প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে এসে কীভাবে নিজেকে বিশ্বমানের করে গড়ে তুলেছেন?

কামরুল হাসান: ছোটবেলা থেকেই বিশ্বাস আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি ছিল আমার চলার পথের সঙ্গী। যদি এককথায় বলি-ব্যক্তিগত উন্নয়নের প্রচণ্ড আকাক্সক্ষা ছিল। সবাই জীবনে সফল হতে চায়। চায় জীবনের নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে। কিন্তু জীবনের লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজন অধ্যাবসায়, নিজেকে দক্ষ করে গড়ে তোলা ও মানসিক বিকাশ ঘটানো। এ সবকিছুর জন্য প্রয়োজন ব্যক্তিগত উন্নয়ন। পৃথিবীতে যারাই সফল তারা সবাই ব্যক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে এগিয়ে গেছেন, বাস্তবায়ন করেছেন তাদের স্বপ্নকে। সাধারণ মানুষ যেখানে থেমে যায়, অসাধারণের যাত্রা সেখান থেকে কেবল শুরু হয়।

কোচ কামরুল হাসান নেটওয়ার্কের যাত্রা যেভাবে

কামরুল হাসান: বিগত ১৮ বছরের করপোরেট অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণের কল্যাণে বাংলাদেশের চাকরির সামগ্রিক চিত্র কাছে থেকে দেখেছি। দেশ-বিদেশে ভ্রমণ ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জেনেছি বিশ্ব এখন কোন দিকে ধাবিত হচ্ছে এবং আমরা কোথায় আছি। সিকেএইচ নেটওয়ার্কের যাত্রা শুরু হলো এ ধারণা থেকে। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা, যারা আগামী দিনের ভবিষ্যৎ, তাদের কীভাবে বিশ্বমানের করে গড়ে তোলা যায় সে লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি।

সিকেএইচ নেটওয়ার্ক সম্পর্কে একটু বিস্তারিত বলবেন কি

কামরুল হাসান: আগেই উল্লেখ করেছি, সিকেএইচ নেটওয়ার্ক বাংলাদেশের তরুণ ছাত্রসম্পদকে বিশ্বমানের করে গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। দেশের তরুণরা অত্যন্ত মেধাবী। অনেক উন্নত দেশের তরুণদের তুলনায় আমাদের তরুণরা কাজ করতে ভালোবাসে। কিন্তু তার পরও দেশে শিক্ষিত বেকারের হার বাড়ছে। এটি দুঃখজনক। এর অন্যতম কারণ প্রথাগত শিক্ষা ব্যবস্থাপনার সঙ্গে বাজারের চাহিদার বিশাল গ্যাপ। বিশ্ববাজার এখন যা চাচ্ছে, সেই আদলে তৈরি হচ্ছে না আমাদের তরুণরা। তাই তারা অনেকেই ভুগছে হতাশায়, কেউ কেউ অন্যায় পথেও পা বাড়াচ্ছে। তাই তরুণদের কর্মদক্ষ করে গড়ে তোলাই আমাদের একমাত্র কাজ। এজন্য আমরা তাদের বিশ্বসেরা ইন্ডাস্ট্রি লিডারদের কাছ থেকে প্রফেশনাল মেন্টরশিপ, ক্যারিয়ার গাইডলাইন, পরিকল্পনা, চাকরির জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় সফট স্কিল, ওয়ার্কশপ, লিডারশিপসহ নানা প্রশিক্ষণ দিচ্ছি এবং দেব।

সিকেএইচ নেটওয়ার্ক বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য এনেছে গ্লোবাল সফট স্কিলের একটি প্ল্যাটফর্ম। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ওয়াধানি ফাউন্ডেশন এক যুগের বেশি সময় ধরে তৈরি করা তাদের সফট স্কিল কোর্সটি এখন পৌঁছে দেবে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের কাছে। এটি সম্ভব হয়েছে সিকেএইচ নেটওয়ার্ক ও ওয়াধানি ফাউন্ডেশনের মধ্যে চুক্তির মাধ্যমে। আশা করি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পাশাপাশি আমাদের প্রশিক্ষণ ও ওয়ার্কশপে অংশ নেওয়া ছেলেমেয়েরা বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে পারবে। এছাড়া সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরির ব্যবস্থাও করে দিচ্ছে সিকেএইচ নেটওয়ার্ক।

সিকেএইচ নেটওয়ার্ক নিয়ে আপনার পরিকল্পনা

কামরুল হাসান: আমি চাই, দেশের একজন শিক্ষিত ছেলেমেয়েও বেকার থাকবে না। সিকেএইচ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ২০২০ সালের মধ্যে এক লাখ তরুণকে চাকরি ও উদ্যোক্তা করে গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছি। আর আগামী ১০ বছরে আমাদের চাওয়াÑদেশের সব তরুণ কর্মদক্ষ হয়ে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখবে। সিকেএইচ নেটওয়ার্ক অল্প কিছুদিনের জন্য কাজ করতে আসেনি, দেশের তরুণদের দিগ্ভ্রান্ত স্বপ্ন দেখাতেও চাই না। আমরা চাই দেশ ও আমাদের তরুণসম্পদের উন্নয়ন। আমরা বিশ্বাস করি, দেশের অপার সম্ভাবনাময় তরুণদের নিয়ে আমরা একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের পথে এগিয়ে যাব।

তরুণদের জন্য করণীয় তাদের উদ্দেশে আপনার পরামর্শ

কামরুল হাসান: নতুন করে ভাবুন, নতুনভাবে ভাবতে শিখুন। সবকিছু উপেক্ষা করে লক্ষ্যস্থির করুন। সাধারণ কোনো কিছুতে সন্তুষ্ট না থেকে সব সময় নিজেকে আরও দক্ষ করার জন্য উদ্যমী হোন। দেখবেন আপনিও হয়ে উঠবেন সাধারণ থেকে অসাধারণ।

শুধু মোটিভেশন দিয়ে উন্নতি সম্ভব নয়। বলা হয়, ‘গড়ঃরাধঃরড়হ রিঃযড়ঁঃ ফরৎবপঃরড়হ রং ধ ফবংঃৎঁপঃরড়হ!’ দেশের তরুণদের মধ্যে অপার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু যথাযথ দিকনির্দেশনার অভাবে বিশ্বমানের মেধা নিয়েও দেশ-বিদেশে আমাদের ছেলেমেয়েদের কর্মজীবনে সাফল্যের হার এখনও বেশ কম। আমাদের এ ছাত্রসম্পদকে আগামী দিনের জন্য গড়ে তোলার দায়িত্ব কাদের? সমাজে যারা কর্মক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকায় রয়েছেন, তাদের। সরকারের পাশাপাশি আমাদেরও এগিয়ে আসতে হবে। তাই সে লক্ষ্য নিয়ে তাদের সার্বিক উন্নয়নে কাজ করে চলছে সিকেএইচ নেটওয়ার্ক।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..