প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

তলিয়ে গেছে শতাধিক একর জমির ফসল

ফরিদপুরে পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধি

কে এম রুবেল, ফরিদপুর: গত কয়েকদিন ধরে বেড়েই চলেছে পদ্মার পানি। ফরিদপুরে পদ্মার পানি বৃদ্ধির ফলে ইতোমধ্যে তলিয়ে গেছে নিন্মাঞ্চলের শতাধিক একর জমির ফসল। এর মধ্যে বেশিরভাগই বাদাম। এছাড়া তিল ও ধান রয়েছে। পদ্মার নিন্মাঞ্চলের এসব জমিতে আবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন চরাঞ্চলে বসবাসরত মানুষ। উজান থেকে নেমে আসা পানিতে জমির ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় দুঃচিন্তায় পড়েছে এসব মানুষ। পানি বৃদ্ধি চলমান থাকলে আরও ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে।

গতকাল ফরিদপুর সদর ইউনিয়নের বাদুল্লা মাতুব্বরের পালডাঙ্গি গ্রামের কাজীবাড়ী ঘাট এলাকায় দেখা যায়, পানিতে তলিয়ে যাওয়া বাদাম তুলছেন ক্ষতিগ্রস্ত চাষিরা।

ক্ষতিগ্রস্ত চাষি মোশারফ হোসেন বলেন, বাদাম এখনও তোলার উপযোগী হয়নি। তার পরেও তুলতে হচ্ছে। দুই বিঘা জমির বাদাম পানিতে তলিয়ে গেছে। লাভ তো দূরে, আসল টাকাই উঠবে না এ বছর।

পালডাঙ্গি এলাকার চাষি রমজান ভ‚ইয়া জানান, আট বিঘা জমিতে বাদাম চাষ করেছিলাম। ৪-৫ দিন পদ্মার পানি বৃদ্ধির ফলে সব জমির বাদাম তলিয়ে গেছে। আর মাত্র ১৫ দিন থাকলে বাদাম পরিপক্ব হয়ে যেত। কিন্তু এখন বাদাম তুলে ফেলতে হচ্ছে। এ বাদাম এখনও পরিপক্ব হয়নি। তুলে নিয়ে গরু, ছাগলকে খাওয়াব। অনেক ক্ষতি হয়ে গেল।

আরেক চাষির স্ত্রী সুফিয়া বেগম বলেন, এক একর জমিতে বাদাম চাষ করেছিলাম। আবাদ করতে খরচ হয়েছিল ৩০ হাজার টাকা। এ বাদাম বিক্রি করেই আমাদের সারা বছরের সংসার খরচ চলে, কিন্তু এ বছর সব শেষ হয়ে গেল। গত কয়েকদিন ধরে পদ্মার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় অপরিপক্ব বাদাম তুলে ফেলতে হচ্ছে। এ বাদাম গরুকে খাওয়ানো ছাড়া আর কিছুই করা যাবে না।

আরেক চাষি শেখ জুলমত বলেন, ১০ বিঘা জমিতে বাদাম ও তিল আবাদ করেছিলাম। আর ১০ দিন থাকলে ভালোভাবে ফসল ঘরে উঠাতে পারতাম। পানি বৃদ্ধির ফলে এখনই তুলে ফেলতে হচ্ছে। শুধু আমাদের এলাকা নয়, চরাঞ্চলের একশ একরের বেশি জমিতে লাগানো বাদাম, তিল ও ধান নষ্ট হয়ে গেছে। চাষিরা অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে।

চাষি রাশেদ হোসেন বলেন, চরাঞ্চলের মানুষের জীবিকা নির্বাহের অন্যতম মাধ্যম বাদাম চাষ। এ বাদাম চাষ করেই যা রোজগার হয় তা দিয়েই সারা বছরের সংসার চলে। কিন্তু হঠাৎ করে পদ্মার পানি বেড়ে যাওয়ায় ফসল নষ্ট হয়ে গেল। অনেক চাষি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে সহায়তা পেলে এ চাষিরা বেঁচে থাকতে পারবে।

চর ঝাউকান্দা ইউনিয়নের চর গোপালপুর গ্রামের কৃষক মো. রফিক বলেন, আমার জমির আউশ ধান তলিয়ে গেছে। পদ্মায় আগাম পানি আশায় ক্ষতির মধ্যে পড়ে গেছি। সরকারি সহযোগিতা দরকার।

ফরিদপুর সদর উপজেলার ডিক্রিরচর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মেহেদি হাসান মিন্টু জানান, হঠাৎ করেই উজান থেকে নেমে আসা পানিতে তলিয়ে গেছে নি¤œাঞ্চল। আমার ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকাই চরাঞ্চলবেষ্টিত। এখানে বসবাসরত বেশিরভাগ বাসিন্দারাই বাদাম চাষ করে থাকে। পানি বৃদ্ধির ফলে নি¤œাঞ্চলের অধিকাংশ বাদাম ক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে। বাদাম অপরিপক্ব অবস্থায় তুলে ফেলতে হচ্ছে। চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ওদের অন্যতম আয়ের উৎস এ বাদাম।

পদ্মা নদীর গোয়ালন্দ পয়েন্টের গেজ রিডার সালমা খাতুন জানান, বর্তমানে পদ্মার পানি ৬.৬৯ সেন্টিমিটার প্রবাহিত হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ২৪ সেন্টিমিটার পানি বেড়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ফরিদপুর কার্যালয় সূত্র জানায়, জেলায় এ বছর ৫ হাজার ২৮৫ হেক্টর জমিতে বাদাম আবাদ হয়েছে। এ ছাড়া ৫ হাজার ৩৭৪ হেক্টর জমিতে তিল ও ২২ হাজার ৯৮৫ হেক্টর জমিতে ধান আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে চরাঞ্চলে বাদাম ও তিল আবাদ হয়েছে বেশি।

তিনি জানান, ১০৯ হেক্টর জমির ফসল পানিতে নিমজ্জিত ও আংশিক নিমজ্জিত রয়েছে ১৬৪ হেক্টর জমির ফসল। তিনি জানান, পানি কমলে ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা যাবে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ফরিদপুর কার্যালয়ের উপপরিচালক কৃষিবিদ ড. মো. হযরত আলী বলেন, হটাৎ করে পদ্মায় পানি বৃদ্ধির ফলে নিন্মাঞ্চলের বেশ কিছু এলাকায় পানি প্রবেশ করেছে। পানি প্রবেশ করায় বাদাম, তিল ও ধানের কিছু ক্ষেত তলিয়ে গেছে। এখনও বাদাম পরিপক্ব না হওয়ায় পানি আসার কারণে তুলে ফেলতে হচ্ছে। এতে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করে সরকারিভাবে সহযোগিতা করার চেষ্টা করব।

ফরিদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পার্থ প্রতিম সাহা বলেন, পদ্মায় এ সময়ে অপ্রত্যাশিতভাবে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিদিনই পানি বাড়ছে। গত সাত দিনে দুই মিটার পানি বেড়েছে। এভাবে বাড়তে থাকলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বেড়ে যাবে।