তামাক কোম্পানিকে ফৌজদারি অপরাধের আওতায় আনা সময়ের দাবি

. . . মাছুম বিল্লাহ ভূঞা :‘জীবনের অধিকার’ রক্ষাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে অনেক আইন ও প্রতিশ্রুতি রয়েছে, কিন্তু অভাব শুধু বাস্তবায়নের। টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনায় প্রচলিত আইন প্রয়োগের অভাব আমাদের ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। জীবন হয়ে পড়ছে একেবারে মূল্যহীন। জীবন রক্ষার অধিকার চিরন্তন। জীবনের অধিকার কথাটি সংযোজিত রয়েছে অনেক রাষ্ট্রের সংবিধানে। দেশভেদে এর ব্যাখ্যা কিংবা প্রয়োগ বিভিন্নমুখী হলেও মূলকথা একই। যখন কোনো দেশ তার কোনো নাগরিকের জীবনের অধিকার রক্ষার কথা ঘোষণা করে, তখন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জনস্বাস্থ্য রক্ষার দায়িত্বভারও এর আওতাধীন হয়।

জীবনের অধিকার সংরক্ষণ মানে জীবনের জন্য ক্ষতিকর অবস্থা অথবা হুমকি থেকে তাকে পরিত্রাণ দেয়া। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৮(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘জনগণের পুষ্টির স্তর উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতি সাধনকে রাষ্ট্রের অন্যতম প্রাথমিক কর্তব্য বলিয়া গণ্য করিবেন।’ সুস্থ জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় এই নিরাপত্তা প্রদানের দায়িত্ব যখন রাষ্ট্র গ্রহণ করে, তখন এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে আরও অনেক ক্ষুদ্র দায়িত্ব। পুষ্টির স্তর উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নির্ভেজাল খাদ্য, পরিচ্ছন্ন আবাস, নিঃশ্বাসের জন্য নির্মল বায়ুসহ বিভিন্ন উপাদানের গ্রহণযোগ্য মাত্রার সহজলভ্যতা নিশ্চিতকরণ এবং স্বাস্থ্যহানিকর পণ্য নিষিদ্ধ করা। তাই সবার আগে মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবনের নিরাপত্তা গুরুত্ব পাওয়া উচিত, তারপর অন্য কিছু। কিন্তু আমরা তা করছি কি?

বিশ্বে প্রতিরোধযোগ্য রোগ এবং অকাল মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ তামাক। এটি ব্যক্তির কর্মক্ষমতাও হ্রাস করে। তামাক ব্যবহারের কারণে তামাকজনিত বিভিন্ন রোগে প্রতিবছর বাংলাদেশে (প্রায়) এক লাখ ৬১ হাজার মানুষের মৃত্যু হয় এবং তামাকজনিত রোগব্যাধির কারণে বাংলাদেশে প্রতি বছর ৩০ হাজার ৫৭০ কোটি টাকা চিকিৎসা বাবদ ব্যয় হয়। এছাড়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তথ্যমতে, চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে বাংলাদেশে প্রতিবছর সাড়ে ৫২ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়ে পড়ছে। ২০১২ সালে ব্যক্তির ব্যয় ছিল ৬০ শতাংশ। ২০৩২ সালে তা কমিয়ে ৩২ শতাংশ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়, অথচ এখন ব্যয় হচ্ছে ৬৭ শতাংশ। নাগরিকের চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে যদিও রাষ্ট্র হিমশিম খাচ্ছে, কিন্তু তার পরও সমস্যার লাগাম টেনে ধরতে এখনও রাষ্ট্রের আন্তরিক সদিচ্ছা দেখা যাচ্ছে না। বাংলাদেশে ১৫ বছরের বেশি জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৪৩ দশমিক তিন শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে তামাক ব্যবহার করে, এই তথ্য ভয়াবহ। যে বয়সে সুস্থ-সবল ও কর্মক্ষম থাকার কথা, সেই বয়স থেকে তামাক সেবন শুরু করে অতি অল্প বয়সে মানুষ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু কিংবা পঙ্গুত্ব বরণ করছে।

প্রতি বছর তামাক কোম্পানিকে প্রতিহত বা নিয়ন্ত্রণ করতে সারাদেশে বিভিন্ন সংগঠন কাজ করছে। তারা যখন তামাককে নিষিদ্ধ বা নিয়ন্ত্রণের কথা বলে, তখন কর্তৃপক্ষ তামাক কোম্পানি থেকে প্রাপ্ত রাজস্বের কথা বলে। অর্থনৈতিক উন্নয়নে তামাক কোম্পানির রাজস্বকে বড় করে দেখা হয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, লাখ লাখ মানুষের অকাল মৃত্যুর বিনিময়ে আমরা কি রাজস্ব ও জিডিপি চাই, নাকি নিরপরাধ মানুষের অকাল মৃত্যু। শুধু তামাকজাত পণ্য ব্যবহারের ফলে অসুস্থ হওয়ার কারণে চিকিৎসা করতে বছরে কী পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হয় এবং কত নিরীহ মানুষ অকালে প্রাণ হারাচ্ছে, তা কর্তৃপক্ষ আমলে নিচ্ছে না।

রাষ্ট্রের কাজ যদি হয়ে থাকে শুধুই রাজস্ব আদায়, তাহলে দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এ উল্লেখিত ফৌজদারি অপরাধের ওপর কর আরোপ করে অপরাধের বিচার বাতিল কেন করা হচ্ছে না? আমরা যদি রাজস্ব চাই, তাহলে আমাদের ভিন্নভাবে চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। কারণ আমাদের রাষ্ট্রীয় চিন্তা জিডিপিকেন্দ্রিক। তাহলে এক লাখ ৬১ হাজার মানুষের মৃত্যুর সমান ২২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা রাজস্ব। যেহেতু তামাকজাত কোম্পানি দাবি করে, তারা বছরে ২২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা রাজস্ব প্রদান করে, যদিও এই পরিমাণ রাজস্ব দেয়ার বিষয়ে অনেকেরই প্রশ্ন রয়েছে। কল্যাণ রাষ্ট্র রাজস্বের চেয়ে মানুষের জীবনকে বেশি গুরুত্ব প্রদান করে।

তামাক কোম্পানিগুলো তামাক ব্যবসা করে সরকারকে রাজস্ব দিচ্ছে, এর মাধ্যমে তারা মানুষ হত্যা করতে পারে। সুতরাং কারও বাবা-মা, ভাই-বোন অথবা পরিবারের কারও অন্য কারণে অপমৃত্যু হলে হত্যাকারী কর্তৃক টাকা (রাজস্ব) সরকারকে দিয়ে দিলেই হয়, তাহলে আর রাষ্ট্রীয় আইনে অপরাধ বলে গণ্য হওয়ার কথা নয়, যেহেতু তারা রাজস্ব দিচ্ছে।

২০১৯ সালের তামাকমুক্ত দিবসের প্রতিপাদ্য ছিলÑ‘তামাকে হয় ফুসফুস ক্ষয়, সুস্বাস্থ্য কাম্য তামাক নয়।’ তামাকজাত পণ্য ব্যবহারে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি আছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও চিকিৎসার বিজ্ঞানের তথ্য অনুসারেÑএ তথ্য তামাক কোম্পানিও জানে। ‘দণ্ডবিধি ১৮৬০’-তে বর্ণিত আছে, ‘যদি কেউ দেহের যেকোনো অঙ্গের বা গ্রন্থির কর্মশক্তি নাশ ও অনিষ্টসাধন বা স্থায়ী ক্ষতিসাধন করে, অথবা ক্ষয়কারী পদার্থ দিয়ে কারও প্রাণহানি ঘটায়, তবে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।’ ফুসফুস মানবদেহের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। তামাকের মাধ্যমে মানবদেহের ক্ষতিসাধন করা হচ্ছে। এ কাজ দণ্ডবিধি ১৮৬০ অনুসারে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। মানুষের মৃত্যুর জন্য তামাক কোম্পানির দায় ও মৃত্যু ঘটনোর ঘটনার অস্তিত্ব প্রমাণের জন্য ‘সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২’-এর ১০১ থেকে ১০৬ ধারা সাপেক্ষে ওই আইনের ৪৫ ধারা অনুযায়ী বিশেষজ্ঞদের মতামত বিজ্ঞ আদালতের গ্রহণ করা প্রাসঙ্গিক। উপরিউক্ত বিষয় আমলে নিয়ে তামাকজাত কোম্পানিকে ক্রিমিনাল লায়াবিলিটির দায়ে ও অপরাধে দায়ী করা যায়।

এছাড়া Mohammad Eusof Babu Vs. State [4CLR (AD) ২০১৬ ঢ়.৭০] মামলায় বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ রায় দেয় যে, Corporate Criminal Responsibility, অর্থাৎ অপরাধের জন্য কোম্পানিকে দোষী সাব্যস্ত করা যাবে; ১৯১৫ সালে কমন ল’য়ের এই ধারণা ইংল্যান্ডে প্রতিষ্ঠিত হয়। ইংল্যান্ডের কোর্ট অব আপিল রায় দেয়, ÔThe Board of Directors are the brain of the company which is the body and the company can and does act through them.Õ রং ÔThe Board of Directors are the brain of the company which is the body and the company can and does act through them.Õ অর্থাৎ কোম্পানি অপরাধ করতে পারে এবং কোম্পানি অপরাধ করলে এর সধহধমবসবহঃ তথা ব্যবস্থাপনা বোর্ডের ব্যক্তিরা সাজা ভোগ করবেন। | Alter ego bxwZi Ici GB Corporate Criminal Liability (করপোরেট ক্রিমিনাল লায়াবিলিটি) প্রতিষ্ঠিত হয়। অষঃবৎবমড় নীতির অর্থ হলো ÑManagement is the companyÕs brain. সুতরাং কোম্পানি ব্যবস্থাপনা বোর্ডের সদস্যদের management -কোম্পানির means rea I actus rea হিসেবে ধরে নিতে হবে।

তাছাড়া কমন ল’ লিগ্যাল সিস্টেমে বর্ণিত আছে, আইনের অজ্ঞতা কাউকে ক্ষমা করে না (Ignorance of the law is no excuse.)| লাখ লাখ মানুষের অপমৃত্যু ও জনস্বাস্থ্যের ক্ষতির বিষয়টি যদি তামাক কোম্পানির অজ্ঞাতসারেও ঘটে, তাহলেও ফৌজদারি অপরাধের দায় এড়াতে পারা যায় না। কারণ জুষধহফং ঠং. ঋষবপযবৎ (রাইল্যান্ডস বনাম ফ্লেচার) মামলায় ১৮৬৫ সালে ইংল্যান্ডের আদালত রায় প্রদান করে বলেন, অনেক ক্ষেত্রে বিবাদীর ইচ্ছা না থাকলেও তাকে ঘটনার জন্য Rylands Vs. Flecher বা কঠোর দায়বদ্ধতার দায়ে দায়ী করা যায়।

জীবনের অধিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবাধিকার হলেও জনস্বাস্থ্যের অধিকারের সঙ্গে এটি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। জীবনের অধিকার ও জনস্বাস্থ্য পরস্পর-নির্ভরশীল এবং একে অপরের পরিপূরক। জনস্বাস্থ্যকে গুরুত্ব প্রদান করে বাংলাদেশ সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে উল্লেখিত জীবনের অধিকার নিশ্চিত করতে তামাকজাত পণ্যকে জীবননাশকারী হিসেবে চিহ্নিত করে তামাকজাত কোম্পানিকে ক্রিমিনাল লায়াবিলিটির দায়ে অপরাধে অভিযুক্ত করা হোক। কার্যকর প্রতিকার পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রত্যেকেরই অধিকার আছে, যা সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র, ১৯৪৮-এর ৮ ধারায় বলা হয়েছে। তাই স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের লক্ষ্যে তামাকজাত পণ্যের ব্যবহার কারণে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির অধিকার নিশ্চিত করতে সরাসরি আইনের আশ্রয় লাভ ও আইনের মাধ্যমে প্রতিকার পাওয়ার বিধান নিশ্চিত করুন।

আইনজীবী


সর্বশেষ..