বাণিজ্য সংবাদ শিল্প-বাণিজ্য

তামাক পণ্যে সুনির্দিষ্ট করারোপ চায় ভয়েস

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাজেটকে সামনে রেখে জনস্বাস্থ্য রক্ষায় সিগারেটসহ সব তামাক পণ্যে কর বৃদ্ধির দাবিতে বেসরকারি মানবাধিকার ও গবেষণা সংস্থা ভয়েস ‘জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় তামাকের কর বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা’ শীর্ষক এক অনলাইন মতবিনিময় সভার আয়োজন করে। আয়োজনে বক্তারা তামাক পণ্যের ওপর সুনির্দিষ্ট করারোপ করে দাম বৃদ্ধির মাধ্যমে সব তামাকজাত পণ্যকে জনগণের ক্রয়সীমার বাইরে নিয়ে যাওয়া স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য জরুরি বলে মতামত দিয়েছেন।

আয়োজনে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান। সভাপতিত্ব করেন পিকেএসএফের চেয়ারপারসন ড. কাজী খলীকুজ্জামান আহমদ। ওয়েবিনারটি সঞ্চালনা করেন ভয়েসের নির্বাহী পরিচালক আহমেদ স্বপন মাহমুদ। সভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন সংসদ সদস্য এরোমা দত্ত, শিরীন আখতার, অসীম কুমার উকিল, শামীম হায়দার পাটোয়ারী ও মোস্তাফিজুর রহমান।

সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ভয়েসের প্রকল্প সমন্বয়ক জায়েদ সিদ্দিকী। প্রবন্ধে বলা হয়, বাংলাদেশে প্রচলিত তামাক কর ব্যবস্থা অত্যন্ত জটিল, যেখানে বিভিন্ন স্তরে বিভিন্ন মাত্রার কর আরোপ করা হয়েছে। এছাড়া অতীতে তামাকের ওপর কর আরোপ করে ব্যবহার কমানোর চেষ্টা করা হলেও মানুষের আয় বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তামাকের দাম বৃদ্ধি না পাওয়ায় পদক্ষেপ ফলপ্রসূ হয়নি বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, ২০১৫-১৬ সালের তুলনায় ২০১৭-১৮ সালে মাথাপিছু জাতীয় আয় (নমিন্যাল) বেড়েছে ২৫ দশমিক ৪ শতাংশ। কিন্তু এ সময়ে বেশিরভাগ সিগারেটের দাম প্রায় অপরিবর্তিত থেকেছে বা সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে নি¤œ স্তরের সিগারেটে কর বৃদ্ধির মাত্রা নগণ্য হওয়ায় তামাক পণ্য থেকে গেছে সহজলভ্য। এর ফলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মাঝে বিড়ি সিগারেটের মতো ক্ষতিকর পণ্যের ব্যবহার কমানো সম্ভব হয়নি।

বিশ্বে সর্বোচ্চ তামাক ব্যবহারকারী দেশের তালিকায় বাংলাদেশের নাম প্রথম দিকে। দেশে ৩৫ দশমিক ৩ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তামাক ব্যবহার করে। প্রতি বছর ১ লাখ ৬১ হাজার মানুষ তামাকজনিত রোগে প্রাণ হারায় এবং অনেকে অকালে পঙ্গু হয়ে যান। কিন্তু সিগারেট, বিড়ি, জর্দা, গুল প্রভৃতি তামাকজাত পণ্য সহজলভ্য হওয়ায় এ ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে না।

যেহেতু তামাক নিয়ন্ত্রণের জন্য এসব পণ্যে করারোপের মাধ্যমে বিক্রয়মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা একটি কার্যকরী পদ্ধতি। সে কারণে আসন্ন বাজেটকে কেন্দ্র করে তামাকের ওপর কিছু কর প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়। এসব প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছেÑনি¤œ স্তরের সিগারেটে ৫৭ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক ও বাকিগুলোর ওপর ৬৫ শতাংশ শুল্কের পরিবর্তে সব স্তরের সিগারেটের ওপর সমভাবে কর বৃদ্ধি, সব স্তরের সিগারেটের ওপর সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্ক ঘোষিত খুচরা মূল্যের ৬৫ শতাংশ নির্ধারণের পাশাপাশি ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও ১ শতাংশ স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ বহাল রাখা, ফিল্টারবিহীন বিড়ির ওপর সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্ক আরোপ ও ঘোষিত খুচরা মূল্যের ৪৫ শতাংশ নির্ধারণ এবং গুল ও জর্দার ওপরে সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্ক খুচরা মূল্যের ৬৬ শতাংশ নির্ধারণ।

পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান আলোচনা সভার আয়োজকদের সাধুবাদ জানান। তিনি কর বৃদ্ধির সপক্ষে নিজের অবস্থান জোরালো বলে ঘোষণা দেন এবং তামাকের বিরুদ্ধে লড়াইকে সবাইকে সংঘবদ্ধ থাকতে আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘তামাক যে ক্ষতিকর পণ্য তা নিয়ে বিতর্কের কোনো অবকাশ নেই। যেহেতু আমাদের প্রধানমন্ত্রী নিজে ঘোষণা দিয়েছেন যে, ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে তামাকমুক্ত করবেন, তখন এটাই সুবর্ণ সুযোগ তামাকের ওপর কর বৃদ্ধি করার।’ এ নিয়ে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করার আশ্বাস দেন পরিকল্পনামন্ত্রী।

এটিএন বাংলার বার্তা সম্পাদক নাদিরা কিরণ বলেন, ‘তামাকের কারণে স্বাস্থ্য খাতে যে পরিমাণ ব্যয় হয়, তা তামাক কোম্পানি থেকে প্রাপ্ত রাজস্বের তুলনায় অনেক বেশি। বিশেষ করে করোনা মহামারির মধ্যে যখন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে ধূমপায়ীদের মধ্যে করোনার ইনফেকশনের ঝুঁকি অনেক বেশি, তখন এ প্রেক্ষাপটে মানুষের জীবনের কথা চিন্তা করে, তামাকের ওপর সুনির্দিষ্ট কর আরোপের মাধ্যমে তামাকের দাম বৃদ্ধি করে এ পণ্যকে মানুষের ক্রয়সীমার বাইরে নিয়ে যেতে হবে।’

সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, ‘আমাদের দেশে তামাক পণ্যে বহুস্তরবিশিষ্ট কর বিরাজমান, যা পৃথিবীর অন্য দেশে নেই এবং তামাক কর থেকে সুফল না পাওয়ার পেছনে এটা একটা প্রধান কারণ। কোনো দেশে কখনও তামাকের ওপর কর আরোপের কারণে রাজস্ব কমেনি। তাই আমাদের দেশেও তামাকের ওপর সুনির্দিষ্ট কর আরোপ করতে হবে।’

সংসদ সদস্য শিরিন আখতার বলেন, ‘যা ক্ষতিকর সেটাকে ক্ষতিকর বিবেচনা করে শক্ত হাতে এ বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সংসদকে ধূমপান মুক্ত করতে হবে। শুধু সংসদে নয়; স্থানীয় পর্যায়ে, উপজেলা পর্যায়ে, ইউনিয়ন মেম্বারদের এ বিষয়ে কথা বলতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে এ নিয়ে কথা বলতে হবে এবং তামাক বিষয়ে আগামীতে নীতি কী হবে, সে বিষয়ে রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে।’

কাজী খলীকুজ্জমান বলেন, এক শতাংশ স্বাস্থ্য সারচার্জের পাশাপাশি এক শতাংশ সারচার্জ যদি সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য নেয়া যায় তাহলে খুব ভালো হবে।

আলোচনা সভায় সাংবাদিক সেলিম সামাদ, টিভি টুডের প্রধান সম্পাদক মনজুরুল আহসান বুলবুল, রোড সেফটি প্রোগ্রাম গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইঙ্কিউবেটরের কান্ট্রি কোঅর্ডিনেটর ড. শরিফুল আলম, প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এবিএম যুবায়ের উপস্থিত ছিলেন।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..