প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

তালিকাবহির্ভূত কোম্পানিতে লাগামহীন বিনিয়োগ

বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ

শেখ আবু তালেব: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত নয়, এমন একটি কোম্পানিতে ২০১৭ সালে দুই কোটি ৪১ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছিল একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান। ২০১৮ সালে তা সেই বিনিয়োগ লোকসানি হওয়ায় নিজ কোম্পানিতে পুরোটাই টেকওভার করে নেয়। এতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানটিকে এর বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশনও রাখতে হয়েছে। এভাবে লাগামহীনভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে তালিকাবহির্ভূত কোম্পানিতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর ঝুঁকির পরিমাণও বৃদ্ধি পাচ্ছে ক্রমাগত। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে এমন তথ্য।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্বশীল সূত্রমতে, দেশের ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো (এনবিএফআই) পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ও তালিকাবহির্ভূত কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করে থাকে। তালিকাবহির্ভূত কোম্পানিতে বিনিয়োগের কোনো সীমা বেঁধে দেওয়া নেই। ফলে এসব কোম্পানিতে কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগে উৎসাহী হচ্ছে।
জানা গেছে, ক্রমাগত বিনিয়োগ এক পর্যায়ে আশঙ্কাজনকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঝুঁকির পরিমাণও ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি করছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যতের জন্য এটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শক দল।
এর বাইরে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তালিকাবহির্ভূত কোম্পানিতে বিনিয়োগের পর তা মন্দ বা ক্ষতিজনিত হওয়ার আগেই সম্পূর্ণ বিনিয়োগ টেকওভার করছে। এতে বিনিয়োগকারী আর্থিক প্রতিষ্ঠান লোকসানের মুখে পড়ছে। লাগামহীন এসব বিনিয়োগের বিপরীতে প্রতি বছর নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে হচ্ছে। ফলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানটির মূল আয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি মূলধন আটকে যাচ্ছে।
গত মে মাসে তালিকাবহির্ভূত কোম্পানিতে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগের ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। এতে কোন কোন খাতের কোম্পানিতে বিনিয়োগ করা যাবে, সে নির্দেশনা দেওয়া হয় দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে। এ সময় বিনিয়োগের সীমাও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়।
কিন্তু আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপারে এ-সংক্রান্ত কোনো নীতিমালা বা প্রজ্ঞাপন নেই। ফলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগ বাড়িয়েই চলছে, যা এক পর্যায়ে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়ে যাবে। এছাড়া কয়েকটি প্রতিষ্ঠান নিজেদের সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করছে। বিনিয়োগটি ঝুঁকিপূর্ণ হলেই তা মূল কোম্পানিতে বিনিয়োগ ডিমিউনিটেশন করছে। এতে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের এক সভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে, এ বিষয়ে একটি নীতিমালা হওয়া প্রয়োজন। যেখানে তালিকাবহির্ভূত কোম্পানিতে বিনিয়োগের বেলায় সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা থাকবে।
সম্প্রতি পুঁজিবাজারে তারল্য সংকট কাটাতে বিভিন্ন পর্যায়ের স্টেকহোল্ডারদের দাবির মুখে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠকে বসে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এরপরই বাংলাদেশ ব্যাংক তালিকাবহির্ভূত কোম্পানিতে বিনিয়োগের সুযোগ দেয় ব্যাংকগুলোকে। তখন বেশ কিছু খাতকে নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়।
একই সঙ্গে তালিকাভুক্ত নয়, এসব কোম্পানিতে বিনিয়োগকে পুঁঁজিবাজারে বিনিয়োগের বাইরে ধরা হবে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। পুঁঁজিবাজারে ব্যাংকের (একক ও সমন্বিত) বিনিয়োগ হিসাবের ক্ষেত্রে অ-তালিকাভুক্ত নন-কনভার্টিবল প্রিফারেন্স শেয়ার, নন-কনভার্টিবল বন্ড, ডিবেঞ্চার, ওপেন-ইন্ড মিউচুয়াল ফান্ডকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে না। এতে ব্যাংকগুলোর পুঁঁজিবাজারে বিনিয়োগের সক্ষমতা আগের চেয়ে বৃদ্ধি পায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপন অনুসারে, স্পেশাল পারপাস ভেহিকল (এসপিভি), অল্টারনেটিভ ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড ও সমজাতীয় তহবিলের বাস্তবায়িত বা বাস্তবায়নাধীন সরকারি-বেসরকারি অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগ করা অর্থ ক্যাপিটাল মার্কেট এক্সপোজারের বাইরে থাকবে। এসব খাত ও কোম্পানির মধ্যে আছেÑসরকারি উদ্যোগের অবকাঠামো প্রকল্প, যেমন বিদ্যুৎকেন্দ্র, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামো, সড়ক ও সেতুসহ যোগাযোগ অবকাঠামো, পর্যটন অবকাঠামো, ডিজিটাল অবকাঠামো প্রভৃতি।
এছাড়া ক্রয় করা শেয়ারের পরিমাণ সংশ্লিষ্ট কোম্পানির আদায় করা মূলধনের ১০ শতাংশের বেশি হবে না। বিনিয়োগ করা শেয়ার নন-কনভার্টিবল হতে হবে। প্রিফারেন্স শেয়ারে বিনিয়োগকে ঋণ হিসেবে দেখিয়ে প্রয়োজনীয় পরিমাণ সঞ্চিতি ও সিআইবিকে জানাতে হবে।
এরকম বিস্তারিত নীতিমালা প্রকাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু বর্তমানে দেশে সরকারি, বেসরকারি খাতে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে ৩৪টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগের আকার প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা। আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতে খেলাপি ঋণের গড় হার আট শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল ২০১৮ সাল শেষে, যা ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের গড় হারের চেয়ে তুলনামূলক কম। বর্তমানে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের গড় হার দশ শতাংশ ছাড়িয়েছে।
গত মার্চ শেষে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের হারও ১০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। নাম না প্রকাশের শর্তে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, দেশের ব্যাংক খাতের চেয়ে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বেশি বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ছে। দ্রুত এ খাতটি শৃঙ্খলার মধ্যে আনা প্রয়োজন। এ জন্য বেশকিছু নীতিমালা প্রণয়নের সময় হয়েছে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন
ট্যাগ »

সর্বশেষ..