তিন অর্থবছরে মাত্র ৬৩ কোটি টাকার বিনিয়োগ নিবন্ধন!

চট্টগ্রামের বিদেশি বিনিয়োগ নিবন্ধন

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: চলমান করোনাভাইরাস সংক্রমণে গত ২০২০-২১ অর্থবছরে চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিদেশি বিনিয়োগ নিবন্ধন হয়েছিল ১১ কোটি ৬৮ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ১৪ কোটি তিন লাখ টাকা। আর ২০১৮-১৯ অর্থবছরের ৩৭ কোটি ৮৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা। অর্থাৎ তিন অর্থবছরে বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধ হয়েছে মাত্র ৬৩ কোটি ৫৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকার। এভাবে প্রতি বছর কমছে বিদেশি বিনিয়োগ নিবন্ধন। অথচ বিনিয়োগ আকর্ষণে একে একে গড়ে তোলা হচ্ছে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, সম্প্রসারণ করা হচ্ছে বন্দর সুবিধা, সড়ক যোগাযোগসহ অবকাঠামোগত সুবিধা। তবু বিনিয়োগ আকর্ষণে পিছিয়ে যাচ্ছে চট্টগ্রাম।   

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) তথ্য মতে, দেশের প্রধানতম বন্দর ও বাণিজ্যিক শহর চট্টগ্রাম। এ শহরের বাণিজ্যিক কর্মচাঞ্চল্য বাড়ানোর জন্য স্থাপন করা হচ্ছে দেশের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক অঞ্চল, দেশের প্রথম টানেলসহ অনেকগুলো অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলছে। পাশাপাশি বিনিয়োগ সহায়ক মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর এবং চট্টগ্রাম বন্দর সক্ষমতা ও সুবিধা বাড়ানো কাজ চলছে। সব মিলে দেড় লাখ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলমান। কিন্তু এত সম্ভাবনার পরও চলমান করোনাভাইরাস সংক্রমণে গত অর্থবছরের চট্টগ্রাম অঞ্চলে ১১ কোটি ৬৫ লাখ টাকা বিদেশি বিনিয়োগ নিবন্ধন হয়েছে। এর মধ্যে গত বছরের অক্টোবরে চীনা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গাও গাওলিন হোটেল ও রেস্টুরেন্ট এক কোটি ৬০ লাখ টাকায় সানফ্লাওয়ার ইন চিটাগং লিমিটেড নামে এবং আরেক চীনা নাগরিক হু চিয়ান ইয়ান গত ডিসেম্বরে ৯ কোটি ৩৪ লাখ ৬০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করেন জিয়ানচেং শুজ কোম্পানি লিমিটেডে। একই সময়ে আগের অর্থবছরের বিনিয়োগ নিবন্ধন হয়েছিল ১৪ কোটি তিন লাখ টাকা।

দেশের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ শহর চট্টগ্রাম। এ শহরে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর অবস্থিত। পাশাপাশি গত ৪৮ বছরে বেসরকারি উদ্যোগে একে একে গড়ে উঠেছে ভারী শিল্প খ্যাত ইস্পাত, সিমেন্ট, তেল পরিশোধন কেন্দ্র, জাহাজ নির্মাণ, জাহাজ ভাঙা, এলপিজি প্লান্ট, বিদ্যুৎকেন্দ্র, পোশাক কারখানাসহ বিভিন্ন ধরনের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। এছাড়া আমদানিনির্ভর ভোগ্যপণ্যের একাধিক বড় পাইকারি বাজারও গড়ে উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ আছে ২০ লাখ কোটি টাকারও বেশি। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষের। অন্যদিকে এ শহরকে বাসযোগ্য ও ব্যবসাবান্ধব শহরে পরিণত করার জন্য সরকারি সেবাপ্রদানকারী ৩২টির বেশি দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা স্বাধীনতার পর থেকে কাজ করলেও এখনও চট্টগ্রামকে পুরোপুরি বাসযোগ্য ও ব্যবসাবান্ধব শহর হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। ফলে কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে তলিয়ে যায় চট্টগ্রাম। অন্যদিকে প্রধান সড়কের বিকল্প সড়ক না থাকায় বাড়ছে যানজট, পরিবহন খাতে নৈরাজ্য ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ। পাশাপাশি একই কারণে চট্টগ্রাম বন্দরকেন্দ্রিক আমদানি-রপ্তানি ও ব্যবসা-বাণিজ্যও স্থবির হয়ে পড়ছে।

ব্যবসায়ীরা বলেন, শিল্প-বাণিজ্যের জন্য চট্টগ্রাম আদর্শ স্থান হলেও জমির স্বল্পতা ও অত্যাধিক দাম, গ্যাস-পানির সংকট, আমলান্ত্রিক জটিলতাসহ নানা কারণে থমকে গেছে চট্টগ্রামে শিল্প-বিনিয়োগ। ফলে বিনিয়োগকারীরা চট্টগ্রামের পরিবর্তে দেশের অন্যান্য জেলায় শিল্প স্থাপন করছে কিংবা আগ্রহী হচ্ছে। এতে চট্টগ্রামের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা অবিকাশিত থেকে যাচ্ছে। আর যারা এখন ব্যবসায় আছেন, তারা নানাভাবে অসম প্রতিযোগিতার সম্মুখীন কিংবা ভোগান্তিতে আছেন। সবার আগে বিদ্যমান বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, সরকারের গৃহীত বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পগুলো দ্রুত সময়ে বাস্তবায়ন হলে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে বলে ব্যবসায়ীরা জানান।

এ বিষয়ে জুনিয়র চেম্বারের সাবেক সভাপতি ও ব্যবসায়ী গিয়াস উদ্দিন বলেন, কয়েক বছর ধরে চট্টগ্রামে বিদেশি বিনিয়োগ কমছে। গত তিন অর্থবছরের ১০০ কোটি টাকারও কম বিনিয়োগ নিবন্ধন নিয়েছে। এত উন্নয়ন প্রকল্প চলমান হওয়ার পর যদি বিদেশি বিনিয়োগ না বাড়ে। এটা অপ্রত্যাশিত। হতাশাজনক। এক্ষেত্রে সরকারের উচিত সঠিক কারণ খুঁজে বের করা। আর বিদেশিদের বিনিয়োগ আকর্ষণে বিভিন্ন ধরনের সেমিনার, ট্রেড শো এবং আমাদের দূতাবাসগুলোকে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। তিনি আরও বলেন, এটা ঠিক সেবা সংস্থাগুলো সমন্বয়হীনতায় জনদুর্ভোগ বেড়েছে। তবে তা সাময়িক সমস্যা। আর এসব উন্নয়ন প্রকল্প শেষ হলে বিনিয়োগকারী সবচেয়ে বেশি সুবিধা ভোগ করবে। তখন আশা করি বিনিয়োগ বাড়বে।   

সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামের চেম্বারের এক ওয়েবিনার আলোচনায় অংশ নিয়ে ফরেইন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি সভাপতি ও বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রূপালী চৌধুরী বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বিদেশি বিনিয়োগ তেমন বৃদ্ধি পায়নি। যদিও সরকার অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ অনেক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। তবে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য আইনগত ও নীতিগত সহায়তা দরকার। বেজার অধীন প্লট বরাদ্দের ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ ভ্যাট নির্ধারণ করেছে, যা পুরোপুরি অযৌক্তিক। এছাড়া টেলিযোগাযোগ খাতে ৫৬ শতাংশ কর নেয়া হচ্ছে; এটি হ্রাস করা দরকার। তা না হলে প্রত্যাশিত বিনিয়োগ আসবে না। তিনি বলেন, যে সময়ে ভিয়েতনামে প্রচুর বিদেশি বিনিয়োগ আসছে, তখন বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে পড়ছে। বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে হলে অবশ্যই অবকাঠামোগত সুবিধার পাশাপাশি আইনগত ও নীতিগত সুবিধা বাড়াতে হবে। এতে জাপান, কোরিয়ার মতো উন্নত রাষ্ট্রগুলো আরও বিনিয়োগ করবে।

সর্বশেষ..