প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

তিন বছরেও শুরু হয়নি যমুনা রেলসেতু নির্মাণ

নিজস্ব প্রতিবেদক:বঙ্গবন্ধু সেতুতে যানবাহনের চাপ কমানো ও ট্রেন চলাচল সক্ষমতা বাড়াতে যমুনা নদীর ওপর নির্মাণ করা হবে পৃথক রেলসেতু। এজন্য ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে একটি প্রকল্প অনুমোদন করে সরকার। এর পর প্রায় তিন বছর পেরুলেও শুরু হয়নি সেতুর বাস্তব কাজ। এমনকি ঠিকাদারও নিয়োগ হয়নি। তিন বছরে প্রকল্পটির অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ১০ শতাংশ।

তথ্যমতে, নকশা প্রণয়নসহ সেতুটি নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ হাজার ৭৩৪ কোটি সাত লাখ টাকা। দেশের বৃহত্তম এ রেল সেতু নির্মাণে সাত হাজার ৭২৪ কোটি ৩৩ লাখ টাকা ঋণ দেওয়ার কথা জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা)। সেতুটির নামকরণ করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু রেল সেতু।

প্রকল্প প্রস্তাবনার (ডিপিপি) তথ্যমতে, বঙ্গবন্ধু সেতুর ৩০০ মিটার উজানে চার দশমিক আট কিলোমিটার দীর্ঘ ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন রেলসেতু নির্মাণ করা হবে। এজন্য পৃথক নদীশাসন করতে হবে না। জমি অধিগ্রহণও খুব বেশি দরকার হবে না। এতে ব্যয় অনেক কম হবে।

বঙ্গবন্ধু রেলসেতুর উভয় দিকে ভায়াডাক্ট (সংযুক্ত উড়ালপথ) থাকবে ৫৮০ মিটার। যমুনা ইকোপার্কের পাশ দিয়ে এটি বিদ্যমান বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম অংশের রেলপথের সঙ্গে যুক্ত হবে। এজন্য ছয় দশমিক দুই কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ করতে হবে। পাশাপাশি তিনটি স্টেশন বিল্ডিং, তিনটি প্ল্যাটফর্ম ও শেড, তিনটি লেভেলক্রসিং গেট ও ছয়টি কালভার্ট নির্মাণ করতে হবে। আর রেলসেতুর পূর্ব পাশে লুপ লাইনসহ প্রায় সাড়ে ১৩ কিলোমিটার, ১৩টি কালভার্ট ও দুটি সংযোগ স্টেশন নির্মাণ করতে হবে। এছাড়া ছয় একর জমি অধিগ্রহণ করতে হবে।

সূত্রমতে, বঙ্গবন্ধু সেতুতে ট্রেন চালানো ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় পারাপারের সময় গতি অনেক কমিয়ে দেওয়া হয়। এছাড়া সেতুটির ওপর দিয়ে ব্রডগেজ ট্রেনে পণ্য পরিবহন নিষিদ্ধ রয়েছে। এটি দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রেল যোগাযোগের ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধক। এজন্য পৃথক রেলসেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্পটি অনুমোদনের পর পরামর্শক নিয়োগ করা হয় ২০১৭ সালের মার্চে। আর বিস্তারিত নকশা প্রণয়ন শেষ হয় গত বছর সেপ্টেম্বরে। এর পর ঠিকাদার নিয়োগে দরপত্র প্রক্রিয়াকরণ শুরু করা হয়। বর্তমানে দরপত্র মূল্যায়নের কাজ চলছে।

সম্প্রতি প্রকল্পটির বিভিন্ন দিক নিয়ে জাইকার প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক করে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। এতে জানানো হয়, ডিসেম্বরে ঠিকাদার নিয়োগ প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য আগামী বছর জানুয়ারিতে ঠিকাদার নিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। মূল কাজ শুরু হবে আগামী বছর মার্চে। ২০২৪ সালের মার্চে সেতুটির নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আর সেতুটির ডিফেক্ট লায়াবিলিটি পিরিয়ড শেষ হবে ২০২৫ সালের মার্চে, যদিও প্রকল্পটির মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর।

রেলওয়ের তথ্যমতে, রেলপথের পাশাপাশি সেতুটিতে গ্যাস সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করা হবে। স্টিল অবকাঠামোর প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে সেতুটি নির্মাণে। এছাড়া সাধারণ ট্রেন ছাড়াও দ্রুতগতির (হাইস্পিড) ট্রেনও চালানোর উপযুক্ত করে নির্মাণ করা হচ্ছে সেতুটি। ফলে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২৫০ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চালানো যাবে এ সেতুতে, যদিও পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ অংশের গতি ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১২৫ কিলোমিটার ধরা আছে।

বর্তমানে বঙ্গবন্ধু সেতু দিয়ে ঘণ্টায় পাঁচ কিলোমিটার গতিতে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল করে। ফলে গতি বাড়ায় নতুন রেলসেতু দিয়ে দৈনিক দ্বিগুণের বেশি যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল করতে পারবে।

এদিকে বাস্তবায়নে বিলম্বের কারণে সেতুটির নির্মাণব্যয় বাড়ার শঙ্কা করছে রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা। জাইকার সঙ্গে বৈঠকে এ প্রসঙ্গে জানানো হয়, সেতুটি নির্মাণে ঠিকাদার নিয়োগ সম্পন্ন হলে বাস্তব ব্যয় জানা যাবে। তবে বিস্তারিত নকশার পরিপ্রেক্ষিতে বোঝা যাচ্ছে, প্রাক্কলিত ব্যয়ের চেয়ে বাস্তবে নির্মাণব্যয় বেশি হবে।

উল্লেখ্য, ১৯৯৮ সালের জুনে উদ্বোধনের পর থেকেই বঙ্গবন্ধু সেতুতে ট্রেন চলাচল করছে। তবে ছয় বছরের মাথায় সেতুটিতে ফাটল দেখা দিলে ট্রেনের গতি কমিয়ে দেওয়া হয়। পাশাপাশি ব্রডগেজ পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়। বর্তমানে সেতুটিতে ট্রেনে পারাপারে কমপক্ষে ৪৫ মিনিট লাগে। ফাটলের সংখ্যা ক্রমেই বাড়তে থাকায় পরে পৃথক রেল সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে রেল সেতুটি নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই করে কানাডীয় ক্যানারেল কোম্পানি লিমিটেড। আর জাইকার অর্থায়নে নকশা প্রণয়নের কাজ করে জাপানের ওরিয়েন্টাল গ্লোবাল কনসালটেন্টস লিমিটেড। এ প্রতিষ্ঠানটিই রেল সেতু নির্মাণ তদারকি তথা পরামর্শক হিসেবেও কাজ করছে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন
ট্যাগ »

সর্বশেষ..