Print Date & Time : 12 April 2021 Monday 6:32 am

তিন ব্যাংকে সানোয়ারা গ্রুপের খেলাপি ১৩৫ কোটি টাকা

প্রকাশ: September 16, 2019 সময়- 12:20 am

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক মন্ত্রী নূরুল ইসলাম বিএসসির পরিবারিক মালিকানাধীন সানোয়ারা গ্রুপ অব কোম্পানিজের একাধিক সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ব্যাংকে খেলাপি হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে যমুনা ব্যাংকে ৭৫ কোটি টাকা, ব্যাংক এশিয়ায় প্রায় ৩৬ কোটি টাকা এবং শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকে ২৪ কোটি ৬৮ লাখ টাকা খেলাপি ঋণ রয়েছে গ্রুপটির।
পাওনা টাকা আদায়ে কোনো কোনো ব্যাংক এরই মধ্যে বন্ধকি সম্পত্তি নিলামে বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি চেক প্রত্যাখ্যানের বিষয়ে হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইনে এবং অর্থঋণ আদালতে মামলা দায়েরও করা হয়েছে। তবে পাওনা পরিশোধে কোনো উদ্যোগ নেননি সানোয়ারা গ্রুপের কর্ণধাররা।
জানা গেছে, ১৯৭৮ সালে দুগ্ধজাত পণ্য বিপণনের মধ্য দিয়ে সানোয়ারা গ্রুপের যাত্রা শুরু হয়। ব্যবসা জমে ওঠায় পর্যায়ক্রমে সানোয়ারা ডেইরি ফুডস লিমিটেড, সানোয়ারা ড্রিংকস অ্যান্ড বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, ইউনিল্যাক সানোয়ারা (বিডি) লিমিটেড, সানোয়ারা কনজ্যুমার প্রডাক্টস লিমিটেড, সানোয়ারা গার্মেন্ট লিমিটেড, সানোয়ারা ইন্টারন্যাশনাল প্রডাক্টস লিমিটেড, সানোয়ারা প্লাস্টিক প্রডাক্টস লিমিটেড, সানোয়ারা প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, সানোয়ারা পোলট্রি অ্যান্ড হ্যাচারি লিমিটেড ও সানোয়ারা হোল্ডিংস লিমিটেডের মতো প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে সানোয়ারা গ্রুপ অব কোম্পানিজ গড়ে তোলেন নূরুল ইসলাম বিএসসি।
অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো এই গ্রুপটির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পরিচালনায়ও নেওয়া হয় ব্যাংক ঋণ। জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে গ্রুপটির ২২০-২৫০ কোটি টাকার মতো ঋণ রয়েছে। এর মধ্যে বেশিরভাগ ঋণই খেলাপি হয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ যমুনা ব্যাংকে। যমুনা ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখায় এ গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান সানোয়ারা ডেইরি ফুডস লিমিটেড, সানোয়ারা ডেইরি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড এবং ইউনিল্যাক সানোয়ারা (বিডি) লিমিটেডের কাছে খেলাপি পাওনা প্রায় ৭৫ কোটি টাকা। পাওনা আদায়ে বন্ধকদাতা সাবেক প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী নূরুল ইসলাম বিএসসির হাটহাজারীর চিকনদণ্ডী এলাকার ২৬ শতক সম্পত্তি নিলামে বিক্রির দরপত্র জারি করে সংশ্লিষ্ট শাখা। গত ৭ আগস্ট নিলামে কোনো আগ্রহী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করেনি।
এছাড়া বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ২০০১ সালে ব্যাংক এশিয়ার আগ্রাবাদ শাখা থেকে ঋণ নেয় শিল্প গ্রুপটির অন্য একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান সানোয়ারা ডেইরি ফুডস লিমিটেড। ওই ঋণের কিস্তি সময়মতো পরিশোধে ব্যর্থ হলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সানোয়ারা ডেইরি ফুডস লিমিটেডের কাছে সুদাসলে মোট পাওনা ৩৬ কোটি ১১ লাখ টাকা আদায়ের জন্য গত ১০ জুলাই চট্টগ্রামে অর্থঋণ আদালতে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। এতে আসামি করা হয় প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান সানোয়ারা বেগম, ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুজিবুর রহমান, সাইফুল ইসলাম, জাহেদুল ইসলাম, ওয়াহিদুল ইসলাম, কামরুল ইসলাম এবং তৎকালীন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী নূরুল ইসলাম বিএসসিকে।
এদিকে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখা সূত্রে জানা যায়, সানোয়ারা গ্রুপ অব কোম্পানিজের দুই সহযোগী প্রতিষ্ঠান সানোয়ারা ডেইরি ফুডস এবং ইউনিল্যাক সানোয়ারা (বিডি) লিমিটেডের কাছে ২৪ কোটি ৬৮ লাখ টাকা খেলাপি ঋণ রয়েছে। এছাড়া মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখায় সানোয়ারা ডেইরি ফুডস লিমিটেড এবং সানোয়ারা ডেইরি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের নামে গত ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ৪৪ কোটি ৭১ লাখ টাকা ঋণ আছে। তবে ওই ঋণ খেলাপি হিসেবে বিবেচনার ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের স্থিতাবস্থা জারি রয়েছে।
জানা গেছে, আমদানি করা গুঁড়োদুধের ব্যবসায় মুনাফার ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়েছেন নূরুল ইসলাম বিএসসি। তিনি এনসিসি ব্যাংকের পরিচালকও ছিলেন। কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন কারণে এ গ্রুপের ব্যবসা সংকুচিত হতে থাকে। ব্যাংক এশিয়া, মিউচুয়ার ট্রাস্ট ব্যাংক, ইউসিবিএল ও শাহজালাল ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, এ সংকোচনের কারণ ব্যবসায়িক নেতৃত্বের অভাব, ভূমি ব্যবসায় অনিয়ন্ত্রিত বিনিয়োগ প্রভৃতি। তারা আরও জানান, সানোয়ারা গ্রুপের বিভিন্ন ব্যাংকে ২৫০ কোটি টাকার মতো ঋণ আছে। এর মধ্যে বেশিরভাগ খেলাপি হয়ে আছে। তবে গ্রুপটির ভূসম্পত্তি রয়েছে। সুতরাং তারা চাইলে এসব ঋণ পরিশোধ করা কিংবা নিয়মিত করে আবার ব্যবসা শুরু করতে পারে। ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তাদের ধারণা, এই ঋণ পরিশোধ করা কঠিন নয় গ্রুপটির জন্য।
এ প্রসঙ্গে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডের এসএভিপি আবদুর রশিদ শেয়ার বিজকে বলেন, ‘সানোয়ারা গ্রুপের দুটি প্রতিষ্ঠানের কাছে আমাদের খেলাপি ঋণ রয়েছে ২৪ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে পুনঃতফসিলের জন্য যোগাযোগ করা হয়। এ সময়ে তারা ৫০ লাখ টাকা পরিশোধ করে। পরে আর কোনো যোগাযোগ হয়নি।’
যমুনা ব্যাংক লিমিটেডের এসভিপি ও খাতুনগঞ্জ শাখা ব্যবস্থাপক মো. সহিদ উল্লাহ বলেন, গ্রুপটির পাওনা আদায়ে অর্থঋণ আদালতে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। চেক প্রত্যাখ্যানের জন্য আগে থেকে হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইনে মামলা চলমান রয়েছে।
চট্টগ্রামভিত্তিক বিশাল এই ব্যবসায়ী গ্রুপটির একে একে খেলাপি হয়ে পড়ার কারণ জানতে সানোয়ারা গ্রুপ অব কোম্পানিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জাহেদুল ইসলামের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘এটা আমাদের ও ব্যাংকের বিষয়। এ নিয়ে আপনাদের চিন্তা করতে হবে না।’ পরে তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।