দিনের খবর প্রথম পাতা

তিন মাসেও তথ্য উদ্ঘাটন করতে পারেনি ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি

এসকে সুর ও শাহ আলমের দুর্নীতি

জয়নাল আবেদিন: আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর এসকে সুর চৌধুরী ও নির্বাহী পরিচালক শাহ আলমের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ঘুষের বিনিময়ে গুরুতর অনিয়মে সহায়তা করেছেন আরও বেশকিছু কর্মকর্তা। এই সুযোগে আর্থিক খাতের হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করেছে কিছু সংঘবদ্ধ চক্র।

আদালতে ঘুষ কেলেঙ্কারির স্বীকারোক্তি দেন একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের এমডিসহ বেশ কয়েকজন। অনিয়মের অভিযোগ করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীরাও। এতে করে নানা মহলের সমালোচনায় পড়ে আর্থিক খাতের এ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা। বিষয়টি তদন্তে ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং (কারণ উদ্ঘাটন) কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু তিন মাস পর হলেও কমিটি গঠনের তেমন অগ্রগতি নেই। ফলে এখনও জমা দিতে পারেননি প্রতিবেদন।   

জানা গেছে, পিপলস লিজিং ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিংসহ অন্তত পাঁচটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা লোপাট করেছেন প্রশান্ত কুমার হালদার (পিকে হালদার)। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে এসব অর্থ লোপাটের তথ্য চাপা দিত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শন টিম। এসব অনিয়মের সহায়তা করতেন সাবেক ডেপুটি গভর্নর এসকে সুর চৌধুরী ও নির্বাহী পরিচালক শাহ আলম। বিনিময়ে পেতেন আর্থিক সুবিধা। ঘুষের বিনিময়ে এসব অনিয়মে সহায়তা করেছেন আরও বেশকিছু কর্মকর্তা।

পিকে হালদারের অন্যতম সহযোগী ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রাশেদুল হকের আদালতে দেয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে উঠে এসেছে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য। গত ২ ফেব্রুয়ারি ঢাকার সিএমএম আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন রাশেদুল হক।

আদালতে জবানবন্দিতে রাশেদুল হক বলেন, ‘আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অনিয়ম চাপা দিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন কর্মকর্তাদের পাঁচ থেকে সাত লাখ টাকা করে দিত রিলায়েন্স ফাইন্যান্স ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিং। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগের তৎকালীন মহাব্যবস্থাপক শাহ আলমকে প্রতি মাসে দেয়া হতো দুই লাখ টাকা করে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অনিয়ম-দুর্নীতি ‘ম্যানেজ’ করতেন সাবেক ডেপুটি গভর্নর এসকে সুর চৌধুরী।’

আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম-দুর্নীতির ঘটনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে হাইকোর্ট বলেন, ‘২০০২ সালের পর থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকে যেসব এজিএম-ডিজিএম ছিলেন, তারা বসে বসে মধু খেতেন। তাই তারা চুপ থাকতেন।’ এ সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক শাহ আলমকে ‘চোর’ ও ‘ডাকাত’ বলেও উষ্মা প্রকাশ করেন হাইকোর্ট।

নিয়ন্ত্রণ সংস্থার শীর্ষ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আসা এসব অভিযোগে সমালোচনার ঝড় তুলেন অর্থনীতিবিদ ও খাতসংশ্লিষ্টরা। এরপরই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের টনক নড়ে। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি পাঁচ সদস্যের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং (কারণ উদ্ঘাটন) কমিটি গঠন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কমিটিতে ডেপুটি গভর্নর একেএম সাজেদুর রহমান খানকে প্রধান ও বৈদেশিক মুদ্রা পরিদর্শন বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক মো. সারোয়ার হোসেনকে কমিটির সদস্য সচিব করা হয়। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেনÑবাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক একেএম ফজলুর রহমান, ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি ডিপার্টমেন্টের মহাব্যবস্থাপক মো. কবির আহাম্মদ, ব্যাংক পরিদর্শন বিভাগ-৪-এর মহাব্যবস্থাপক মো. নুরুল আমীন।

কমিটি গঠনের তিন মাস পর হলেও এখন পর্যন্ত তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। তদন্তে গড়িমসি চলছেÑএমন অভিযোগ করেছেন অনেকে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের বেশিরভাগ কর্মী দক্ষতা ও সততার সঙ্গে কাজ করেন। দুই-একজন কর্মকর্তার জন্য সবার বদনাম গ্রহণযোগ্য নয়। তাই যাদের বিরুদ্ধে ঘুষ নেয়ার অভিযোগ উঠেছে সঠিক তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। কিন্তু আমরা দেখছি প্রথম থেকেই বিষয়টি নিয়ে গড়িমসি চলছে। তদন্ত কমিটি গঠন হয়েছে কিন্তু কোনো অগ্রগতি নেই। এভাবে অনিয়মের অভিযোগ এড়িয়ে গেলে আগামীতে অন্যান্য কর্মকর্তারাও অনিয়মে জড়িয়ে পড়বেন বলে তারা জানান।

তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে গড়িমসি নয়, চলমান লকডাউনের কারণে তদন্তে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে শেয়ার বিজকে বলেন, ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি এখনও প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি। কারণ লকডাউনের মধ্যে ঠিকঠাকভাবে কাজ করতে পারেনি কমিটি। তবে খুব দ্রুতই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

কমিটির প্রধান ডেপুটি গভর্নর একেএম সাজেদুর রহমান খান জানান, করোনাভাইরাসের কারণে চলমান বিধিনিষেধের কারণে নিয়মিত কাজ করা সম্ভব হয়নি। তবে তদন্ত চলছে, শিগগিরই প্রতিবেদন জমা দিতে পারব।

এদিকে নিয়ন্ত্রণ সংস্থার শীর্ষ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আসা অভিযোগের তদন্তে গড়িমসি আর্থিক খাতের জন্য উদ্বেগজনক বলেছেন অর্থনীতিবিদ ও খাতসংশ্লিষ্টরা। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সুশাসন নিশ্চিতে দ্রুত দুর্নীতির তদন্ত শেষ করা দরকার। পাশাপাশি অভিযুক্তরা দায়ী থাকলে তাদের আইনের আওতায় এনে ব্যবস্থা নেয়া জরুরি।

এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, খুব দায়িত্বশীল পদে থাকা একজন শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। যেহেতু তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব এর সঠিক তদন্ত শেষ করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সুশাসন নিশ্চিতে এটা খুব জরুরি। আর আদালতও যেন তাগিদ দেন যাতে দ্রুত প্রতিবেদন জমা দেয়। দোষীরা যদি পার পেয়ে যায় তাহলে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো কঠিন হবে। কারণ অন্যরা মনে করবে অনিয়ম করলেও বিচার হয় না। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইমেজ যাতে ক্ষুণœ না হয় ও মানুষ আস্থা না হারায়Ñএ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে বলে জানান সাবেক এ গভর্নর।

এদিকে বর্তমান বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক শাহ আলমের নানা অনিয়মের বিষয়ে লিখিত অভিযোগ করেছিলেন অনিয়ম দুর্নীতিতে অবসায়নের প্রক্রিয়ায় থাকা পিপলস লিজিংয়ের আমানতকারীরা। তাদের অভিযোগ, পিপলস লিজিংয়ের বর্তমান পরিচালকদের যোগসাজশে প্রতিষ্ঠানটির ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এর সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক মহাব্যবস্থাপক (জিএম) ও বর্তমান ইডি শাহ আলমের জড়িত। প্রায় দেড় বছর আগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, প্রধান বিচারপতি, অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ (দুদক) সরকারের সংশ্লিষ্ট ১১টি প্রতিষ্ঠানে লিখিত আকারে এ অভিযোগ দেয়া হয়। ২০১৯ সালের ২৮ জুলাইয়ে দেয়া উল্লিখিত লিখিত অভিযোগে স্বাক্ষর করেন ৭৬ জন আমানত ও বিনিয়োগকারী এবং উদ্যোক্তা শেয়ারহোল্ডাররা। তবে এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..