প্রচ্ছদ শেষ পাতা

তিন মাস ধরে বেতন বন্ধ পিপলস লিজিং কর্মীদের

শেখ আবু তালেব: বাংলাদেশ ব্যাংকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে দেশের ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডকে (পিএলএফএস) অবসায়নের সিদ্ধান্ত দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির ব্যাংক হিসাব পরিচালনার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। ফলে আটকে গিয়েছে সব লেনদেন। এতে কর্মীদের বেতন বন্ধ রয়েছে গত তিন মাস ধরে। একমাত্র আয়ের পথ বন্ধ হওয়ায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন সবাই। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা গেছে এ তথ্য।
সূত্রমতে, প্রতিষ্ঠান বন্ধের সিদ্ধান্ত ও বেতন না পাওয়ায় পিপলস লিজিং ছাড়তে শুরু করেছেন বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা। প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন পর্যায়ের জনবল রয়েছে ১৭৮ জন। এর মধ্যে গতকাল পর্যন্ত ৭৫ জন কর্মচারী ও কর্মকর্তা পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন, যা মোট জনবলের ৪৩ শতাংশ।
সম্প্রতি পিপলস লিজিংকে অবসায়নের সিদ্ধান্তে রায় দেন দেশের উচ্চ আদালত। প্রতিষ্ঠানটির সব ব্যাংক হিসাব জব্দের নির্দেশনা দেওয়া হয়। এই আদেশের ফলে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রভিডেন্ড ফান্ডের ব্যাংক হিসাবটিরও লেনদেন বন্ধ হয়ে যায়। একই সঙ্গে অন্যান্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে পিপলসের সঙ্গে লেনদেন করতেও নির্দেশনা দিয়েছে দেশের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বিএফআইইউ। শুধু ঋণ আদায়ের অর্থ প্রতিষ্ঠানটির ব্যাংক হিসাবে জমা দেওয়া যাবে।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, নিয়মিত সাধারণ ব্যয় নির্বাহ পর্যন্ত করতে পারছে না। বেতন বন্ধ থাকায় অন্যত্র চাকরি খুঁজছেন সবাই। যারা আছেন তারাও নিয়মিত অফিস করছেন না। শুধু দায়িত্বশীল পর্যায়ের জনবল নিয়মিত অফিসে আসছেন। অনেকে এসেই চলে যাচ্ছেন।
প্রতিষ্ঠান বন্ধে সবচেয়ে বেশি সমস্যার মুখে পড়েছেন নিচের সারির কর্মচারীরা। বিশেষ করে পিয়ন ও ক্লিনাররা। পুরোনো কর্মীরা বাদে সবাই অন্যত্র চাকরি খুঁজছেন। অফিসে আসা বন্ধ করে দিয়েছেন তারা।
তাদেরই একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ঢাকা শহরে মেসে থাকি। বাড়িতেও প্রতি মাসে কিছু টাকা দিতে হয়। বেতন বন্ধ হওয়ায় মেসে থাকা সম্ভব হচ্ছে না। তাই অন্য জায়গায় আপাতত চলার মতো একটি চাকরি নিয়েছি। প্রতিষ্ঠান থেকে ডাকলে আবার চলে আসব।
দীর্ঘ দেড় যুগের বেশি সময় ধরে চাকরি করছেন এমন একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রতিষ্ঠানের মায়ায় এখনও যেতে পারছি না। অনেকেই চলে গিয়েছেন, আরও কিছুদিন দেখব।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জনবল কমে যাওয়ায় কয়েকজনের কাজ একজনকে করতে হচ্ছে পিপলস লিজিংয়ে। অবসায়নের নির্দেশ দেওয়ার পর থেকে থমকে দাঁড়িয়েছে প্রতিষ্ঠানটির সব কার্যক্রম। গ্রাহকরা আসছেন অর্থ ফেরত নিতে। প্রতিদিনই গ্রাহকদের অনেকেই প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয়ে উপস্থিত হচ্ছেন।
এদিকে প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব ওয়েবসাইটটিও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সেখানে একটি বার্তা দেওয়া হয়েছে, ওয়েবসাইট হালনাগাদ করতে আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে। পরে যে কোনো সময়ে চালু করা হবে।
এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি অবসায়নের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক আসাদুজ্জামান খানকে অবসায়ক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিনিও প্রতিনিয়ত আইনি প্রক্রিয়া শেষ করতে আদালতে যাতায়াত করছেন।
সূত্র জানিয়েছে, কবে নাগাদ অবসায়ন প্রক্রিয়া শেষ হবে তা বলার মতো সময় এখনও হয়নি। এরই মধ্যে এক মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিষ্ঠানটি থেকে যদি নিয়মিত জনবল চলে যায়, তাহলে তালা খোলা ও বন্ধ করার মতো জনবলও পাওয়া যাবে না। অবসায়নের কাজ শেষ করতেও কিছু জনবলের প্রয়োজন হবে। কিন্তু বেতন বন্ধ থাকলে জনবল অন্যত্র চলে যাবে। কিন্তু এ প্রক্রিয়াটি কীভাবে হবে, তা নির্ধারণ করা নিয়েই চলছে গবেষণা। কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের ইতিহাসে কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার নজির নেই। সম্পূর্ণ নতুন হওয়ার ফলে আইনি প্রক্রিয়া শেষ করতে কিছুটা সময় লাগবেই।
কর্মচারীদের বেতন ও প্রতিষ্ঠানে বর্তমান অবস্থা নিয়ে জানতে চেয়ে পিপলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সামি হুদা’র সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হয়। বিষয়টি জানিয়ে এসএমএস দেওয়া হলেও কোনো উত্তর দেননি তিনি।
জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৬ জুন পিপলসকে অবসায়নের পক্ষে মতামত দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়। এরপরই আদালতে আবেদন করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক।
প্রসঙ্গত, ১৯৯৭ সালের ২৪ নভেম্বর আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পিপলস লিজিংকে অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ডিসেম্বরে প্রতিষ্ঠানটির আমানত ছিল দুই হাজার ৩৬ কোটি টাকা। অন্যদিকে ঋণ ছিল এক হাজার ১৩১ কোটি টাকা, এর মধ্যে খেলাপিই ৭৪৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ খেলাপি ঋণের হার ৬৬ শতাংশ।
২০১৪ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিষ্ঠানটির ওপর বিশেষ সমীক্ষা চালায়। এরপরই পরিবর্তন আনা হয় পরিচালনা পর্ষদে। ২০১৫ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে লোকসান গুনছে প্রতিষ্ঠানটি। খেলাপি প্রতিষ্ঠান থেকে টাকা আদায় করতে না পারায় আমানতকারীদের টাকাও ফেরত দিতে পারছে না প্রতিষ্ঠানটি। পিপলস লিজিংয়ের নামে থাকা সব হিসাব ও অনিয়মের দায়ে বহিষ্কৃত ৯ পরিচালকের নামে থাকা শেয়ার ও তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দের নির্দেশ দেওয়া হয়। এছাড়া পিপলস লিজিং ও সাবেক ৯ পরিচালক ও সাবেক দুই ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ব্যাংক হিসাব জব্দ এবং স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি স্থানান্তরে নিষেধাজ্ঞা দেন আদালত।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..