প্রচ্ছদ শেষ পাতা

তিন হাজার ঘটনায় মামলা করতে পারেনি কেন্দ্রীয় ব্যাংক

অর্থ পাচার

শেখ শাফায়াত হোসেন: পণ্য বিদেশে রফতানি হয়েছে, কিন্তু মূল্য দেশে আসেনি। আবার আমদানির জন্য টাকা পাঠানো হয়েছে, কিন্তু পণ্য দেশে আসেনি। ব্যাংকের মাধ্যমে সংঘটিত বৈদেশিক বাণিজ্যের আড়ালে এ রকম তিন হাজার ২৫টি ঘটনায় অর্থপাচারের আশঙ্কা করলেও এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য কোনো মামলা করতে পারেনি কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এর কারণ হিসেবে সংস্থাটি বলছে, বৈদেশিক মুদ্রায় লেনদেন নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৪৭-এ এ ধরনের ঘটনায় ট্রাইব্যুনালের বিচারিক ক্ষমতা থাকলেও মামলা আমলে নেওয়ার ক্ষেত্রে সময়ে সময়ে শাস্তিমূলক কর্মকাণ্ডের ঘোষণা দিয়ে সরকারি প্রজ্ঞাপন জারির কথা উল্লেখ থাকায় ট্রাইব্যুনাল এ-সংক্রান্ত কোনো মামলা নিতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন।

গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের নিরীক্ষা কমিটির ৬৫তম সভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সভা সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে সংঘটিত বৈদেশিক বাণিজ্যে তিন হাজার ২৫টি ঘটনা উদ্ঘাটিত হয়েছে, যেগুলোয় রফতানি মূল্য দেশে আসেনি বা আমদানির টাকা বিদেশে পাঠানো হলেও পণ্য দেশে আসেনি। প্রতিটি ঘটনায়ই নানা জটিলতার কথা বলে সংশ্লিষ্ট আমদানি-রফতানিকারক অর্থপাচারের দায় এড়াতে চেষ্টা করছে। অর্থপাচার সন্দেহ করলেও এসব ঘটনায় কোনো মামলা করতে পারেনি বাংলাদেশ ব্যাংক।

বৈদেশিক মুদ্রায় লেনদেন নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৪৭-এর ২২ ধারার ২নং উপধারায় বলা রয়েছে, ‘এই উপধারা মোতাবেক কোনো নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কোনো কর্মকাণ্ডকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে হলে এ বিষয়ে সরকারের প্রজ্ঞাপন জারি থাকতে হবে।’

এছাড়া ২২ ধারার ৩নং উপধারায় বলা হয়েছে, এই উপধারা মোতাবেক ট্রাইব্যুনাল কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডকে আমলে নেবে না, যদি সরকার একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সংশ্লিষ্ট উপধারা মোতাবেক আমলযোগ্য অপরাধ অথবা আয়কর আইন ১৯২২-এর ৫৪ ধারা মোতাবেক শাস্তিযোগ্য অপরাধ ঘোষণা না দেয়।’

সংশ্লিষ্ট আইনের ২৩ ধারায় বলা আছে, ট্রাইব্যুনাল যেকোনো মামলার বিচার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অতিরিক্ত সেশন আদালতের নিকট মামলা হস্তান্তর করতে পারবে। কিন্তু ২২ ধারার ২নং উপধারা মোতাবেক এখন পর্যন্ত কোনো সরকার কর্তৃক কোনো প্রজ্ঞাপন জারি না করায় ৩নং উপধারা মোতাবেক মামলা আমলে নিতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন ট্রাইব্যুনাল।

অর্থাৎ বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন নিয়ন্ত্রণ আইনে আমদানি-রফতানিসংক্রান্ত অপরাধগুলোর বিচারের সুযোগ থাকলেও প্রজ্ঞাপনের অভাবে এ বিষয়ে কোনো মামলা করতে পারেনি বাংলাদেশ ব্যাংক। আর এ সুযোগে পার পেয়ে যাচ্ছে বৈদেশিক বাণিজ্যনির্ভর অর্থপাচারকারীরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সম্প্রতি জাহাজনির্মাণ খাতের একটি প্রতিষ্ঠানের আটটি জাহাজ রফতানি হলেও এর মধ্যে চারটি জাহাজের মূল্য দেশে আসেনি। এ নিয়ে নানা জটিলতাও দেখা দিয়েছে। কিন্তু আইনে এ-সংক্রান্ত মামলা করার ক্ষেত্রে ২২ ধারার ৩নং উপধারা মোতাবেক সরকার কর্তৃক ঘোষণা না থাকায় কোনো মামলা হয়নি। তবে ওই চারটি জাহাজের রফতানিমূল্য দেশে না আসায় প্রতিষ্ঠানটির নগদ সহায়তার ২০০ কোটি টাকা আটকে দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়।

এদিকে সংশ্লিষ্ট আইনে মামলা করার জন্য বিদ্যমান আইনের ২২-এর ৩নং উপধারা মোতাবেক শাস্তিমূলক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে আইন ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারির অনুরোধ জানিয়ে সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়কে উদ্যোগ নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা নীতি বিভাগ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্যানেল আইনজীবী ব্যারিস্টার মুনিরুজ্জামান শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আমদানি-রফতানিসংক্রান্ত এ অপরাধগুলো অর্থপাচার আইনে বিচারের সুযোগ রাখা হয়নি। তাহলে তো বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন নিয়ন্ত্রণ আইনের প্রয়োজনই হতো না। এক্ষেত্রে বিদ্যমান বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলার বিষয়ে যেহেতু প্রজ্ঞাপন জারির একটি উপধারা রয়েছে, সেহেতু আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে মতামত দিয়েছি।’

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..