Print Date & Time : 21 September 2020 Monday 2:15 pm

তিস্তা ও এনআরসি নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই

প্রকাশ: October 10, 2019 সময়- 09:49 am

শেয়ার বিজ ডেস্ক: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘তিস্তা নিয়ে আলোচনা অব্যাহত আছে। তিস্তা ছাড়া আরও সাতটি নদী নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। আসামের এনআরসি নিয়ে অসুবিধা হয়নি। এটা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই।’ ভারত সফরে গিয়ে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠকে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি ও এনআরসি নিয়ে কতটা আশ্বস্ত হলেন সাংবাদিক মঞ্জুরুল ইসলামের এমন প্রশ্নের জবাবে এ উত্তর দেন প্রধানমন্ত্রী।
সাম্প্রতিক ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র সফর নিয়ে গণভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। গতকাল বেলা সাড়ে ৩টায় এ সংবাদ সম্মেলন শুরু হয়। প্রধানমন্ত্রী এ দুই সফরের উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলো সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন। সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন।
প্রধানমন্ত্রী এ সময় আরও বলেন, ‘ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদির কাছে আমি আসামের এনআরসি বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ পর্যন্ত অসুবিধা হয়নি, আর হওয়ারও কথা নয়। তাহলে যেখানে অসুবিধাই হয়নি, সেখানে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু দেখি না।’
বিশ্ব অর্থনীতি ফোরামের সম্মেলনে যোগদান করতে ৩ থেকে ৬ অক্টোবর চার দিন দিল্লি সফর করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেখানে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন। এর আগে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৪তম অধিবেশনে যোগদানের উদ্দেশে গত ২২ থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন।
ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সঙ্গে ফেনী নদীর পানিবণ্টন চুক্তি সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘যে চুক্তিটা হয়েছে, সেটা তাদের খাবার পানির জন্য। তারা যখন আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে পানি তোলে, সেটার প্রভাব আমাদের দেশেও পড়ে। তাই নদী থেকে সামান্য পানি দিচ্ছি। কেউ যদি পানি পান করতে চায়, আর আমরা না দিই, সেটা কেমন দেখা যায়?’
এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বলুন তো ফেনী নদীর উৎপত্তিস্থল কোথায়? এটা খাগড়াছড়িতে। এটা বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী একটি নদী। এর ৯৪ কিলোমিটার সীমান্তে, ৪০ কিলোমিটার বাংলাদেশের ভেতরে। সীমান্তবর্তী নদীতে দুদেশেরই অধিকার থাকে। যে চুক্তিটা হয়েছে, সেটা ত্রিপুরাবাসীর খাবার পানির জন্য। তারা যখন আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে পানি তোলে, তার প্রভাব আমাদের দেশেও পড়ে। তাই নদী থেকে সামান্য পানি দিচ্ছি। সব জায়গায় আমরা নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করেছি। যেটুকু পানি নিয়েছে, ততটুকু আমাদের অংশেও পড়েছে বলেই চুক্তি করেছি।’
বিএনপিসহ অন্যদের সমালোচনার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিএনপি নেতাদের কাছে আমার প্রশ্ন: জিয়াউর রহমান ও পরে খালেদা জিয়া যখন ভারতে যান, তারা কি গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি করতে পেরেছিলেন? তারা কি জবাব দিয়েছিলেন? আমরা ক্ষমতায় আসার পর গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি করার পর শুনতে হয়েছে ২৫ বছরের চুক্তি, দেশ বেচার চুক্তি। এবার হিসাব করে দেখুন কতটা গেছে আর কতটা পেয়েছি।’
বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কেউ যদি কোনো অপরাধ করে, সে কোন দল করে, কী করে, তা আমি দেখি না; অপরাধী অপরাধীই। বুয়েটে ওই ঘটনা যখন ঘটে, সকালে শুনে আমি সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছিলাম আলামত সংগ্রহ করতে, সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করতে। ছাত্ররা নামার আগেই আমরা তৎপরতা শুরু করি। কে ছাত্রলীগ বা কী জানি না। অপরাধী অপরাধীই, অন্যায়কারীর বিচার হবে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি তো বলেছি, ঘটনা সঙ্গে জড়িত কোথায়, কে ছিল সবকটিকে গ্রেফতার করতে। তবে পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করার পর সেটা আনতে দেবে না। আমার মনে প্রশ্ন দেখা দিল, এটা কেন? হত্যাকারীদের কেউ কি এর মধ্যে আছে যে, ফুটেজ প্রকাশিত হলে তাদের পরিচয় বের হয়ে যাবে। পরে তারা ফুটেজ নিয়ে এলো এবং কর্তৃপক্ষকে একটি কপি দিয়ে এলো।’
তিনি বলেন, ‘একটি বাচ্চা ছেলে, ২১ বছর বয়স। তাকে হত্যা করা হলো। মারা হলো পিটিয়ে পিটিয়ে। কী অমানবিক। পোস্টমর্টেম রিপোর্টটি দেখেছি। সব ইনজুরি ভেতরে।’
তিনি বলেন, ‘একটি কথা আমার মাথায় এলো। ২০০১ সালে আমাদের নেতাকর্মীদের হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। মারা হতো এমনভাবে যাতে বাইরে থেকে বোঝা যেত না। বাংলাদেশের ইতিহাসে এ পর্যন্ত কত হত্যা হয়েছে। ছাত্রদল বুয়েটে টেন্ডারবাজি করতে গিয়ে সনিকে হত্যা করেছে। ওই বুয়েটে আমাদের কত নেতাকর্মী নির্যাতনের শিকার হয়েছে। আমরা কারও কাছে বিচার পেয়েছি? ক্ষমতায় আসার পর থেকে আমি চেষ্টা করেছি, সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ ধরনের কোনো ঘটনা যাতে না ঘটে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যারা এ ধরনের ঘটনা ঘটাবে, তারা আমার পার্টির এটা আমি কখনোই মেনে নেব না। আমি সঙ্গে সঙ্গে ছাত্রলীগকে ডেকেছি। তাদের বহিষ্কার করতে বলেছি, পুলিশকে বলেছি অ্যারেস্ট করতে। ছাত্ররাজনীতিতে এই বুয়েটে আমাদের অনেক নেতাকর্মীকেও হত্যা করা হয়েছে। কেউ কি কোনোদিন বলেছে, কেউ অ্যারেস্ট হয়েছে? এটা করা হয়নি। আমি ক্ষমতায় আসার পর চেষ্টা করেছি সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ স্বাভাবিক করতে।’
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আন্দোলন কীসের জন্য। বিচার তো হবেই। যে মা-বাবা সন্তান হারিয়েছেন, তাদের যে কষ্টটা কী, সেটা আমি বুঝি। একটি সাধারণ পরিবারের ছেলে, ব্রিলিয়ান্ট ছেলে, তাকে কেন হত্যা করা হলো। এই নৃশংসতা, এই জঘন্য কাজ কেন। এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা আমরা নিচ্ছি। কোনো দল-টল বলে আমি মানি না। আমি বিচার পাইনি। যখন কেউ বিচার দাবি করে, সেটা আমি বুঝি।’
এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যে কোনো আন্দোলন-সংগ্রামে ছাত্ররাই মুখ্য ভূমিকা নিয়েছে। তবে বুয়েট যদি মনে করে, তবে ছাত্ররাজনীতি ব্যান্ড করে দিতে পারে। এটা তাদের ব্যাপার। তবে ছাত্ররাজনীতি পুরো নিষিদ্ধের কথা তো ‘মিলিটারি ডিক্টেটরের কথা’।
শেখ হাসিনা বলেন, নেতৃত্ব উঠে এসেছে ছাত্রনেতৃত্ব থেকে। রাজনীতি শিক্ষার ব্যাপার, ট্রেনিংয়ের ব্যাপার। আমি নিজেই ছাত্ররাজনীতি করে এসেছি। দেশের ভালো-মন্দের চিন্তা তখন থেকেই আমার তৈরি হয়েছে। এজন্য দেশের মানুষের ভালোমন্দ দেখতে পারছেন বলেও মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। তবে একটি ঘটনার (আবরার হত্যাকাণ্ড) কারণে পুরো ছাত্ররাজনীতিকে দোষারোপ করা ঠিক হবে না বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, এটা তো রাজনীতি নয়। আবরার হত্যাকাণ্ডে রাজনীতি কোথায় এমন প্রশ্ন তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এর পেছনের কারণ খুঁজে বের করতে হবে। এ সময় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেক শিক্ষার্থীর পেছনে সরকারের বিপুল খরচের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হল সার্চ করা দরকার। এজন্য তিনি সবার সহযোগিতা চান।
ক্যাসিনো বা জুয়ার জন্য দেশের একটি জায়গা নির্ধারণ করে দেওয়ার কথা হাসতে হাসতে বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘যারা ক্যাসিনো ও জুয়া খেলে অভ্যস্ত, তাদের কেউ কেউ হয়তো দেশ থেকে ভেগে গেছে। এখানে-সেখানে খেলার জায়গা খোঁজাখুঁজি করছে। আমি বলেছি, একটি দ্বীপমতো জায়গা খুঁজে বের করো, সে দ্বীপে আমরা সব ব্যবস্থা করে দেব। দরকার হলে ভাসানচরের এক পাশে রোহিঙ্গা, আরেক পাশে এই ক্যাসিনোর ব্যবস্থা করে দেব। সবাই ওখানে চলে যাবে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাস্তবতার নিরিখে বলছি, অভ্যাস যদি বদঅভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়, তবে এই অভ্যাস যাবে না। তাই বারবার খোঁজাখুঁজি না করে একটি জায়গা ঠিক করে দেব। ভাসানচর খুব বড় জায়গা। ১০ লাখ লোকের বসতি দেওয়া যাবে। কারা কারা (ক্যাসিনো) করতে চায়, করতে পারবেন। এর জন্য লাইসেন্স নিতে হবে, ট্যাক্স দিতে হবে।
তিনি বলেন, এখন যারা লুকিয়ে এটা করে, তারা সেখানে গিয়ে খেলতে পারবেন। আমাদের কোনো সমস্যা নেই। সে ব্যবস্থা করে দেব। এতে সরকার ট্যাক্স পাবে।
প্রধানমন্ত্রীর এমন মন্তব্যে সাংবাদিক সারির কয়েকজন হেসে উঠলে তিনি বলেন, আমি বাস্তবতাটাই বলছি। পরে প্রধানমন্ত্রী নিজেও হেসে ফেলেন।