সারা বাংলা

তীর রক্ষাবাঁধ নির্মাণ দাবি কমলনগরে মেঘনার ভয়াবহ ভাঙন

জুনায়েদ আহম্মেদ, লক্ষ্মীপুর: লক্ষ্মীপুরের কমলনগরে মেঘনার অব্যাহত ভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ৩৭ কিলোমিটার তীর সংরক্ষণ বাঁধ প্রকল্পের কাজ ধীরগতির কারণে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। গত ২৫ দিনে মসজিদ-মাদরাসা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা বিলীন হয়েছে। অব্যাহত ভাঙনে বিলীন হচ্ছে হাজার হাজার একর ফসলি জমি। প্রতিনিয়ত এ অঞ্চলের মানুষ হারাচ্ছে ভিটেমাটি।

পরিসংখ্যান বলছে, গত ২০ বছর ধরে মেঘনা নদীর অব্যাহত ভাঙনে রামগতি কমলনগর উপজেলার ৩১টি হাটবাজার, ৩৫টি স্কুল, কলেজ ও মাদরাসা, ৩০টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, ৫২টি মোবাইল নেটওয়ার্ক টাওয়ার, ৪০০ কিলোমিটার কাঁচা-পাকা রাস্তা, ৩৭ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ, ৫০ হাজার একর ফসলি জমি, ৪৫ হাজার ঘরবাড়িসহ কয়েক হাজার কোটি টাকার সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা বিলীন হয়েছে।

এদিকে গত ২৫ দিনে ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করায় মসজিদ-মাদরাসা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা বিলীন হয়ে গেছে। এর মধ্যে উপজেলার লুধুয়া ঘাটে ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে লুধুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। প্রতিদিন চোখের সামনে বিলীন হচ্ছে বসতবাড়ি, ফসলি জমি, মসজিদ, মাদরাসাসহ বিভিন্ন স্থাপনা। ভাঙনের তীব্রতায় বিলীন হয়েছে প্রিয়জনের শেষ স্মৃতি কবরস্থান টুকুও। এতে চরম আতঙ্কে রয়েছেন স্থানীয়রা। ভাঙন ঝুঁকিতে রয়েছে কমলনগর উপজেলার বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। মেঘনার অস্বাভাবিক ভাঙনে জায়গাজমি ও সহায় সম্বল হারিয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে বিভিন্ন স্থানে মানবেতর জীবনযাপন করছেন এসব এলাকার হাজারো মানুষ।

লক্ষ্মীপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা যায়, মেঘনার সবচেয়ে বেশি ভাঙনকবলিত এলাকা হিসেবে কমলনগর উপজেলার লুধুয়াবাজার, চর কালকিনি, চর লরেন্স, চরফলকন, সাহেবের হাট ও রামগতি উপজেলার সবুজগ্রাম, বড়খেরী ও সদর উপজেলার বুড়ির ঘাট এলাকাকে চিহিƒত করা হয়েছে। মেঘনা নদীর ভাঙন থেকে রক্ষায় তীর সংরক্ষণে উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় তিন ধাপে ৩৭ কিলোমিটার তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণকাজে প্রায় সাড়ে ১৩শ’ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। প্রথম ধাপে ২০১৪ সালে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে রামগতি ও কমলনগর উপজেলায় মেঘনা নদীভাঙন প্রতিরোধে ১৯৮ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে কমলনগর উপজেলার মাতাব্বর নগর এলাকায় এক কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করা হয়। দ্বিতীয় ধাপে এ উপজেলার সাহেবের হাট থেকে মতিরহাট এলাকায় আট দশমিক ২২৪ কিলোমিটার এবং তৃতীয় ধাপে রামগতির আলেকজান্ডার থেকে কমলনগর উপজেলার চরফলকন এলাকা পর্যন্ত পাঁচ কিলোমিটার এবং কমলনগর উপজেলার চরফলকন থেকে মাতাব্বর নগর এলাকায় সাড়ে ১০ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করা হবে।

স্থানীয়রা জানান, বর্তমানে নদীর ঢেউ ও খরস্রোত জোয়ার-ভাটা তেমন না থাকলেও ভাঙনের তীব্রতা থেকে কোনোভাবেই রক্ষা পাওয়া যাচ্ছে না। ভাঙন অব্যাহত থাকলে অচিরেই কমলনগর উপজেলা শহর হাজিরহাটসহ উপজেলার বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা বিলীন হবে। মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে পুরা কমলনগর উপজেলা। এ অবস্থায় ভিটেমাটি রক্ষাসহ কমলনগর উপজেলাকে নদীভাঙনের হাত থেকে বাঁচাতে দ্রুত বাঁধ নির্মাণের দাবি জানান তারা।

উপজেলার লুধুয়া এলাকার নুর আলম মাঝি জানান, গত ২০ দিনে মেঘনা নদী যেভাবে এ অঞ্চলের ভিটেমাটি গিলে খাচ্ছে তা গত ২০ বছরেও এভাবে ভাঙতে দেখেননি তিনি। অতিদ্রুত বাঁধ নির্মাণ করে মেঘনার ভাঙনের হাত থেকে এ উপজেলাবাসীকে রক্ষার দাবি করেন তিনি।

মেঘনার করাল গ্রাসে ১০ বার ভাঙনের শিকার একই এলাকার নজির মিয়া জানান, মেঘনার ভাঙনে এ পর্যন্ত দশবার বসতভিটে হারিয়েছি। সবকিছু হারিয়ে দায়দেনা করে লুধুয়া বাজারের পাশে বসতভিটে নির্মাণ করলেও এখন মেঘনার ভাঙনের তীব্রতায় আতঙ্কে রয়েছেন তিনি।

এদিকে মেঘনার ভাঙন থেকে নিজেদের ভিটেমাটি রক্ষায় নিজ খরচে বিভিন্ন সময় ডোল বাঁধ, জঙ্গলা বাঁধ ও জিও ব্যাগ ডাম্পিংয়ের উদ্যোগ নেয় স্থানীয়রা। এতে ঠেকানো যায়নি ভাঙন। ভাঙনরোধে সরকারের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে চলতি বছর একাধিকবার বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ও রামগতি-কমলনগর বাঁচাও মঞ্চ এর উদ্যোগে নদীর পাড়ে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়।

রামগতি-কমলনগর বাঁচাও মঞ্চের আহ্বায়ক আবদুস সাত্তার পলোয়ান জানান, বর্ষায় মেঘনার ভাঙনরোধে দু’এক জায়গায় জিও ব্যাগ ডাম্পিং করার উদ্যোগ নিলেও কার্যত ভাঙন রোধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ২০১৪ সালে একনেকের বৈঠকে রামগতি-কমলনগরকে নদী ভাঙা থেকে রক্ষায় ৩৭ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়। কিন্তু সেখানে কাজ হয়েছে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার। এ অবস্থায় ভাঙনরোধে বাকি ৩২ কিলোমিটার বাঁধ দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।

লক্ষ্মীপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) ফারুক আহম্মেদ জানান, গত এক মাসে ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে। এরই মধ্যে কমলনগের ভাঙনকবলিত ৪০০ মিটার এলাকায় ৭০ হাজার জিও ব্যাগ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নের মাধ্যমে ডাম্পিং করা হয়েছে। তবুও ভাঙন ঠেকানো যাচ্ছে না। তবে জিও ব্যাগ ডাম্পিংয়ের কাজ চলছে। ভাঙন ঠেকাতে কর্তৃপক্ষের কাছে বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। বরাদ্দ পেলে আগামী বর্ষায় মেঘনার ভাঙন মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..