প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

তৃতীয় এলওসি: চূড়ান্ত হয়েছে আট প্রকল্প ১৩টি নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতা

ইসমাইল আলী: বাংলাদেশকে দুই দফায় ২৮৬ কোটি ২০ লাখ ডলার রাষ্ট্রীয় ঋণ (এলওসি) অনুমোদন করেছে ভারত। পাশাপাশি ২০ কোটি ডলার অনুদান দেয় দেশটি। এবার তৃতীয় এলওসির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আসন্ন ভারত সফরে এ-সংক্রান্ত চুক্তি সই হওয়ার কথা রয়েছে। এজন্য আটটি প্রকল্প চূড়ান্ত করা হয়েছে। এর বাইরে প্রস্তাবিত ১৩ প্রকল্প নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় রয়েছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।

সূত্র জানায়, তৃতীয় এলওসির প্রকল্প চূড়ান্তে গত মাসে আন্তমন্ত্রণালয় সভা আহ্বান করে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)। এতে সংশ্লিষ্ট ১১ মন্ত্রণালয় ও সংস্থা এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে ২৬টি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়। এর মধ্যে আটটি প্রকল্প চূড়ান্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের তিনটি প্রকল্প রয়েছে। এছাড়া রেলওয়ের দুটি এবং পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের একটি করে প্রকল্প রয়েছে। এক্ষেত্রে ছয়টি প্রকল্পের ব্যয় প্রাথমিকভাবে ধরা হয়েছে ১১৭ কোটি ডলার। দেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ৯ হাজার ৩৬০ কোটি টাকা।

এর বাইরে ১৩টি প্রকল্প নিয়ে বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়নি। এজন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মতামত চাওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সড়ক পরিবহনের চারটি, বিদ্যুতের তিনটি ও নৌপরিবহনের দুটি প্রকল্প রয়েছে। এছাড়া রেলওয়ে, জ্বালানি, স্থানীয় সরকার বিভাগ ও টেলিযোগাযোগের একটি করে প্রকল্প রয়েছে। এছাড়া পাঁচটি প্রকল্প ভারতের অর্থায়নে বাস্তবায়ন না করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সূত্র জানায়, গত নভেম্বরে পররাষ্ট্রসচিবের ভারত সফরের সময় নতুন এলওসির জন্য প্রকল্পের তালিকা তৈরি করতে বলেন। অবকাঠামো, দারিদ্র্যবিমোচন ও দুই দেশের সংযোগে ভূমিকা রাখে এমন প্রকল্প নিতে ভারতের পক্ষ থেকে পরামর্শ দেওয়া হয়। পররাষ্ট্রসচিব দেশে ফিরে ইআরডিকে চিঠি দিয়ে প্রকল্প বাছাইয়ের অনুরোধ করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে এখন পর্যন্ত আটটি প্রকল্প চূড়ান্ত করা হয়েছে ইআরডি। বাকিগুলো বাছাই করা হচ্ছে। ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে এ-সংক্রান্ত চুক্তি সই হতে পারে।

নতুন ঋণের জন্য প্রকল্প তালিকায় রয়েছে ১৯ কোটি ৬২ লাখ ডলার ব্যয়ে বুড়িগঙ্গা নদী পুনরুদ্ধার প্রকল্প। এর আওতায় নতুন ধলেশ্বরী-পুংলি-বনসাই-তুরাগ-বুড়িগঙ্গা খনন করা হবে। নৌ মন্ত্রণালয়ের অধীন তিন কোটি ৮০ লাখ ডলার ব্যয়ে আশুগঞ্জ নৌরুট খনন ও পায়রা বন্দরের বহুমুখী টার্মিনাল নির্মাণে ৩৫ কোটি ডলার চাওয়া হবে। বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জের শহীদ এম মনসুর আলী স্টেশন পর্যন্ত ডুয়েল গেজ নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫০ কোটি ১২ লাখ ডলার। স্থলবন্দরের শুল্ক স্টেশনের আধুনিকায়ন প্রকল্প রয়েছে এ তালিকায়। তবে এর ব্যয় এখনও নির্ধারণ হয়নি। এছাড়া ঈশ্বরদীতে অভ্যন্তরীণ কনটেইনার ডিপো (আইসিডি) নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে সাড়ে তিন কোটি ডলার। প্রায় পাঁচ কোটি ডলার ব্যয়ে মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন প্রকল্প এ তালিকায় রয়েছে। এছাড়া বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের সৈয়দপুর বিমানবন্দর উন্নয়ন প্রকল্প রয়েছে। এর ব্যয়ও চূড়ান্ত হয়নি।

রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব ফিরোজ সালাহউদ্দিন শেয়ার বিজকে বলেন, রেলের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি প্রকল্প ভারতের ঋণে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। নতুন আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য তৃতীয় এলওসিতে প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠকে এসব প্রকল্প চিহ্নিত করা হয়েছে। এখন দুই দেশের মধ্যে চুক্তি হলে প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে।

তথ্যমতে, ভারতের ঋণের জন্য প্রস্তাবিত ১৩ প্রকল্প সম্পর্কে এক সপ্তাহের মধ্যে মতামত চাওয়া হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম ড্রাই ডক লিমিটেড শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে রয়েছে। এটি নির্মাণে মতামত গ্রহণের জন্য নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা হয়। আর এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে চট্টগ্রাম বন্দরের সম্প্রসারণ পরিকল্পনার সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে। ভারতের ঋণে এটি বাস্তবায়নেও মতামত চাওয়া হয়েছে।

এদিকে ভারতের অনুদানের মাধ্যমে ফেনী-বেলুলিয়া রেলপথ নির্মাণের কথা ছিল। এটি নির্মাণেও ভারতের ঋণ প্রস্তাব করা হলে আপত্তি তোলে রেলওয়ে। কেন অনুদান দরকার, তা জানাতে চিঠি দেওয়া হয়েছে রেলওয়েকে। সড়ক পরিবহনের প্রকল্পগুলোর মধ্যে ঢাকা ও চট্টগ্রামে যানজট কমাতে ফ্লাইওভার নির্মাণ, বেনাপোল থেকে যশোর হয়ে ভাঙ্গা পর্যন্ত সড়ক চার লেনে উন্নীত করা, চট্টগ্রামের রামগড় থেকে বারুয়ারহাট পর্যন্ত চার লেন নির্মাণ এবং কুমিল্লা থেকে আখাউড়া পর্যন্ত সড়ক চার লেন করায় ভারতের ঋণের বিষয়ে মতামত চাওয়া হয়েছে।

বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন নির্মাণ ও মোল্লার হাটে ১০০ মেগাওয়াটের সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ও তিনটি শহরে (ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী) এক লাখ এলইডি সড়ক বাতি স্থাপনে বিদ্যুৎ বিভাগের এবং শিলিগুড়ি থেকে পার্বতীপুর পর্যন্ত জ্বালানি তেল সঞ্চালন পাইপলাইন স্থাপনে জ্বালানি বিভাগের মতামত চাওয়া হয়েছে। এছাড়া ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও এক হাজার ইউনিয়নে অপটিক্যাল ফাইবার কেব্ল নেটওয়ার্ক উন্নয়নেও মতামত চাওয়া হয়েছে।

এর বাইরে পায়রা বন্দর ড্রাই বাল্ক কয়লা টার্মিনাল, চট্টগ্রামের বে-টার্মিনাল, ভাঙ্গা থেকে বরিশাল হয়ে ভাঙ্গা পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ, ৩০টি ব্রড গেজ ইঞ্জিন সংগ্রহ ও খুলনা বন্দর উন্নয়ন প্রকল্প তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।