দিনের খবর প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা

 কাজী সালমা সুলতানা:

২৬ অগ্রহায়ণ ১৩৭৮

সোমবার ১৩ ডিসেম্বর, ১৯৭১

মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত যৌথবাহিনীর অগ্রবর্তী দল শীতলক্ষ্যা ও বালু নদী অতিক্রম করে ঢাকার প্রায় পাঁচ মাইলের মধ্যে পৌঁছে যায়। বালু নদীর পূর্বদিকে পাকিস্তানি বাহিনী নিজস্ব অবস্থান ঘিরে এক সুদৃঢ় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলে। বাসাবো ও খিলগাঁও এলাকার চারদিকে আগে থেকেই পাকিস্তানি বাহিনী ফিল্ড ডিফেন্স বা আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য সর্বাত্মক ব্যবস্থাসহ অবস্থান নিয়েছিল।

যৌথবাহিনী ঢাকার পতন দ্রুত করার লক্ষ্যে যুদ্ধের কৌশল পরিবর্তন করে। কারণ ঢাকার পতন হলে আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানি বাহিনীর পরাজয় চূড়ান্ত হবে।

ওদিকে পূর্ব ও উত্তর দিক থেকে মিত্রবাহিনী ঢাকার প্রায় ১৫ মাইলের মধ্যে পৌঁছে যায়। ৫৭নং ডিভিশনের দুটো ব্রিগেড এগিয়ে আসে পূর্ব দিক থেকে। উত্তর দিক থেকে আসে জেনারেল গন্ধর্ব নাগরার ব্রিগেড এবং টাঙ্গাইলে অবতরণ করা ছত্রীসেনারা। পশ্চিমে ৪নং ডিভিশনও মধুমতি পাড়ি দিয়ে পৌঁছে যায় পদ্মার তীরে।

রাত ৯টায় মেজর জেনারেল নাগরা টাঙ্গাইলে আসেন। ব্রিগেডিয়ার ক্লে ও ব্রিগেডিয়ার সান সিং সন্ধ্যা থেকে টাঙ্গাইলে অবস্থান করছিলেন। রাত সাড়ে ৯টায় টাঙ্গাইল ওয়াপদা রেস্ট হাউসে তারা পরবর্তী যুদ্ধ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনায় বসেন। আলোচনার শুরুতে মেজর জেনারেল নাগরা মুক্তিবাহিনীর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধারা যদি আমাদের বিনা বাধায় এতটা পথ পাড়ি দিতে সাহায্য না করতেন, তাহলে আমাদের বাহিনী দীর্ঘ রাস্তায় যুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়ত। রাস্তাতেই আমাদের অনেক শক্তি ক্ষয় হয়ে যেত।’

উত্তরাঞ্চলে যৌথবাহিনী দুপুরে গোবিন্দগঞ্জ থেকে ঢাকা মহাসড়ক ধরে বগুড়ার উদ্দেশে রওনা হয়। বগুড়ায় তখন শত্রুবাহিনীর একটি রেজিমেন্ট কামান ও ট্যাংকসহ অবস্থান করছিল। হিলি রক্ষাব্যূহ ছেড়ে আগেই পাকিস্তানি সৈন্যরা বগুড়ায় চলে এসে গড়ে তুলেছিল শক্তিশালী প্রতিরোধ।

রাতে যৌথবাহিনী চারদিক থেকে বগুড়া শহর ঘিরে ফেলে। মধ্যরাতে যৌথবাহিনীর তিনটি ব্যাটালিয়ন উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্ব-উত্তর দিক থেকে শত্রুর ওপর আঘাত হানে।

সৈয়দপুরে এদিন আত্মসমর্পণ করে ৪৮ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের অধিনায়কসহ ১০৭ পাকিস্তানি সেনা। চতুর্থ বেঙ্গল চট্টগ্রামের দিকে এগোনোর পথে নাজিরহাটে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাধা দেয়। এখানে ২৪তম ফ্রন্টিয়ার ফোর্স তাদের তিন কোম্পানি এবং বেশকিছু ইপিসিএএফসহ অবস্থান নিয়েছিল। এখানে ব্যাপক যুদ্ধের পর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী পালিয়ে যায়। এদিকে বাংলাদেশের নিয়মিত বাহিনীর সর্বপ্রথম ইউনিট হিসেবে ২০ইবি ঢাকার শীতলক্ষ্যার পূর্বপাড়ে মুরাপাড়ায় পৌঁছায়।

এদিকে শান্তি কমিটি, ডা. মালিক মন্ত্রিসভা ও স্বাধীনতাবিরোধী দালালরা বেশিরভাগই অবস্থা বেগতিক দেখে গা ঢাকা দেয়। তবে এর মধ্যেও ঘাতক আলবদর চক্র সক্রিয় ছিল। যার নির্লজ্জ বহিঃপ্রকাশ ঘটে দেশের সবচেয়ে কৃতী সন্তানদের পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডে। এদিন সাংবাদিক সেলিনা পারভীনকে তার সিদ্ধেশ্বরীর বাসা থেকে ধরে নিয়ে যায় কিছু আলবদর কর্মী। 

পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তাদের একমাত্র ভরসা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ। এদিন নিরাপত্তা পরিষদের মুলতবি বৈঠকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব সোভিয়েত ভোটের মুখে বাতিল হয়ে যায়। যে কারণেই হোক সামরিক হস্তক্ষেপের প্রশ্নে চীনের সম্মতির সম্ভাবনাকে তখনও যুক্তরাষ্ট্র সম্পূর্ণ বাতিল করে উঠতে পারেনি। কাজেই সেই ভরসায় ২৪ ঘণ্টা নিশ্চল রাখার পর সপ্তম নৌবহরকে পুনরায় সচল করা হয় বঙ্গোপসাগরের দিকে। ইসলামাবাদে বারবার সাহায্যের আবেদন জানাচ্ছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। ইসলামাবাদ থেকে সামরিক কর্তারা ঢাকায় অবস্থানরত ঘাতকদের আশ্বস্ত করে যে, সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে, আরও কয়েকটা দিন অপেক্ষা কর। পশ্চিম রণাঙ্গনে ভারতীয় বাহিনীকে এমন মার দেওয়া হবে যে, তারা নতজানু হয়ে ক্ষমা চাইবে ও যুদ্ধ থেমে যাবে। কিন্তু পাকিস্তানি বাহিনীর জন্য সেদিন আর আসেনি।

তথ্যসূত্র: মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও মূলধারা ৭১

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..