প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা

কাজী সালমা সুলতানা:

২৩ অগ্রহায়ণ ১৩৭৮, বৃহস্পতিবার

১০ ডিসেম্বর, ১৯৭১

এদিন পরাজয়ের ভয়ে লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজি পালানোর জন্য একটি পরিকল্পনা করেন। কিন্তু বিবিসি তার এ পরিকল্পনা ফাঁস করে দেয়। নিয়াজি তার দুর্বলতা আড়াল করতে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে যান এবং বিদেশি সাংবাদিকদের খোঁজ করেন। এ সময়ে তিনি দম্ভভরে ঘোষণা করেন, আমার সৈন্যদের ফেলে আমি কখনোই পালিয়ে যাব না।

১০ ডিসেম্বর হেলিকপ্টারযোগে ভারতীয় বাহিনীর রায়পুরা অবতরণের পর প্রায় তিন ঘণ্টাব্যাপী ঢাকায় সামরিক লক্ষ্যবস্তুর ওপর ভারতীয় বিমানের আক্রমণ চলে। মিত্রবাহিনীর বিমান এদিন ঢাকা রেডিও স্টেশনে বোমা বর্ষণ করে এবং কুর্মিটোলা বিমানঘাঁটি এলাকা নিয়ন্ত্রণে নিতে রকেট হামলা চালায়।

এদিন মিত্রবাহিনীর বিমান আক্রমণের ফলে চট্টগ্রাম ও চালনা বন্দর অচল হয়ে পড়ে। কয়েকটি জাহাজে করে পাকিস্তানি সৈন্যরা পালানোর সময় হাতেনাতে ধরা পড়ে যায়। একটি জাহাজে নিরপেক্ষ দেশের ফ্ল্যাগ লাগিয়ে সিঙ্গাপুরের পথে যাত্রাকালে মিত্রবাহিনীর নৌসেনাদের হাতে ধরা পড়ে যায় পাকিস্তানি সৈন্যরা।

এদিকে জাতিসংঘে পাকিস্তানের স্থায়ী প্রতিনিধি আগা শাহী মহাসচি উথান্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে পূর্ব পাকিস্তান থেকে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহারের দাবি জানান। চীনের অস্থায়ী পররাষ্ট্রমন্ত্রী চিপো ফেই বলেন, ভারতের কার্যকলাপে তার সম্প্রসারণবাদী নগ্নরূপ প্রকাশ হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, ভারত বর্তমানে সাম্রাজ্যবাদী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে।

এদিন সম্মিলিত বাহিনী উত্তরাঞ্চলের যুদ্ধে সর্বাত্মক সাফল্য অর্জন করে। মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনী যৌথ অভিযান চালিয়ে দিনাজপুর, রংপুর ও সৈয়দপুরের পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। যৌথবাহিনী এই তিন শহরের মধ্যে রংপুর ও দিনাজপুর জেলা সম্পূর্ণ শত্রুমুক্ত করে। রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী জামালপুর গ্যারিসন ছেড়ে পালিয়ে ঢাকার দিকে যাত্রা শুরু করে। তারা ঢাকার কাছে এসে মিত্রবাহিনীর মুখামুখি হয়। এখানে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধে প্রায় এক হাজার ৫০০ পাকিস্তানি সৈন্য হতাহত হয়। অবশিষ্টরা আত্মসমর্পণ করে।

এদিন দিবাগত রাতে আল-বদর বাহিনীর গুপ্তঘাতকদল দৈনিক ইত্তেফাকের কার্যনির্বাহী সম্পাদক সিরাজুদ্দিন হোসেন ও পিপিআই’র প্রধান প্রতিবেদক সৈয়দ নাজমুল হককে তাদের বাসভবন থেকে অপহরণ করে। পরে আর তাদের খোঁজ পাওয়া যায়নি।

এদিন ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী নয়াদিল্লিতে বলেন, যুদ্ধবিরতি-সংক্রান্ত জাতিসংঘের আহ্বান ভারত প্রত্যাখ্যান করেনি বা গ্রহণও করেনি। প্রস্তাবটি সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে। তিনি বলেন, পরিস্থিতির তখনই উন্নতি হবে, যখন বাংলাদেশ তার নিজস্ব সরকার গঠন করবে এবং এক কোটি শরণার্থী ভারত থেকে দেশে ফিরে যাবে।

এদিকে ১০ ডিসেম্বর শত্রুমুক্ত জেলা যশোরের দায়িত্ব গ্রহণ করেন ডেপুটি কমিশনার ওয়ালিউল ইসলাম। এদিন পাবনা জেলার সুজানগর বাজারের কালীমন্দিরে ঘটে এক নরমেধযজ্ঞ। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সুজানগর বাজারের প্রখ্যাত ব্যবসায়ী মানিকদি গ্রামের অজিত কুণ্ডু, একই গ্রামের আবদুল হামিদ ও সুজানগর থানাসংলগ্ন কালীমন্দিরে অবস্থানকারী কৃষি কর্মকর্তা গোপালচন্দ্র ভাদুরীকে ধরে এনে কালীমন্দিরের সামনে নির্মমভাবে হত্যা করে মন্দিরের পাশের একটি কুয়ার মধ্যে লাশ ফেলে দেয়। এই কুয়াই তাদের সমাধিতে পরিণত হয়। এছাড়া এদিন পাকিস্তানি বাহিনী ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার কুতুবা ইউনিয়নের মানিকা গ্রামে এক হত্যাযজ্ঞ ঘটায়। সেদিনকার নির্মমতায় মানিকা গ্রামের আনুমানিক ২৫ জন শহিদ হন।

এদিনে ভারতীয় বাহিনীর মেঘনা অতিক্রমের সংবাদ লাভের পর যেকোনো মূল্যে এই অগ্রাভিযান রোধ করে সপ্তম নৌবহরকে বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী করার মতো সময় লাভের উদ্দেশ্যে ভারতীয় সৈন্য ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার শর্ত ছাড়াই ‘যে যেখানে আছে সে ভিত্তিতে’ নিশ্চল যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার ব্যাপারে ভারতকে সম্মত করানোর জন্য ব্রেজনেভের ওপর চাপের মাত্রা বাড়ানো হয়। তাকে জানানো হয়, ভারত যদি এর পরও সম্মত না হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে ও সপ্তম নৌবাহিনী প্রেরণসহ শক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

তথ্যসূত্র: মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও মূলধারা ৭১

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন
ট্যাগ »

সর্বশেষ..