আজকের পত্রিকা মত-বিশ্লেষণ

ত্রাণ কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি

ফজলুল কবির
এক. করোনা ভাইরাসের প্রকোপে যখন ঊর্ধ্বগতি, ঠিক তখন অর্থনীতির চাকা সচল করার নামে পোশাক কারখানাগুলো খুলে দেয়ার সিদ্ধান্তে দেশের মানুষ খুব হতাশ হয়। এর মধ্যেই আবার রাষ্ট্রে ঊর্ধ্বতন মহলের পক্ষ থেকে বিগত ১০ মে থেকে শপিং মল এবং মার্কেটগুলোও খুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত আসে। এতে মানুষের মাঝে হতাশার সাথে আতঙ্ক যোগ হয়। কিন্তু সে আতঙ্ক প্রশমিত করে বসুন্ধরা শপিং মল ও যমুনা ফিউচার পার্ক কর্তৃপক্ষ। তারা সর্বপ্রথমে ঘোষণা দেয় যে, বর্তমান দুর্যোগময় পরিস্থিতিতে তাদের শপিং মলসমূহ বন্ধ রাখবেন। এর পর ঢাকা এবং চট্টগ্রামসহ দেশের প্রায় সব শপিং মল ও মার্কেট বন্ধ রাখার ঘোষণা আসতে থাকায় জনমনে স্বস্তি দেখা দিলেও এ সকল শপিং মল ও মার্কেটের দোকান সমূহে কর্মরত কর্মচারীরা বেতন ও বোনাস পাবেন কিনা সে নিশ্চয়তা এখনো পাওয়া যায়নি। সাধারাণত পুরো রমজান মাস কাজ করে দোকানের কর্মচারীরা বেতনের পাশাপাশি একমাসের বেতনের সমপরিমাণ বোনাস পেয়ে থাকেন। চটগ্রাম মহানগরীতে ছোট বড় ৩ শতাধিক শপিং মল বা মার্কেটে প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ হাজার শ্রমিক-কর্মচারী কর্মরত আছেন বলে জানা গেছে। আবার অনেকে শুধু রমজান মাসে পার্ট টাইম ভিত্তিতে কাজ করে থাকেন। এর সাথে স্বনিয়োজিত শ্রমিক বা হকারতো আছেই। যার সংখ্যাও ৫০ হাজারের কম নয়। সব মিলিয়ে শুধু চট্টগ্রাম মহানগরীতেই প্রায় লক্ষাধিক শ্রমিক কর্মচারী আছে, যারা রমজান মাসে একটু ভাল আয়-রোজগারের আশায় সারা বছর অপেক্ষা করতে থাকেন।

দুই.
চট্টগ্রাম জেলা ও মহানগর ডেকোরেশন ও কমিউনিটি সেন্টার শ্রমিক ইউনিয়নের সহসভাপতি আব্দুর রহমানের তথ্য মতে, এ খাতে চট্টগ্রামে প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার শ্রমিক কর্মরত। তাদেও কোন স্থায়ী কাজ নেই। নির্দিষ্ট কোন মালিকের অধীনেও তারা চাকরি কওে না। কাজ থাকলে মজুরি পায়, আর কাজ না থাকলে পায় না। সাধারণত, কমিউনিটি সেন্টার শ্রমিকেরা মজুরি পায় দৈনিক ৩০০ টাকা। আর ডেকোরেটার্স শ্রমিকেরা মজুরি পায় দৈনিক ৩৫০ টাকা। মাসে সর্বোচ্চ ১৫ দিন কাজ থাকে। সে হিসাবে মাসে সাকুল্যে ৪ থেকে থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত তারা মজুরি পায়। এ দুর্মূল্যের বাজারে এতো অল্প আয় দিয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে জীবন যাপন করা খুবই দুঃসাধ্য ব্যাপার। তাই অভাব তাদের নিত্য সঙ্গী। এভাবে সারাবছর আর্থিক টানাপোড়নে থাকার পর তারা যদি পুরো রমজান মাস কর্মহীন তথা আয়শূন্য থাকে। তবে রমজান মাসের পূর্ববর্তী মাসে তাদের আয় রোজগার অন্যান্য মাসের তুলনায় ভাল হয়। তা দিয়েই তারা রমজান মাস কোন রকমে অতিবাহিত করে। কিন্তু এবার করোনার কারণে এ খাতের শ্রমিকরা তাদের আয়ের মৌসুমেও আয় শূন্য থাকার ফলে বর্তমানে অসম্ভব আর্থিক কষ্টে আছে। বেশিরভাগ শ্রমিক অনাহারে অর্ধাহারে দিনাতিপাত করছেন।

তিন.
অধিকাংশ হোটেল ও রেস্তেরাঁ শ্রমিকের বছরে দশ-এগার মাস কাজ থাকে। কিন্তু রমজান মাস আসলে তাদের অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়ে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট দেশ হওয়ায় অধিকাংশ মানুষ রোজা রাখে। ফলে দিনের বেলায় হোটেল বন্ধ রাখতে হয়। ব্যবসা মন্দা যায়- এমন অজুহাতে মুষ্টিমেয় কিছু প্রতিষ্ঠিত হোটেল ছাড়া অধিকাংশ হোটেলে পবিত্র রমজান মাসে এক থেকে দেড় মাসের জন্য শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়। ছাটাইকৃত শ্রমিকরা বোনাসও পায় না। এ সেক্টওে ছোট-বড় রেস্টুরেন্ট মিলিয়ে প্রায় ২৫ হাজার শ্রমিক কর্মরত বলে ধারণা করা হয়। সাধারণত, রমজান মাসে তারা আয়শূন্য থাকে। এমন মানসিক প্রস্তুতি থেকে তারা রমজান মাসের পূর্ববর্তী মাসে একটু বেশি আয় করার চেষ্টা করে। মূলত উক্ত মাসের বাড়তি আয়ের অংশ দিয়েই রমজান মাস কোনরকমে অতিবাহিত করার পরিকল্পনা কওে তারা। কিন্তু এবার করোনা হানা দেয়ায় তাদেও সে পরিকল্পনা নস্যাৎ হয়ে যায়। ফলে হোটেল শ্রমিকদের ঘরে ঘরে এখন হাহাকার চলছে।

চার.
গারা দেশে প্রায় ৭৮ লক্ষ পরিবহন শ্রমিক আছে। বৃহত্তর চট্টগ্রামে ২ লাখ ৫০ হাজার এবং বন্দর নগরীতে ১ লাখ ৩০ হাজার শ্রমিক আছে বলে জানিয়েছেন বৃহত্তর সড়ক পরিবহন শ্রমিক ঐক্য পরিষদের সদস্য সচিব উজ্জ্বল বিশ্বাস। সারা দেশে ২৪৯টি শ্রমিক ইউনিয়ন রয়েছে। তন্মধ্যে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ শ্রমিক ফেডারেশন সবচেয়ে বড় সংগঠন। সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরে জানা যায়, এ সংগঠনের শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে প্রায় ১০০ কোটি টাকা জমা আছে। শ্রমিকদের পরিচয় পত্র না থাকার অজুহাতে তাদেরকে কল্যাণ তহবিলে অর্ত দেয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে জানান সংঠনের নেতারা। সারা বছর আয় রোজগার থাকলেও তা জীবন ধারনের জন্য তা যথেষ্ট নয়। কিন্তু ঈদ এবং রমজান মাসে তাদের আয় রোজগার একটু বেশি হয়। তা দিয়ে এ সময়টাতে তারা অপেক্ষাকৃত ভাল থাকে। এবার করোনা হানা দেয়ায় ভাল থাকাতো দূরের কথা, স্বাভাবিক জীবন যাপনই অনেকের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে। তাদের এমন দুর্দিনে শ্রমিক সংগঠন ও নেতাদেও কোন সহযোগিতা পাচ্ছে না বলে অধিকাংশ পরিবহণ শ্রমিক অভিযোগ করেছেন।

পাঁচ.
চট্টগ্রামে ছোট-বড় প্রায় ৪ হাজার ফার্নিচার কারখানা ও শোরুম রয়েছে। এ সব কারখানা বা শোরুমে প্রায় ৩ লক্ষাধিক শ্রমিক কর্মরত। শোরুমে কর্মরত শ্রমিকরা মাসভিত্তিক চাকরি করলেও কারখানায় কর্মরত অধিকাংশ শ্রমিক দৈনিক ভিত্তিতে কাজ করেন। ফলে এ খাতে কর্মরত প্রায় দুই থেকে আড়াই লাখ শ্রমিক অত্যন্ত সংকটাপন্ন অবস্থার মধ্যে আছে।

প্রাতিষ্ঠানিক অপ্রাতিষ্ঠানিক মিলে সারা দেশে শ্রমিক সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৬ কোটি। তন্মধ্যে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে প্রায় সাড়ে ৫ কোটি শ্রমিক কর্মরত। করোনার প্রবল আঘাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত আজ দেশের শ্রমিক শ্রেণী। এর মধ্যে ওপরে বর্ণিত পাঁচ খাতে শ্রমিকসহ দর্জি শ্রমিক, গৃহকর্মী, সেলুন কর্মচারী, রিক্সাচালক, সিএনজি অটোরিকশা চালক, ভ্যানচালক, দিন মজুর, ক্ষেত মজুর, প্রান্তিক কৃষক; যারা মূলত অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিক- তাদের অবস্থা খুবই নাজুক। এ সব শ্রমিকরা দিন আনে দিন খায়। আয় রোজগার বন্ধ থাকলে কোন রকমে ধার দেনা করে ১০- ১৫ দিন পর্যন্ত চলতে পারে। কিন্তু এর পরে অনেকের পক্ষে এক বেলা অন্ন সংস্থান করা কষ্টকর হয়ে পড়ে।

অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের সব শ্রমিক বিগত ২৬ মার্চ থেকে কর্মহীন; তথা আয়-রোজগারহীন এক মানবেতর জীবনযাপন করছে। ফলে তাদের মধ্যে পুঞ্জীভূত হতাশা ক্রমশ ক্ষোভে পরিণত হচ্ছে। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এ হতাশা বা ক্ষোভ প্রশমনে দ্রুত উদ্যোগ নেয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অংশ হিসেবে চলতি আর্থবছরের বাজেটে ৭৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ আছে। বর্তমান দুর্যোগময় পরিস্থিতিকালীন সরকার ২০ লাখ পরিবারকে মাসিক ২ হাজার টাকা করে নগদ সহায়তা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এ ছাড়া সরকার ৫০ লাখ পরিবারকে এককালীন আড়াই হাজার টাকা কওে দেয়ার পাশাপাশি ১ কোটি পরিবারকে রেশন কার্ড প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব মোতাবেক দরিদ্র লোকের সংখ্যা ৩ কোটি ৪০ লাখ। যে কোন দুর্যোগ বা মহামারীর সময় তা ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। সে হিসাবে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ৪ কোটির কিছু বেশি হবে।

রাষ্ট্রের সকল ত্রাণ কার্যক্রম যেন প্রকৃত হতদরিদ্র জনগোষ্ঠী তথা ৪ কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে, সে জন্য পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ নেয়ার পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা খুব জরুরি।

লেখক: সংগঠক, টিইউসি, কেন্দ্রীয় কমিটি

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..