দিনের খবর প্রচ্ছদ শেষ পাতা

ত্রুটিপূর্ণ পরিকল্পনা আর ব্যয় বৃদ্ধির চক্রে বিআরটি প্রকল্প

গাজীপুর-বিমানবন্দর সড়ক

ইসমাইল আলী: ঢাকার প্রবেশমুখে যানজট কমাতে গাজীপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত সাড়ে ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) চালু করা হবে। এজন্য ২০১২ সালের ডিসেম্বরে গ্রেটার ঢাকা সাসটেইনেবল আরবান ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্ট (বিআরটি, গাজীপুর-বিমানবন্দর) অনুমোদন করে সরকার। তবে আট বছরে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৩৪ দশমিক ৪৫ শতাংশ।

তথ্যমতে, প্রকল্পটির পরিকল্পনায় এক দফা সংশোধন আনা হয়েছে। এর পরও প্রকল্পটির ডিজাইন ও স্পেসিফিকেশন নিয়ে নতুন জটিলতা দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলোÑএলিভেটেড অংশের ডিজাইন। এ অংশে অত্যাধিক যান চলাচলের কারণে বক্স গ্রিডার নির্মাণ সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এজন্য বক্স গ্রিডারের পরিবর্তে আই গ্রিডার করতে হচ্ছে এলিভেটেড সাড়ে চার কিলোমিটার অংশ।

পাশাপাশি শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিমানবন্দর রেলস্টেশন পর্যন্ত যাত্রী পারাপারে আন্ডারপাস নির্মাণ নতুন করে প্রকল্পটিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এছাড়া প্রকল্পের আওতায় নির্মাণাধীন টঙ্গী-জয়দেবপুর সড়কের কারিগরি ডিজাইন পরিবর্তন করতে হবে। এতে প্রকল্পটির ব্যয় বেড়ে যাবে। তবে এর আগেও প্রকল্পের ত্রুটি সংশোধনের যুক্তিতে ব্যয় বেড়েছিল দুই হাজার ২২৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকা।

সম্প্রতি বিআরটি প্রকল্পের স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে জানানো হয়, বিআরটি প্রকল্পের বর্তমান ব্যয় বর্তমানে চার হাজার ২৬৮ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে গত জুন পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে মাত্র এক হাজার ১৮৯ কোটি ৯৮ লাখ টাকা বা ২৯ দশমিক ৪৩ শতাংশ অর্থ। তবে প্রকল্পটির ঋণচুক্তির মেয়াদ আগামী ৩১ ডিসেম্বর শেষ হয়ে যাবে। তাই এ চুক্তির মেয়াদ বাড়াতে হবে।

বৈঠকের তথ্যমতে, প্রকল্পটির সাড়ে চার কিলোমিটার ছয় লেনবিশিষ্ট এলিভেটেড অংশ রয়েছে। পাশাপাশি আরও সাড়ে চার কিলোমিটার অ্যাট গ্রেড (মাটিতে) সড়ক, ১০ লেনবিশিষ্ট টঙ্গী সেতু ও ছয়টি বিআরটি স্টেশন নির্মাণ করছে সেতু বিভাগ। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এলিভেটেড অংশের ডিজাইন করেছে ২০১৫ সালে। আর ঠিকাদার নিয়োগ করা হয় ২০১৭ সালের ১৯ অক্টোবর।

সাড়ে চার কিলোমিটার এলিভেটেড অংশে আটটি র‌্যাম্প ও ১৬৩টি স্প্যান রয়েছে। এর মধ্যে ৭৮টি স্প্যান আই গ্রিডার ও ৮৫টি বক্স গ্রিডার। টঙ্গী থেকে গাজীপুর পর্যন্ত সড়কটি অত্যন্ত ব্যস্ত করিডোর। প্রায় ২১টি জেলার সঙ্গে এই করিডোর যুক্ত। ২০১৪ সালের সার্ভে ডেটার ভিত্তিতে প্রতিদিন এ রুটে উভয় দিকে ৩৬ হাজার থেকে ৪৪ হাজার যানবাহন চলাচল করত। বর্তমানে এ রুটে ৬০ হাজার গাড়ি চলাচল করে। এমন ব্যস্ত একটি সড়কে যান চলাচল অব্যাহত রেখে বক্স গ্রিডার স্থাপন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে অভিহিত করে শুরু থেকে চিঠি দেয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এর পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি ঠিকাদার বক্স গার্ডারের পরিবর্তে আই গার্ডারের মাধ্যমে ওই অংশ নির্মাণের প্রস্তাব জমা দেয়। এতে ৪১ কোটি টাকা ব্যয় সাশ্রয় হবে বলেও জানানো হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১ সেপ্টেম্বর বক্স গ্রিডার এলিভেটেড অংশটি আই গ্রিডার নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হয়।

এদিকে প্রাথমিকভাবে প্রকল্পটির মেয়াদ ছিল ২০১৬ সালের নভেম্বর। পরে তা কয়েক দফা বৃদ্ধি করা হয়। এতে গত জুনে প্রকল্পটির কাজ শেষ করার কথা ছিল। তবে এখনও প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কাজ বাকি থাকায় সম্প্রতি এ মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়িয়ে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে।

বৈঠকে আরও জানানো হয়, প্রকল্প এলাকায় হাজী ক্যাম্পের সম্মুখ ভাগ, বিমানবন্দর রেলস্টেশন, বিআরটি স্টেশন, এমআরটি (মেট্রোরেল)-১ স্টেশন ও বিমানবন্দর টার্মিনাল ১ ও ২-এর মধ্যে সংযোগ স্থাপনে একটি আন্ডারপাস নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর দৈর্ঘ্য হবে ৬২০ মিটার, ট্রাভেলেটর অংশ ২৫০ মিটার, প্রস্থ ছয় দশমিক ৪০ মিটার ও উচ্চতা চার দশমিক ৩০ মিটার। এটি নির্মাণে নতুন অঙ্গ সৃষ্টিপূর্বক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এটি নির্মাণে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৪২০ কেটি ৮৯ লাখ টাকা।

আন্ডারপাসটির দৈর্ঘ্যরে মধ্যে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের অংশ ৭০ মিটার, রেলওয়ের অংশ ১০০ মিটার ও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের অংশ ৪৫০ মিটার। এজন্য গত বছর ২০ ফেব্রুয়ারি দুটি আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। তবে রেলপথ মন্ত্রণালয় এখনও আন্ডারপাসটি নির্মাণে অনাপত্তি দেয়নি। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের অনাপত্তি পাওয়া গেলেও জমিটি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়া। আর ওই প্রতিষ্ঠানের অনুমতি এখনও পাওয়া যায়নি।

এদিকে বিআরটি প্রকল্পের টঙ্গী থেকে জয়দেবপুর পর্যন্ত বিদ্যমান সড়কাংশটি অপর্যাপ্ত ড্রেইনেজ ব্যবস্থার কারণে বিভিন্ন সময়ে জলাবদ্ধতায় নিমজ্জিত হয়। ফলে সড়কের বিটুমিনাস বাইন্ডার/ওয়্যারিং কোর্সসহ পেভমেন্ট ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়া অতিরিক্ত ট্রাফিক চলাচলের দরুণ সড়কটি ব্যাপকমাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই বিদ্যমান সড়কের পেভমেন্ট যৌথভাবে অনুসন্ধানকালে দেখা যায়. সড়কের অধিকাংশ স্থানে বেইস টাইপ-১ মেটেরিয়্যালস নেই এবং অপর্যাপ্ত সাব-বেইস মেটেরিয়্যালস বিদ্যমান। এছাড়া সড়কটিতে হেভি ভিহিকেল ও ট্রাফিক ভলিউম ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

এ অবস্থায় সওজের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে সড়কটির নকশা সংশোধনের উদ্যোগ নেয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। এতে ত্রুটিপূর্ণ বিটুমিনাস বাইন্ডার/ওয়্যারিং অপসারণ করে অবশিষ্ট পেভমেন্টের ওপর ৪০০ মিলিমিটার বেইস টাইপ-১ লেয়ার দেওয়া এবং এর ওপর ১৮০ মিলিমিটার বাইন্ডার কোর্স ও রাটিং প্রতিরোধে ৬০ মিলিমিটার পিজি৬৭ গ্রেডের বিশেষ বিটুমিনাস ওয়্যারিং কোর্স দিতে হবে। আর ফ্লাইওভার অংশে ক্রংক্রিট পেভমেন্ট নির্মাণের সুপারিশ করে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। এতে সড়কটি নির্মাণ ব্যয় ১৬৫ কোটি টাকা বেড়ে যাবে। এজন্য চুক্তির ভেরিয়েশন অনুমোদন ও প্রকল্পটির ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা) সংশোধন করতে হবে।

এ বিষয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব মো. নজরুল ইসলাম বলেন, বিআরটি প্রকল্পে বেশকিছু বিষয়ে সংশোধন আনা হয়েছে। স্টিয়ারিং কমিটির সভায় এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্পটি সংশোধনের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, গাজীপুর-বিমানবন্দর বিআরটি নির্মাণে প্রাথমিকভাবে ব্যয় ধরা হয়েছিল দুই হাজার ৩৯ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। পরে তা বেড়ে হয়েছে চার হাজার ২৬৮ কোটি ৩২ লাখ টাকা। তবে ডিজাইন সংশোধনের কারণে এ ব্যয় পাঁচ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..