দিনের খবর প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

ত্রুটিপূর্ণ প্রস্তাব ও প্রকৌশলগত ব্যর্থতায় ঝুলে যায় প্রকল্প

নির্ধারিত সময়ে কোনো উন্নয়ন প্রকল্পই শেষ করতে পারে না রাষ্ট্রায়ত্ত বিভিন্ন সংস্থা। এক বা একাধিকবার মেয়াদ বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রকল্প ব্যয় বাড়ে এতে। সম্প্রতি এ নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। ভবিষ্যতে কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি করা হবে না বলে তিনি নির্দেশনাও দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন বিলম্বের কারণ অনুসন্ধান করে শেয়ার বিজ। এ নিয়ে ধারাবাহিক আয়োজনের আজ ছাপা হচ্ছে দ্বিতীয় পর্ব

ইসমাইল আলী: চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে কক্সবাজার হয়ে মিয়ানমার সীমান্ত গুনদুম পর্যন্ত প্রায় ১২৮ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প নেয়া হয় ২০১০ সালের ৬ জুলাই। সে সময় এর ব্যয় ধরা হয়েছিল এক হাজার ৮৫২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। ২০১১ সালের ৩ এপ্রিল প্রকল্পটির ভিত্তিপ্রস্তরও স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

তবে রেলপথটির নকশা প্রণয়ন করতে গিয়ে প্রকল্প প্রস্তাবনায় ত্রুটি ধরা পড়ে। এতে দেখা যায়, রেলপথটির অ্যালাইনমেন্ট রয়েছে সংরক্ষিত বনাঞ্চল, হাতি চলাচলের পথ, সেনানিবাস। এসব রেলপথটির রুট কিছুটা পরিবর্তন করতে হয়। আবার মিটারগেজের পরিবর্তে ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হয়। এতে রেলপথটি নির্মাণ ব্যয় প্রায় ৯ গুণ বেড়ে দাঁড়ায় ১৮ হাজার ৩৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা।

২০১৬ সালে দোহাজারী-কক্সবাজার-গুনদুম রেলপথ নির্মাণের সংশোধিত প্রস্তাব অনুমোদন করে সরকার। তবে জমি অধিগ্রহণ ধীরগতির কারণে এখনও ঝুলে আছে প্রকল্পটি। ফলে তিন বছরের মধ্যে রেলপথটি নির্মাণের কথা থাকলেও ১০ বছরে অগ্রগতি হয়েছে ৫০ শতাংশেরও কম। ত্রুটিপূর্ণ প্রকল্প প্রস্তাব ও জমি অধিগ্রহণ বিলম্ব শুধু দোহাজারী-কক্সবাজার-গুনদুম রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের সমস্যাই নয়, অবকাঠামো খাতের বিভিন্ন প্রকল্পেই এ ধরনের সমস্যা দেখা দিয়েছে। এতে বছরের পর বছর ঝুলে আছে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প।

যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকল্প প্রস্তাবে কোনো ধরনের ত্রুটি-বিচ্যুতি আছে কি না, তা যাচাই-বাছাইয়ের সক্ষমতা নেই পরিকল্পনা কমিশনের। ফলে কোনো আপত্তি ছাড়াই এ ধরনের প্রকল্প অনুমোদন পেয়ে যাচ্ছে। ফলে এ ধরনের কারণে প্রকল্প বিলম্বিত হলে তার দায় পরিকল্পনা কমিশনেরও রয়েছে বলে মনে করেন তারা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ত্রুটিপূর্ণ প্রস্তাবনা ও প্রকৌশলগত ব্যর্থতার অন্যতম উদাহরণ ঢাকা-টঙ্গী রেলপথ তৃতীয় ও চতুর্থ লাইন এবং টঙ্গী-জয়দেবপুর ডাবল লাইন নির্মাণ প্রকল্পটি। কারণ ২০১২ সালের নভেম্বরে অনুমোদনের সময় এর কোনো ত্রুটি ধরা পড়েনি। তবে নকশা প্রণয়নসহ রেলপথটি নির্মাণে দরপত্র আহ্বানের পর দেখা যায় ডিপিপিতে ডিজেইল ডিজাইন ও দরপত্র মূল্যায়ন-সংশ্লিষ্ট কাজের জন্য পরামর্শক সেবা অন্তর্ভুক্ত নেই। ফলে ওই দরপত্র বাতিল করা হয়। পাশাপাশি প্রকল্পটি সংশোধন করা হয়।

এদিকে প্রাথমিকভাবে প্রকল্পটির আওতায় ৯০ পাউন্ডের রেল ব্যবহারের পরিকল্পনা ছিল। পরে তা সংশোধন করে ৫২ কেজির রেল ব্যবহারের সিদ্ধান্ত হয়। আবার ঠিকাদার নিয়োগের কাজ শুরু হলে টঙ্গী নদীর ওপর নির্মাণাধীন সেতুর উচ্চতা নিয়ে আপত্তি জানায় বিআইডব্লিউটিএ। ফলে সেতুটির উচ্চতা বাড়াতে গিয়ে পাইলের সংখ্যা ১১০ থেকে বেড়ে ২৬১টি হয়ে গেছে। এতে ব্যয়ও বেড়ে গেছে অনেক।

এর বাইরে প্রকল্পটির জন্য প্রয়োজনীয় জমি এখনও হস্তান্তর করেনি বেবিচক। এছাড়া মহাখালী ডিওএইচএস থেকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট স্টেশন অভিমুখে ৩টি স্থানে ন্যূনতম ভূমির স্বল্পতা রয়েছে। এজন্য আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি করা হয়েছে। আবার ঢাকা এক্সপ্রেসওয়ের পাইলিং সম্পন্ন না হলে বনানী থেকে কমলাপুর পর্যন্ত অংশের রেললাইন নির্মাণকাজ এগিয়েও নেয়া যাচ্ছে না।

আবার খিলগাঁও-মালিবাগ সেকশনে বিদ্যমান রেলক্রসিং স্থানান্তর করতে হবে। তবে এর দক্ষিণ পাশে রেলপথের সমান্তরালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের রাস্তা স্থানান্তর করতে হবে। আবার টঙ্গী-ধীরাশ্রম-জয়দেবপুর সেকশনে বনমালা লেভেল ক্রসিং থেকে জয়দেবপুর স্টেশন পর্যন্ত গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নির্মিত সড়ক স্থানান্তর করতে হবে। এছাড়া এসব কারণে আট বছরে কাজ হয়েছে মাত্র ৪০ শতাংশ। যদিও তিন বছরে এ রেলপথ নির্মাণের কথা ছিল। বাস্তবায়ন বিলম্বের পাশাপাশি ঢাকা-টঙ্গী রেলপথ তৃতীয় ও চতুর্থ লাইন এবং টঙ্গী-জয়দেবপুর ডাবল লাইন নির্মাণে ব্যয়ও বেড়ে গেছে। ২০১২ সালে এ ব্যয় ধরা হয়েছিল ৮৪৮ কোটি ৬০ লাখ টাকা। তবে বর্তমান হিসাবে তা দুই হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এ ব্যয় আরও বাড়বে বলেই জানান-সংশ্লিষ্টরা।

রেলের ত্রুটিপূর্ণ প্রকল্প প্রস্তাবের আরেকটি উদাহরণ চিলাহাটি-হলদিবাড়ি রেলপথ পুনরায় চালুকরণ প্রকল্প। এর আওতায় ৮০ কোটি ১৭ লাখ টাকা ব্যয়ে চিলাহাটি রেলস্টেশন থেকে সীমান্ত পর্যন্ত ৯ দশমিক ৩৬ কিলোমিটার ব্রডগেজ রেলপথ নির্মাণ করা হয়েছে। গত ১৭ ডিসেম্বর এ রেলপথ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনও করা হয়েছে। তবে নির্মাণ শেষে এ প্রকল্পে ত্রুটি ধরা পড়ে।

এতে দেখা যায়, চিলাহাটি-হলদিবাড়ি রুটে ভারত থেকে যেসব পণ্যবাহী ট্রেন আসবে ৫০ গাড়ি পর্যন্ত হতে পারে। তবে বিদ্যমান রেলপথের পাশে নির্মিত লুপ লাইনে এজন্য প্রয়োজনীয় জায়গা নেই। তাই নতুন আরেকটি লুপ লাইন নির্মাণ করতে হবে বেশি জায়গা নিয়ে। আর এ লুপ লাইনের জন্য জমি অধিগ্রহণ করতে হবে। এদিকে প্রাথমিকভাবে এ রুটে শুধু কাস্টম ও ইমিগ্রেশনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। কিন্তু কোনো স্টেশন বিল্ডিং নেই। ফলে ব্যাংকিং সুবিধাসহ অন্যান্য ব্যবস্থা রাখা যায়নি। এছাড়া এর একদিকে প্ল্যাটফর্ম রয়েছে। এতে দুই দিক থেকে আপ ও ডাউন দুটি যাত্রীবাহী ট্রেন এলে একটি ট্রেন থেকে নামার কোনো ব্যবস্থা নেই। সব মিলিয়ে প্রকল্পটি সংশোধন করতে হচ্ছে।

শুধু রেলেই নয়, প্রকৌশলগত ব্যর্থতা রয়েছে অন্যান্য খাতের প্রকল্পেও। এর মধ্যে অন্যতম রাজধানীর মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার নির্মাণ প্রকল্পটি। কারণ এ ফ্লাইওভারের পুরো নকশাতেই ত্রুটি রয়েছে। এছাড়া ভূমিকম্প প্রতিরোধ ব্যবস্থা ছিল না। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ফ্লাইওভারটির নকশা পর্যালোচনা করতে গেলে এ ত্রুটি সামনে আসে। পরে বুয়েটের পরামর্শে ফ্লাইওভারটি নির্মাণে পট ব্যায়ারিং ও শক ট্রান্সমিশন ইউনিট সংযোজন করা হয়।

জানতে চাইলে বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. শামছুল হক শেয়ার বিজকে বলেন, একটি প্রকল্প প্রস্তাবনা যাচাই-বাছাইয়ের দায়িত্ব পরিকল্পনা কমিশনের। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি বাংলাদেশের পরিকল্পনা কমিশনে কোনো দক্ষ বা কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিদের নিয়োগ দেয়া হয় না। বরং এ সংস্থাটি অনেকটা অদক্ষ ও নন-টেকনিক্যাল জনবল দিয়ে পরিচালিত। ফলে কোনো প্রকল্প প্রস্তাবনায় ভুল বা প্রকৌশলগত ত্রুটি আছে কিনা তা ধরা পড়ে না। এতে কোনো বাধা ছাড়াই এসব প্রকল্প অনুমোদন হয়ে যায়। পরে বাস্তবায়ন করতে গেলে বিভিন্ন প্রকল্পে ত্রুটি সামনে আসে। ফলে এসব ত্রুটি সংশোধন করতে গিয়ে প্রকল্পের বাস্তবায়ন বিলম্বিত হয়।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..