দিনের খবর প্রথম পাতা

দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাই রোটেমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ

রেলওয়েকে নিম্নমানের ১০টি ইঞ্জিন সরবরাহ

ইসমাইল আলী: এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ঋণে ১০টি মিটারগেজ ইঞ্জিন কিনেছে রেলওয়ে। গত বছর আগস্টে ইঞ্জিনগুলো সরবরাহ করে কোরিয়ার হুন্দাই রোটেম কোম্পানি। তবে ইঞ্জিনগুলোয় দরপত্রের শর্তানুসারে বিভিন্ন যন্ত্রাংশ সংযোজন করা হয়নি। নিম্নমানের যন্ত্রাংশ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে এসব ইঞ্জিন।

এদিকে ইঞ্জিন পর্যবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা প্রি-শিপমেন্ট এজেন্ট সিঙ্গাপুরের সিসিআইসি’ও তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেনি। তাই নিম্নমানের ইঞ্জিন সরবরাহের দায় হুন্দাই রোটেম ও সিসিআইসির। এজন্য প্রতিষ্ঠান দুটির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটি।

হুন্দাই রোটেম ও সিসিআইসির পক্ষ নিয়ে নিম্নমানের ইঞ্জিন গ্রহণের সুপারিশ করলেও রেলের সাবেক মহাপরিচালক মো. শামসুজ্জামান ও বর্তমান অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) মো. মঞ্জুর-উল-আলম চৌধুরীর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আনেনি তদন্ত কমিটি। অথচ নিম্নমানের ইঞ্জিন নিয়ে আপত্তি তোলা ও ঠিকাদারের বিল আটকে রেখে শক্ত পদক্ষেপ গ্রহণের পরও প্রকল্প পরিচালক নূর আহম্মদ হোসেনের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার ভুয়া অভিযোগ আনা হয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনে।

প্রসঙ্গত, গত ৯ ডিসেম্বর ‘রেলওয়ের ১০ ইঞ্জিন কেনায় অনিয়ম: নি¤œমানের ইঞ্জিন সরবরাহ কোরিয়ার হুন্দাই রোটেম’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। পরে ১৮ জানুয়ারি ‘রেলের নিম্নমানের ১০ ইঞ্জিন কেনা: প্রশ্নবিদ্ধ তদন্ত কমিটি, হুন্দাই রোটেমের অসহযোগিতা’ শীর্ষক আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদন দুটিতে নিম্নমানের ইঞ্জিন সরবরাহ ও তদন্ত কমিটির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।

এদিকে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি ইঞ্জিনগুলো কেনায় অনিয়মের বিষয়ে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে তদন্ত কমিটি। তবে এক সপ্তাহের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তা গোপন করে রেখেছে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। এমনকি তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর গত ৩ মার্চ রেলভবনে পর্যালোচনা বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও সেখানে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়নি।

যদিও তদন্ত প্রতিবেদনটি সম্প্রতি শেয়ার বিজের হাতে এসেছে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, রেলের ১০টি ইঞ্জিন কেনার দরপত্রে চারটি কোম্পানি অংশ নেয়। তাদের মধ্যে হুন্দাই রোটেম কারিগরিভাবে রেসপনসিভ করে মূল্যায়ন কমিটি। পরে তাদের আর্থিক প্রস্তাব মূল্যায়ন করা হয়। এডিবির অনুমোদনসাপেক্ষে ২০১৮ সালের ১৭ মে হুন্দাইয়ের সঙ্গে চুক্তি সই করা হয়। এছাড়া চুক্তি অনুযায়ী ইঞ্জিন সরবরাহ করা হচ্ছে কি না, তা পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সিঙ্গাপুরের সিসিআইসিকে নিয়োগ করা হয়। চুক্তির শর্তানুসারে ইঞ্জিনগুলো সরবরাহ করা হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে প্রাক-জাহাজীকরণ পরিদর্শন প্রতিবেদন (পিএসআই) প্রদান করার কথা ছিল সিসিআইসির।

১২ আগস্ট সিসিআইসি যে প্রতিবেদন দাখিল করে তাতে বলা হয়, ইঞ্জিনগুলো বাংলাদেশে আসার পর কমিশনিং পিরিয়ডে টেস্টিং ও ট্রায়াল রান সন্তোষজক হতে হবে বলে শর্ত দেয়া হয়। আবার একই তারিখে সিসিআইসি শর্তবিহীন আরেকটি পিএসআই সার্টিফিকেট দাখিল করে। একই দিনে দুই ধরনের পিএসআই প্রতিবেদন দেয়ায় ইঞ্জিন গ্রহণে আপত্তি তোলেন প্রকল্প পরিচালক। তবে ইঞ্জিনগুলো চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর পর যথাসময়ে খালাস না করলে জটিলতা সৃষ্টি হবে বলে অজুহাত দেখিয়ে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে তা খালাস করে পাহাড়তলী ডিজেল ওয়ার্কশপে রাখা হয়।

এদিকে বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃক গঠিত কমিশনিং কমিটি ইঞ্জিনগুলোর টেস্টিং, ট্রায়াল রান ও কমিশনিং সম্পন্ন করে প্রতিবেদন দাখিল করে। এতে ইঞ্জিনের কারিগরি শর্ত তথা অলটারনেটর, কম্প্রেসার, ট্রাকশন মোটর এ চারটি ক্যাপিটাল কম্পোনেন্টস চুক্তি অনুযায়ী সরবরাহ করা হয়নি বলে উল্লেখ করে। ফলে ইঞ্জিনের ব্রেক হর্সপাওয়ার ২২০০বিপিএইচ ও ট্রাকশন হর্সপাওয়ার ২০০০টিএইচপি হওয়ার কথা থাকলেও পাওয়া যায় ২১৭০ ও ১৯৪২এইচপি।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, গত ২৭ জানুয়ারি ইঞ্জিনগুলোর বিষয়ে প্রকল্প পরিচালকের মতামত চায় তদন্ত কমিটি। এ সময় তিনি জানান, চুক্তির পর দক্ষিণ কোরিয়ায় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান হুন্দাই রোটেম দুই দফা ভিন্ন মডেলের অলটারনেটর সংযোজনের প্রস্তাব দিলেও তা গ্রহণ করা হয়নি। এছাড়া হুন্দাই রোটেম চুক্তি অনুযায়ী অন্যান্য ক্যাপিটাল কম্পোনেন্ট সংযোজন না করায় সরকারি বিধি-বিধান লঙ্ঘন করা হয়েছে। ফলে এসব পণ্য গ্রহণ করা তার পক্ষে সম্ভব নয় বলেও তিনি জানান।

আর গত ২০ জানুয়ারি তদন্ত কমিটির কাছে লিখিত বক্তব্য পেশ করে হুন্দাই রোটেম। এতে তারা অলটারনেটর, ট্রাকশন মোটর ও ইঞ্জিনে কিছুটা পার্থক্য আছে বলে উল্লেখ করে। এছাড়া ৭ জানুয়ারি সিসিআইসির কাছে বিস্তারিত ব্যাখ্যা চাইলে তারাও কিছুটা পার্থক্যের কথা জানায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত কমিটি ইঞ্জিনগুলো সম্পর্কে কিছু পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ পেশ করে।

এতে বলা হয়, রেলওয়েকে সরবরাহকৃত ১০ ইঞ্জিনে অলটারনেটর, ইঞ্জিন ও ট্রাকশন মোটরের মডেলের ভিন্নতা রয়েছে। হুন্দাই রোটেম চুক্তি ভঙ্গ করে এগুলো সংযোজন করেছে। তাই তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। আর প্রি-শিপমেন্ট এজেন্ট সিসিআইসি তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করেনি। তাই তাদের বিরুদ্ধেও চুক্তি অনুসারে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।

জানতে চাইলে তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ও রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. ফারুকুজ্জামান শেয়ার বিজকে বলেন, রেলওয়ের ১০ ইঞ্জিনের বিষয়ে প্রতিবেদন রেলপথ সচিবের কাছে জমা দেয়া হয়েছে। এছাড়া ২ মার্চের মিটিংয়ের সভাপতি ছিলেন রেলপথ সচিব। তাই এ বিষয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ করুন।

পরে রেলপথ সচিব মো. সেলিম রেজার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এছাড়া গত বৃহস্পতিবার তার দপ্তরে গেলেও তাকে পাওয়া যায়নি। পরে রেলপথমন্ত্রী মো. নুরুল ইসলাম সুজনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ফোনে এসব বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা যাবে না। তবে বৃহস্পতিবার তার দপ্তরে গেলে তাকেও পাওয়া যায়নি।

এদিকে প্রকল্পের কাজ যথাসময়ে সম্পাদন না হওয়া এবং চুক্তির ব্যত্যয়ের বিষয়টি প্রকল্প পরিচালক যথাসময়ে কর্তৃপক্ষকে জানাননি বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতি রেলওয়ে ও রেলপথ মন্ত্রণালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করে বলেও মন্তব্য করেছে কমিটি। ফলে ভবিষ্যতে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে রেলওয়েকে আরও সতর্ক থাকার সুপারিশ করা হয়েছে।

যদিও প্রকল্প পরিচালকের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগটি সত্য নয় বলে শেয়ার বিজের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। কারণ নি¤œমানের ইঞ্জিন সরবরাহের কারণে তা গ্রহণ না করে দক্ষিণ কোরিয়ায় ফেরত পাঠাতে চেয়েছিলেন প্রকল্প পরিচালক। এছাড়া ইঞ্জিন দেশে এলেও নি¤œমানের হওয়ায় এখনও ঠিকাদারের বিল পরিশোধ করেননি তিনি। পরে সাবেক মহাপরিচালক মো. শামসুজ্জামান ও রেলপথমন্ত্রীর অনুমতিক্রমে তা খালাস করা হয়।

এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক নূর আহম্মদ হোসেন বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন তিনি দেখেননি। তবে যদি এ কথা উল্লেখ থাকে, তাহলে তা পুরোপুরি মিথ্যা। কারণ তার একক সিদ্ধান্তের কারণে ইঞ্জিনগুলো গ্রহণ করতে পারছে না রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। এছাড়া বিষয়টি যথাসময়ে রেলওয়ের মহাপরিচালক, রেলপথমন্ত্রী ও সচিবকে অভিহিত করা হয়েছে। পরে মন্ত্রীর নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে ইঞ্জিনগুলো খালাস করে পাবর্তীপুরে রাখা হয়েছে। এছাড়া ব্যক্তিগতভাবে ঝুঁকি নিয়ে তিনি ঠিকাদারের বিল প্রদান আটকে রেখেছেন। তাই একটি মহল ষড়যন্ত্রমূলকভাবে তার বিরুদ্ধে এসব করছে।

এদিকে রেলের সাবেক মহাপরিচালক মো. শামসুজ্জামান ও বর্তমান অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. মঞ্জুর-উল-আলম চৌধুরী হুন্দাই রোটেম ও সিসিআইসির পক্ষ নিয়ে ইঞ্জিন খালাসের চেষ্টা করলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই প্রতিবেদনে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক মো. ফারুকুজ্জামান কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

যদিও নি¤œমানের এ ইঞ্জিনগুলোই চালু করতে উদ্যোগ নিয়েছে রেলওয়ে ও রেলপথ মন্ত্রণালয়। এজন্য গত ৩ মার্চ অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে কমিটি গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে। ওই কমিটি ইঞ্জিনগুলো চালু করতে কী করতে হবে, তা যাচাই-বাছাই করে দেখবে। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক সূত্র জানায়, মূলত হুন্দাই রোটেমের বিল প্রদানের ব্যবস্থা করতেই ইঞ্জিনগুলো চালু করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, হুন্দাই রোটেমের নিম্নমানের ইঞ্জিন সরবরাহের অভিযোগ তদন্ত করার জন্য গত ১৯ জানুয়ারি এ কমিটি করা হয়। কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. ফারুকুজ্জামান। তিন সদস্যবিশিষ্ট কমিটির অপর দুজন ছিলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহ. মাহবুবুর রাজ্জাক ও রেলওয়ের যুগ্ম মহাপরিচালক (মেকানিক্যাল) তাবাসসুম বিনতে ইসলাম। কমিটির বাকি দুই সদস্যও তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..