দিনের খবর সারা বাংলা

দখল দূষণে মৃতপ্রায় ডাকাতিয়া

বেলায়েত সুমন, চাঁদপুর: ভূমিদস্যুদের দখল আর দূষণে মৃতপ্রায় চাঁদপুরের ডাকাতিয়া নদী। নেই জোয়ার-ভাটা, উত্তাল ঢেউ। অবৈধ বালিমহাল আর দূষণে ক্রমে ছোট হয়ে আসছে ডাকাতিয়া। নদীকে ঘিরে চাঁদপুর থেকে লাকসাম পর্যন্ত দুই পাড় দখল করে গড়ে উঠেছে অসংখ্য অবৈধ বালিমহাল। অসাধু কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে চলছে কোটি টাকার বাণিজ্য।

চাঁদপুর শহরের গুরুত্বপূর্ণ ৫, ৩ ও ১০ নং ঘাটসহ, চৌধুরী ঘাট ও নতুনবাজার এলাকার নদীর দুই পাড়ে শত পাকা ও আধাপাকা টিনসেড ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বাড়িঘর নির্মাণ করা হয়েছে। পাড় দখলের কারণে শহরে পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এসব স্থাপনা কয়েকবার উচ্ছেদ করা হলেও দখলমুক্ত হয়নি। উচ্ছেদের কয়েকদিন পর আবারও দখল করে ভূমিদস্যু চক্র।

দখলের কারণে মেঘনার প্রবেশ মুখের চাঁদপুর পুরান ও নতুন বাজারসহ বেশিরভাগ স্থানের ডাকাতিয়া নদী সরু হয়ে গেছে। এছাড়া ফরিদগঞ্জ, হাজীগঞ্জ ও শাহরাস্তি উপজেলায় নদীর দুই পাশে গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি অবৈধ বালিমহাল। এসব মহালের বালি দিয়ে ভরাট হয়ে যাচ্ছে ডাকাতিয়া। এতে নাব্যতা হারাচ্ছে নদী। স্বাভাবিক পানি প্রবাহ আটকে যাওয়ায় ফসল উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে।

হাজীগঞ্জ উপজেলার বলাখাল, হাজীগঞ্জ, আলীগঞ্জ, শাহরাস্তি, জগন্নাথপুরসহ বিভিন্ন স্থানের নদীর পাড়ে অবৈধ বালি ব্যবসার কারণে ভরাট হয়ে যাচ্ছে এককালের প্রমত্তা ডাকাতিয়া। বালি ব্যবসায়ীরা বালি ফেলে নদীর নাব্যতা কমিয়ে আনছে। এক সময় ওইসব বালি ব্যবসায়ীরা এ জমি নিজেদের বলে বিক্রিও করেছেন।

প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবহেলায় নদীর বেশিরভাগ জায়গা বেদখল করে রেখেছে ভূমিদস্যুরা। হাজীগঞ্জ বাজারের মুরগির ব্যবসায়ীদের ড্রেসিংয়ের ময়লা আবর্জনা, বাসাবাড়ির পয়ঃনিষ্কাষণের বর্জ্য ও পৌর কসাইখানার বর্জ্যও সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছে। এতে নদীর পাশাপাশি দূষিত হচ্ছে পরিবেশ। এছাড়া পানি প্রবাহে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়ে বিষাক্ত পানিতে নানা প্রজাতির মাছ মরে ভেসে উঠছে।

এক সময়ে নদীর দুই পাশে ছিল জেলেপল্লি। এ নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করত বহু জেলে পরিবার। বর্ষাকালে এ নদীতে আইড়, বোয়াল, বাইলা, পুঁটি ও চিংড়ি মাছ পাওয়া যেত। সেই দিন অতীত। নদীতে নেই মাছ। তাই ভিন্ন পেশা বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন জেলেদের অনেকে। অনেক কর্মহীন, দিন কাটছে অনাহারে অর্ধাহারে। হাজীগঞ্জের কয়েক জেলের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ডাকাতিয়ায় আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না। নদীও ছোট হয়ে গেছে। শীতকালে পানি নষ্ট হয়ে যায়। তাই তারা মাছ ধরা ছেড়ে দিয়েছেন।

নদী রক্ষায় বিভিন্ন সময় জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্টরা নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত কার্যত কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। তবে চাঁদপুর-৫ (হাজীগঞ্জ-শাহরাস্তি) নির্বাচনী এলাকার সংসদ সদস্যদের উদ্যোগে হাজীগঞ্জ ও শাহরাস্তির প্রায় ৪০ নটিক্যাল মাইল ড্রেজিং কার্যক্রম সম্পন্ন হলেও ডাকাতিয়া এখনও দখল দূষণের কবলে।

ডাকাতিয়া বাংলাদেশ-ভারত আন্তঃসীমান্ত নদী। এটি দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কুমিল্লা ও চাঁদপুর দিয়ে বয়ে গেছে। এর দৈর্ঘ্য ১৪১ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ৬৭ মিটার। এটি মেঘনার একটি উপনদী। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পাহাড় থেকে উৎপন্ন হয়ে কুমিল্লার বাগমারা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে এবং পরবর্তী সময়ে চাঁদপুর ও লক্ষ্মীপুরের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এরপর কুমিল্লা-লাকসাম ও চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ অতিক্রম করে চাঁদপুরে গিয়ে মেঘনায় মিলিত হয়েছে। বর্ষাকালে ভারত থেকে পানি ও বছরের অন্য সময় মেঘনার জোয়ারের পানি প্রবেশ করে। এক সময় নদীটি লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার কাছে মেঘনায় মিলিত হতো। বর্তমানে ডাকাতিয়া বিভক্ত দুই ধারায় মূল ধারাটি রায়পুরের মেঘনায় মিশেছে। অন্যদিকে তুলনামূলক বড় ধারাটি পড়েছে চাঁদপুরের মেঘনায়।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..