Print Date & Time : 26 September 2020 Saturday 6:56 pm

‘দাও ফিরিয়ে সে অরণ্য লও এ নগর’

প্রকাশ: September 6, 2019 সময়- 10:05 pm

ওসমান গনি শুভ: নগরসভ্যতার এই যুগে দিন দিন বাড়ছে কর্মজীবী মানুষের সংখ্যা। গ্রাম ছেড়ে মানুষ পাড়ি দিচ্ছে নগরের পানে। মানুষ ও সভ্যতার প্রয়োজনে এবং পৃথিবীর ভৌগোলিক পরিবর্তনের জন্য নতুন নতুন শহর গড়ে উঠছে। বনভূমি কেটেই এসব নগর তৈরি করছে মানুষ। ফলে বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের পরিমাণ দিন দিন কমে যাচ্ছে। শহরের কলকারখানার কালো ধোঁয়ার কারণে বাড়ছে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ। মানুষ প্রতিনিয়ত বিভিন্ন রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে কালো ধোঁয়া শরীরের ভেতরে যাওয়ায় বাড়ছে শ্বাসকষ্টে ভোগা রোগীর সংখ্যা। শহরের হাসপাতালে ঠাঁই মিলছে না বিদ্যমান বহুসংখ্যক রোগীর। চিকিৎসার অভাবে মারা যাচ্ছে শত শত মানুষ। এভাবে অরণ্য ধ্বংস করে নগর তৈরি করে বোধ হয় মানুষ নিজের ধ্বংস নিজেই ডেকে নিয়ে আসছে।
বর্তমান বাংলাদেশে বসবাস করা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মুসলিম রোহিঙ্গারা কক্সবাজারের উখিয়া অঞ্চলসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বন ধ্বংসের মহোৎসবে মেতে উঠেছে। তারা বনভূমি ধ্বংস করে বাংলাদেশের প্রকৃতিকে ধ্বংসের মুখে ফেলে দিচ্ছে। এছাড়া বনবিভাগের চোখ ফাঁকি দিয়ে অনেক অসাধু ব্যক্তি বন ধ্বংস করছে এবং গাছ বিক্রি করে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে আঙুল ফুলিয়ে কলাগাছ তৈরি করছে। এভাবে বনভূমি ধ্বংস হতে থাকলে অক্সিজেনস্বল্পতায় মানুষ ও পশুপাখির ভোগান্তি শুরু হবে। বাংলাদেশের রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও কক্সবাজার অঞ্চলে কিছু অসাধু ব্যক্তির যোগসাজশে বনাঞ্চল ধ্বংস করা হচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের দক্ষিণ অঞ্চলে অবস্থিত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবনও রয়েছে হুমকির মুখে। সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী ও বরগুনা অঞ্চলজুড়ে রয়েছে এই সুন্দরবন। তবে সাতক্ষীরা অঞ্চলে সুন্দরবনের সবচেয়ে বেশি অংশ অবস্থিত। এখানেও বন বিভাগের চোখ ফাঁকি দিয়ে বনের ভেতরের গাছপালা কেটে নিয়ে যাচ্ছে বনসন্ত্রাসীরা। নৌকা, লঞ্চ, স্টিমার, স্পিডবোট, ট্রলার প্রভৃতি জলযান দিয়ে গাছের গুঁড়ি নিয়ে দূরবর্তী অঞ্চলে বিক্রি করা হচ্ছে। সুন্দরবনের সুন্দরী, গেওয়া, কেওড়া, অসুর, ধুন্দল, গোলপাতা ইত্যাদি বিভিন্ন বৃক্ষ বিভিন্ন শিল্পকারখানার কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এক সমীক্ষায় দেখা যায়, এভাবে গাছ নিধন করতে থাকলে আগামী ২০০ বছরের মধ্যে সুন্দরবন অস্তিত্ব সংকটে পড়বে। বায়ুমণ্ডলে দিন দিন উল্লেখযোগ্য হারে বিরূপ প্রভাব পড়ছে, যার জন্য মনুষ্যজাতি বহুলাংশে দায়ী। কোথাও কোথাও বন ধ্বংস করে গৃহ নির্মাণ করা হচ্ছে, কৃষিজমি বৃদ্ধি করা হচ্ছে, গোচারণ ভূমি তৈরি করা হচ্ছে, যা একজন মানবিক মানুষ হিসেবে কারও কাম্য নয়।
সাম্প্রতিক পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রেইন ফরেস্ট আমাজন বনাঞ্চলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। অগ্নিকাণ্ডের এই ঘটনাটি দাবানল কিংবা মানবসৃষ্ট আগুনও হতে পারে। মানুষের কাছে বিপন্ন আমাজন। আমাজন নদীর অববাহিকায় বিস্তৃত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় এই বনের আয়তন ৫৫ লাখ বর্গকিলোমিটার। প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি বছর আগে আমাজন বনাঞ্চলের উদ্ভব। বর্তমানে ৯টি দেশের সীমানাজুড়ে রয়েছে এই আমাজন। দেশগুলো হলোÑব্রাজিল, পেরু, ইকুয়েডর, কলাম্বিয়া, বলিভিয়া, গায়ানা, ভেনেজুয়েলা, সুরিনাম ও ফরাসি গায়ানা। পৃথিবীর ২০ শতাংশ অক্সিজেন আসে এই আমাজন বনাঞ্চল থেকে, যার ৬০ শতাংশ ব্রাজিলে এবং ১৩ শতাংশ পেরুতে অবস্থিত। সর্বমোট দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের ৪০ শতাংশজুড়ে বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে আছে এই রেইন ফরেস্ট। প্রায় ১৬ হাজার প্রজাতির ৩৯ হাজার কোটি গাছ আছে আমাজনে।
আটলান্টিক মহাসাগরের ওপারে অবস্থিত সাহারা মরুভূমি থেকে আসা ধুলায় উর্বর আমাজন। প্রতিবছর এই ধুলা থেকে পাওয়া যায় দুই কোটি টনেরও বেশি ফসফরাস, যা শতকের পর শতক টিকিয়ে রেখেছে বনের মাটির উর্বরতা। গাছপালার পাশাপাশি নানা প্রাণের স্পন্দনে সমৃদ্ধ এই মহাবন আমাজন। পোকামাকড়ের ২৫ লাখ প্রজাতি এবং দুই হাজার প্রজাতির পাখি ও স্তন্যপায়ী প্রাণী রয়েছে এখানে। সন্ধান মিলেছে ৩৭৮ প্রজাতির সরীসৃপ ও দুই হাজার ২০০ প্রজাতির মাছের। প্রতি বছর প্রায় ২২০ কোটি টন কার্বন-ডাই-অক্সাইড শুষে নেয় বনের গাছপালা। বিভিন্ন জটিল রোগের ওষুধের উপাদানের জোগান দেয় আমাজন। তবে দীর্ঘদিনের বন উজাড়ের প্রক্রিয়ায় আমাজন জঙ্গল এখন বিপন্ন। ১৯৬০ সাল পর্যন্ত আমাজনে গাছ কাটায় ছিল কঠোর বিধিনিষেধ। তবে ষাটের দশক থেকে শিথিল হতে থাকে সরকারের নজরদারি। বন উজাড় করে তৈরি হয় চাষের জমি, গবাদি পশুর খামার, ফসলের ক্ষেত ও গোচারণভূমি। সেইসঙ্গে আমাজন বনাঞ্চলে প্রচুর পরিমাণ খনিজ সম্পদ উত্তোলন, রাস্তাঘাট নির্মাণ, ঘরবাড়ি নির্মাণ ও বনাঞ্চল ধ্বংসের জন্য মানুষ অনেকাংশেই দায়ী। ২০১৮ সাল পর্যন্ত বিলুপ্ত হয়ে গেছে প্রায় ১৭ শতাংশ বনাঞ্চল। সেখানে প্রতি এক মিনিটে তিনটি বড় ফুটবল মাঠের সমান বন উজাড় হচ্ছে। এই অবস্থা চললে আগামী ১০০ বছরে পুরোপুরি ধ্বংস হবে আমাজন বনাঞ্চল। চাষ কিংবা খামারের জমি তৈরির সহজ উপায় বনে আগুন দেওয়া। বনে আগুনের ঘটনা নিয়মিত হলেও এ বছর এর মাত্রা অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে ফেলেছে। বন উজাড়ের অভিযোগ খোদ ব্রাজিল সরকারের বিরুদ্ধে। দুধ ও দুগ্ধজাত দ্রব্য উৎপাদনে ব্রাজিল রয়েছে পৃথিবীর শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর মধ্যে প্রথম সারির দিকে। যেহেতু গরুর দুধ উৎপাদন তাদের অন্যতম লক্ষ্য, তাই তারা গরু পালনের দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। আর গরু পালনের জন্য প্রয়োজন অনেক পরিমাণ কৃষিজমি ও গোচারণভূমি। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারো বনের চেয়ে উন্নয়নের দিকে বেশি নজর দিচ্ছেন। বনাঞ্চলে ক্ষতির জন্য শাস্তির মাত্রা কমানোর প্রতিশ্রুতি রয়েছে তার। তবে আমাজনে আগুনের জন্য এনজিওদের দায়ী করেছেন প্রেসিডেন্ট। আগুন নেভাতে প্রায় ৫০ হাজার সেনা মোতায়েন করেছিল ব্রাজিলের সরকার। প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি উড়োজাহাজ থেকে ফেলা হচ্ছে পানি। বিশ্বনেতাদের আগুন নেভানোর সহযোগিতার প্রস্তাব প্রত্যাখান করেছে দেশটি। নিজেদের শক্তিতেই আগুন নেভাতে চায় ব্রাজিলের সরকারপক্ষ, যেটি একটি অশনি সংকেতের নির্দেশনা প্রদান করে।
আমাজনে পশুপাখির পাশাপাশি বাস করে বহুসংখ্যক উপজাতি। সেখানে প্রায় তিনশ’র বেশি উপজাতি বসবাস করে। আদিমকাল থেকে বনের সঙ্গে সখ্য তাদের। বনের পশুপাখি শিকার করে তারা খাদ্যচাহিদা মেটায়। উপজাতিরা অধিকাংশ ব্রাজিলীয়। এছাড়া তারা পর্তুগিজ, স্প্যানিশ প্রভৃতি ভাষায় কথা বলে। তাদের রয়েছে নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি। তাদের মধ্যে কিছু আছে যাযাবর। তাদের বহির্বিশ্বের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই। বনে আগুনের ফলে এসব উপজাতি খাদ্য সংকট ও প্রয়োজনীয় অক্সিজেন সংকটে পড়ছে। জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত আমাজন বনাঞ্চলে শুষ্ক অবস্থা বিরাজমান। খরা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এই সময়টাতে দাবানলের ঘটনা ঘটে থাকে প্রতি বছর। আমাজন বনাঞ্চল যদি ধ্বংস হয়, তবে পৃথিবীর বৈশ্বিক উষ্ণতা চিরতরে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। মানবসভ্যতা পড়বে তীব্র সংকটে। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার উপগ্রহচিত্রেও ধরা পড়েছে আমাজন বনাঞ্চলে ঘটতে থাকা ৯ হাজার ৫০৭টি নতুন দাবানলের চিত্র। প্রায় এক হাজার ৭০০ কিলোমিটার দূরত্ব পর্যন্ত আগুনের ভয়াবহ লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়েছে। ব্রাজিলের রোরাইমা প্রদেশ থেকে পেরুর রাজধানী লিমা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে বিষাক্ত বায়ু। ব্রাজিলের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইনপের সমীক্ষা বলছে, গত বছরের এ সময়ের তুলনায় এ বছর আগুনের পরিমাণ ৮৩ শতাংশ বেশি এবং ২০১৩ সালের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। বনাঞ্চল উজাড়ে যেসব ক্ষেত্রে যন্ত্র ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে মানুষ সরাসরি আগুন দিয়েছে। ব্রাজিল সরকার তার দেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক মন্দা অপসারণ করতে এবং তার দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য যে কার্যাবলি সম্পাদন করছে, তা পৃথিবীর সব দেশের জন্য হুমকিস্বরূপ।
বাংলাদেশের সুন্দরবনের পাশে বাগেরহাট জেলার রামপালে যে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে, তার ফলে সুন্দরবন হুমকিতে পড়বে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের কেন্দ্রের কালো ধোঁয়া ও বর্জ্য সুন্দরবনের প্রাণীদের জীবন এবং গাছপালা বিপন্ন করবে। বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের পরিমাণ কমবে। প্রাণীরা পড়বে তাদের জীবনসংকটে। অরণ্যের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সে অঞ্চলের জনগোষ্ঠী। পরিশেষে বলা যায়, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে, মানুষের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এবং অক্সিজেনের অভাব পূরণ করতে অরণ্য রক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।

শিক্ষার্থী
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে গড়ি বাসযোগ্য পৃথিবী
ডা. মোহাম্মদ হাসান জাফরী

জাতিসংঘ গৃহীত পরিকল্পনা এসডিজি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সারা বিশ্ব কাজ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশ এর আগে এমডিজি বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে এবং আগামীতে এসডিজি বাস্তবায়নে এগিয়ে চলেছে সফলতার সঙ্গে। আমরা সবাই এই কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে নিজেদের নিয়োজিত রাখব। আমাদের এই অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি দিয়ে পথ চলতে হবেÑতবেই দেশ হবে সমৃদ্ধিশালী, সার্থক হবে আমাদের দেশের সোনার বাংলা নামকরণ।
ব্যক্তি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে তার পরিকল্পিত পরিকল্পনার মাধ্যমে এগিয়ে যায়, তাই তার ক্ষেত্র নির্দিষ্ট হতে পারে। অন্যান্য সব পেশা ও ক্ষেত্রের মতো ডাক্তার হিসেবে যারা ইন্টার্নি করতে যাচ্ছেন, তাদেরও বিশেষভাবে মনোনিবেশ করতে হবে এসডিজি অর্জনে।
চিকিৎসকদের জন্য এসডিজি সফলভাবে বাস্তবায়নে সুস্বাস্থ্যবিষয়ক তিনটি ক্ষেত্রে কাজ করতে হবে আন্তরিকতার সঙ্গে। এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের জন্য ‘সুস্বাস্থ্য’, ‘স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন নিশ্চিত করা’ ও ‘সব বয়সের সবার কল্যাণে কাজ করা’Ñএ তিনটি বিষয়ের আওতায় অর্জিতব্য টার্গেটগুলো হলো: সন্তান জš§দানের সময় মাতৃমৃত্যুর হার কমিয়ে আনা; নবজাতক ও পাঁচ বছরের নিচের শিশুদের মৃত্যুহার প্রতিরোধ করা; এইচআইভি/এইডস ও হেপাটাইটিস বা পানিবাহিত রোগ প্রভৃতি মহামারি নির্মূল করা; ওষুধ ও অ্যালকোহলের অপব্যবহার রোধ করা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে মানুষকে সচেতন করা; পরিবার পরিকল্পনা, যৌন শিক্ষা ও গর্ভবতী মায়েদের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য প্রদান করা এবং উচ্চমানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা, সাশ্রয়ী ও সহজপ্রাপ্য ওষুধ ও টিকার সহজপ্রাপ্যতাসহ সবার সুস্বাস্থ্যের অধিকার নিশ্চিত করা।
‘দেশ আমাদের, গড়ার দায়িত্ব সকলের’ এই নীতিকে প্রাধান্য দিয়ে পথ চলতে হবে, সহযোগিতার হাত বাড়াতে হবে একে অপরের প্রতি। সেবায় আনন্দ পাওয়া যাবেÑএ উপলব্ধি একবার মনে ধরলেই সত্যিকার অর্থেই মানবতা স্থান পাবে, শান্তি আসবে, দেশ এগিয়ে যাবে। দুঃখীর দুঃখমোচনের নানা ধরনের দিক থাকলেও অসুস্থ মানুষকে সেবা দেওয়ার যে আনন্দ, তার স্বাদ একবার মনে জায়গা পেলেই তা শুধু লতার মতো বেড়েই চলবে, আর এ থেকেই সম্পন্ন হবে যার যার দায়িত্ব।
বর্তমান সরকার স্বাস্থ্যসেবাকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে কাজ করে যাচ্ছে। চিকিৎসকরা হতে পারেন এ যাত্রার সহযাত্রী। নীরবে-সরবে যেভাবেই হোক না কেন, এর ফল দেশ ও জনগণ পাবেই। লোক দেখানোর জন্য নয়, নিজে কাজ করার পাশাপাশি অন্যকে ভালো কাজ করতে উৎসাহিত করতে হবে। আর এর সবই এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সফলতা বয়ে আনবে।
দেশের তরুণ-তরুণীরা যারা নতুন প্রজšে§র বিজয়ী বীরের দল, তারা বদলে দিতে পারে আমাদের এ দেশকে, বদলে দিতে পারে সমগ্র বিশ্বকে। অনেকের সঙ্গে হাতে হাত রেখে কাজ করে মানবসেবায় দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। দেশের উন্নয়নে নতুন এ প্রজš§কে স্বাস্থ্যসেবায় কাজ করার অঙ্গীকার করতে হবে। নতুন প্রজšে§র তরুণ-তরুণীদের, বিশেষ করে চিকিৎসকদের সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে কাজ করে বিশ্বকে দেখিয়ে দিতে হবেÑআমরাও পারি। প্রয়োজন শুধু জাগরণ ও সমন্বিত উদ্যোগ।
বর্তমান সরকার চলতি অর্থবছরের বাজেটে এ বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করেছে। শিশুদের প্রতি বিনিয়োগ বৃদ্ধিকে সরকার অগ্রাধিকার দিয়েছে। গত অর্থবছরে শিশুদের জন্য বরাদ্দের পরিমাণ ছিল ৬৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে ৮০ হাজার ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা জাতীয় বাজেটের ১৫ দশমিক ৩৩ শতাংশ।
সরকার মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যের উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্রহণ করছে। মাতৃস্বাস্থ্যের উন্নয়নে গৃহীত বিভিন্ন কার্যক্রমের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেÑচিকিৎসকদের জরুরি প্রসূতিসেবার ওপর প্রশিক্ষণ প্রদান, মাঠপর্যায়ে কর্মীদের ‘কমিউনিটি বেজ্ড স্কিল্ড বার্থ অ্যাটেনডেন্ট’ প্রশিক্ষণ প্রদান, নিরাপদ এমআর সেবা প্রদান, গর্ভবতী মায়েদের সমন্বিত চিকিৎসাসেবা প্রদান, প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবসেবা গ্রহণে উৎসাহ প্রদান, মাতৃস্বাস্থ্য ভাউচার স্কিম সম্প্রসারণ এবং সার্ভিক্যাল ও ব্রেস্ট ক্যানসার আগাম শনাক্তকরণ। অন্যদিকে নবজাতকের চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণের জন্য ১০টি জেলা হাসপাতাল এবং ৬১টি উপজেলা হাসপাতালে স্পেশাল কেয়ার নিউবর্ন ইউনিট (ঝঈঅঘট) চালু করা হয়েছে। জনগণের ক্রমবর্ধমান স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে ও স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে সরকার ৯ হাজার ৭৯২ মেডিক্যাল অফিসার নিয়োগের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
সরকার বিনা মূল্যে স্বাস্থ্যসেবা তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দিয়ে এরই মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। কমিউনিটি ক্লিনিকই হলো গ্রামীণ জনগণের সেবা প্রদানের প্রথম সেবা কেন্দ্র। বর্তমানে ১৩ হাজার ৭৭৯টি ক্লিনিক চালু রয়েছে, যেখানে প্রতিদিন গড়ে ৪০ সেবাপ্রার্থী প্রতিটি ক্লিনিক থেকে সেবা গ্রহণ করে থাকেন। আর তাদের ৮০ শতাংশই হচ্ছে নারী ও শিশু। এখন সারা দেশের প্রায় চার হাজার কমিউনিটি ক্লিনিকে স্বাভাবিক প্রসবসেবা দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আর্থিক ঝুঁকি হ্রাসে বর্তমানে টাঙ্গাইল জেলার কালিহাতি, ঘাটাইল ও মধুপুর উপজেলায় ‘স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচি’ চালু করা হয়েছে।
দেশে চিকিৎসা শিক্ষার মান উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় বিজ্ঞানের নতুন নতুন উদ্ভাবন ও উচ্চপ্রযুক্তি ব্যবহার করে চিকিৎসা ব্যবস্থা আধুনিকায়নের লক্ষ্যে ফেলোশিপ অনুদান প্রদানসহ আনুষঙ্গিক বিভিন্নমুখী কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। মেডিক্যাল কলেজের সংখ্যা ও আসনসংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়েছে। ২০০৬ সালে দেশে ৪৬টি মেডিক্যাল কলেজ ছিল, বর্তমানে ১১১টিতে উন্নীত হয়েছে। আসনসংখ্যা দুই হাজার ৫০ থেকে ১০ হাজার ৩০০টিতে উন্নীত হয়েছে। চলতি অর্থবছরে দেশের আটটি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ক্যাম্পাসে ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্স (ইনমাস) স্থাপন করা হবে। পাশাপাশি বিদ্যমান ছয়টি ইনস্টিটিউটের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হবে। প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে বিশেষভাবে চিকিৎসা পেশায় নিয়োজিত সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
এখন সময় এসেছে সবার দায়িত্বশীল হওয়ার, নিজেদের যোগ্যতা বৃদ্ধির জন্য যার যার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখার, সভা-সেমিনারের মাধ্যমে অভিজ্ঞতা সবার মাঝে শেয়ার করার এবং বেশি বেশি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার। যার যার অবস্থান থেকে দেশের প্রতি দায়িত্ব পালন করলে দেশ হবে প্রকৃতই সোনার বাংলা। উন্নত দেশের প্রতিষ্ঠিত জাতি হিসেবে নিজেদের বিশ্বদরবারে অধিষ্ঠিত করতে পারব। বাংলাদেশ আলোকিত হবে সব ক্ষেত্রে। বিশ্বের বুকে আমরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারব। আর এজন্য তরুণ চিকিৎসকসহ নতুন প্রজš§কে এগিয়ে আসতে হবে সবার আগে।

পিআইডি প্রবন্ধ