দারিদ্র্যের হার কমাতে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সঠিক বাস্তবায়ন চাই

ফারিয়া ইয়াসমিন: মানব জীবনের এক অগ্রহণযোগ্য অবস্থার নাম দারিদ্র্য। এটি পরিবর্তনশীল কোনো বিষয় নয়। সরকারের নীতি ও কার্যব্যবস্থা দারিদ্র্য নির্মূল করতে পারে। দারিদ্র্য একটি অভিশাপ। যে অভিশাপ এর কবলে পড়লে কোনো দেশ এগিয়ে যেতে পারে না। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটেও দারিদ্র্য এখানে চরমভাবে বিরাজ করে। জনসংখ্যার দিক দিয়ে অধিক ঘনবসতিপূর্ণ দেশ বাংলাদেশ। এই অধিক জনসংখ্যা হলেও মাথাপিছু আয় কম। স্বাধীনতার এত বছরেও ‘দারিদ্র্য’ শব্দটাকে আমরা মুছে ফেলতে পারিনি। কোনো না কোনো যুক্তিসঙ্গত পদক্ষেপের অভাবে দারিদ্র্যকে আমরা নির্মূল করতে পারছি না। তবে দারিদ্র্যের হার অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। তবে সেটা দেশের সার্বিক বিবেচনায় কতটা উন্নয়নের অনুকূলে হবে তা সঠিকভাবে নিরূপণ করা যায় না।

আমাদের নতুন নতুন প্রত্যাশাগুলোর অন্যতম স্থানে আছে দারিদ্র্যশূন্য দেশের স্বপ্ন। যে স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছি আমরা। প্রত্যাশা যাই হোক না কেন সেটা প্রাপ্তিতে রূপান্তর করতে যথাযথ পরিকল্পনা প্রয়োজন।

কভিড মহামারিতে মানুষের সাধারণ জীবনযাপন আর আগের মতো নেই। যদি মধ্যবিত্ত থেকে গরিব শ্রেণির মানুষের জীবনযাপনের দিকে লক্ষ্য করি তাহলে আমরা বুঝতে পারব তাদের অবস্থা কতটা করুণ। দিন এনে দিন খাওয়া মানুষগুলো কাজের আশায় পথ চেয়ে থাকে, হয়তো একটা কাজ জুটবে তারপর মুখে অন্ন উঠবে। প্রচলিত একটা ধারণা ছিল গ্রামাঞ্চল মানেই দারিদ্র্য। কিন্তু সংজ্ঞাটি যেন দিন দিন পাল্টে যাচ্ছে।

শহরের অর্ধেক পরিবারই দরিদ্র হওয়ার ঝুঁকিতে আছে। আর শহরের আট শতাংশ দরিদ্র মানুষ, কোনো ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা প্রকল্পের সুবিধা পান না। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

দারিদ্র্য নিরসন দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও করোনা পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক মন্দা নিরসনের জন্য একান্তই প্রয়োজন। দারিদ্র্য জনগোষ্ঠীকে উন্নত জীবন যাত্রায় আনার জন্য বর্তমানে বিভিন্ন রকম চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। তবে সম্প্রতি যে বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে সেটি হলো, সামাজিক সুরক্ষার বাস্তবায়নের মাধ্যমে দারিদ্র্যের হার কমানো।

বাংলাদেশ সোশ্যাল প্রটেকশন পাবলিক এক্সপেনডিচার রিভিউ শিরোনামের প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ বাংলাদেশে দারিদ্র্যকে উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করতে পারে। এই সুরক্ষা কর্মসূচি বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন নীতির কেন্দ্রে রয়েছে এবং ক্রমাগত দরিদ্র পরিবারের উপকার করছে। সুরক্ষা কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রা যথাযথভাবে গ্রহণ করা হলে এবং তা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করলে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ৩৬ শতাংশ ১২ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো মূলত গ্রামাঞ্চলকেন্দ্রিক। তবে শহুরে জনসংখ্যার ৫ জনের মধ্যে ১ জন দারিদ্র্যের মধ্যে রয়েছে এবং শহরের অর্ধেক পরিবার দারিদ্র্যের মধ্যে পড়?ার ঝুঁকিতে রয়েছে। মানুষ প্রয়োজনের তাগিদেই গ্রাম থেকে শহরমুখী হয়। কিন্তু বর্তমানে লাখ লাখ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে, জীবনের তাগিদে এখন শহর ছেড়ে গ্রামের দিকে ধাবিত হচ্ছে। দারিদ্র্য এখন শহরাঞ্চল-গ্রামাঞ্চল দুই জায়গাতেই জেঁকে বসে আছে।

গ্রামীণ এবং শহর এলাকায় সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো পুনর্বিন্যাসের তাগিদ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, শহরে ১৯ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে থাকলেও তাদের মধ্যে ১১ শতাংশ সামাজিক সুরক্ষার আওতায় রয়েছে। অন্যদিকে গ্রামাঞ্চলে ২৬ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে থাকলেও সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় আছে ৩৬ শতাংশ মানুষ। অর্থাৎ গ্রামে দারিদ্র্য হারের চেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষ সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন।

প্রতিবেদনটিতে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে বাংলাদেশের অব্যাহত বিনিয়োগ এবং প্রকল্প পরিকল্পনা, নকশা ও বিভিন্ন কর্মসূচির ভাতা বিতরণসহ বিদ্যমান কাঠামো কীভাবে উন্নত করা যায় সে বিষয়েও পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

বর্তমান সরকার ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। টেকসই উন্নয়নের মূল উদ্দেশ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দারিদ্র্যমুক্ত দেশ হওয়ার লক্ষ্য আছে। ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি উচ্চ আয়ের দেশে উন্নীত করা, যেখানে দারিদ্র্য হবে নিম্নতম ৫ শতাংশের কম। সরকারের লক্ষ্য হলো, ২০৪১ সালের মধ্যে সব কর্মক্ষম নাগরিক তাদের কর্মসংস্থান থেকে প্রাপ্ত আয় দিয়ে জীবনধারণের ন্যূনতম মান বজায় রাখতে পারবে। ২০২৫ সালের মধ্যে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৩২ লাখ ৫০ হাজার।

যদি সব কর্মপরিকল্পনা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা হয় তাহলে দারিদ্র্যশূন্য দেশের প্রত্যাশাপ্রাপ্তিতে পরিণত হবে। দারিদ্র্যের প্রভাব দেশের জন্য ক্ষতিকর এটা সব ধরনের উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করে। তাই সরকারের নেয়া প্রতিটি উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য যথাযথ কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন। দারিদ্র্যে এমন একটি সমস্যা যেটা নির্মূল করতে যে উদ্যোগ নেয়া হয় সেটাতেও দারিদ্র্য বাধা হয়ে দাঁড়ায়। শিক্ষা বিস্তারের মাধ্যমে সবার জন্য আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা যায় কিন্তু এই শিক্ষা প্রসারের ক্ষেত্রেও বাধা হয় দারিদ্য”নামক শব্দ ।  এজন্যই এই সমস্যার গভীরে প্রবেশ করে এর পর্যালোচনা করা জরুরি।

দারিদ্র্যের সমাধান খুঁজে বের করার প্রাথমিক দায়িত্ব বর্তায় দেশগুলোর ওপর আর সফলতা নির্ভর করে দেশের সরকার ও সুশীল সমাজের সমন্বিত প্রচেষ্টার ওপর। দারিদ্র্য বিমোচন ও বৈষম্য হ্রাসকরণে জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলপত্র, ২০১৫ প্রণয়ন করা হয়। করোনাভাইরাসের ফলে সামাজিক স্থবিরতাজনিত কারণে সাময়িক দারিদ্র্য দূরীকরণে সরকারি প্রণোদনা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের আওতা বৃদ্ধি করা হয়েছে।

সামাজিক সুরক্ষা বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পরিমাণ অনেকাংশে কমিয়ে আনা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এটা সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে আরও কমে আসবে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর টেকসই উন্নয়নে চলমান সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সঠিক ব্যবহারে দেশে দারিদ্র্যের হার ৩৬ শতাংশ থেকে ২৪ শতাংশ কমে ১২ শতাংশে আসতে পারে বলে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

সামাজিক সুরক্ষার কর্মসূচিগুলো মূলত বেশিরভাগই গ্রামকেন্দ্রিকভাবে সংগঠিত হয়ে থাকে। তবে বর্তমানে শহরাঞ্চলেও এগুলো চালু করা একান্ত প্রয়োজন হয়ে পড়েছে; কেননা শহরাঞ্চলে দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধি পেতে চলেছে।

শহরে জনসংখ্যার প্রায় পাঁচজনের মধ্যে একজন দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। কিন্তু এর মধ্যে অর্ধেক পরিবার দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এ কারণে গ্রামীণ এবং শহুরে এলাকার মধ্যে ভৌগোলিক বরাদ্দ পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজন। সরকারের প্রচেষ্টা আমরা সর্বস্তরে লক্ষ্য করছি। ২০২৫ সালের মধ্যে ৮০ লাখ ৫০ হাজার নতুন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে; যা দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য যথেষ্ট ভূমিকা রাখবে।  প্রান্তিক মানুষ বেশি দারিদ্র্যের জালে জড়িয়ে পড়ে এজন্য সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি দেয়া হচ্ছে। আয়বৈষম্য একটা বড় সমস্যা এই বৈষম্য মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। রূপকল্প ২০৪১-এ সমৃদ্ধি অর্জন করতে হলে দারিদ্র্যকে দূর করতে হবে এবং তার জন্য সামাজিক সুরক্ষার কর্মসূচির পূর্ণ বাস্তবায়ন চাই।

শিক্ষার্থী, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

সর্বশেষ..