মত-বিশ্লেষণ

দারিদ্র্য বিমোচনে ভূমিকা রাখবে নারীর স্বনির্ভরতা

মুসলিমা খাতুন: আলেয়া বেগমের বাড়ি সিরাজগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। স্বামী আজাদ মিয়া বর্গাচাষি। তিন ছেলে-মেয়েসহ পাঁচজনের অভাবের সংসার। আজাদ মিয়া অসুস্থতার কারণে ঠিকমতো কাজ করতে পারেন না। সংসারে অভাব ঘুচাতে আলেয়া অন্যের বাড়িতে কাজ নেন।

একদিন এক এনজিওকর্মীর সঙ্গে আলেয়ার পরিচয় হয়। তার কাছে সংসারের সব কথা খুলে বলেন আলেয়া। এনজিওকর্মী তার সমিতি থেকে কিস্তিতে ঋণ নিয়ে ছাগল, হাঁস-মুরগি পালনের পরামর্শ দেন। তিনি আলেয়াকে ঋণ পেতে সাহায্য করেন। ২০০৮ সালে আলেয়া প্রথমে ১০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে তিনটি ছাগল ও পাঁচটি মুরগি কিনে বাড়ির আঙিনায় পালন শুরু করেন। এক বছরের মধ্যে দুটি ছাগল বাচ্চা দেয়। ছাগলের বাচ্চা ও মুরগির ডিম বিক্রি করে আলেয়া ঋণের টাকা পরিশোধ করেন। লেনদেন ভালো হওয়ায় ওই সমিতি থেকে আবার আলেয়া ৩০ হাজার টাকা ঋণ নেন। এ ঋণের টাকা দিয়ে তিনি একটি গাভী কেনেন। গাভীটি প্রতিদিন তিন কেজি করে দুধ দেয়। গাভীর দুধ ও ডিম বিক্রি করে আলেয়ার সংসারে উন্নতি হতে থাকে।

আলেয়া ২০১২ সালে সরকারি ব্যাংক থেকে এক লাখ টাকা কৃষিঋণ নিয়ে বাড়ির পাশে একটি ছোট খামার গড়ে তোলেন। বর্তমানে তার খামারে ১০টি গাভী ও ২০টি ছাগল রয়েছে। আলেয়ার ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করছে। লেখাপড়ার মাঝে তারা মায়ের কাজে সহযোগিতা করে। খামার থেকেই প্রতিদিন সকালে দুধ বিক্রি হয়ে যায়। এখন আলেয়ার সংসারে আর অভাব নেই। আলেয়ার জীবনের এ ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। আলেয়ার মতো উন্নয়নের নীরব বিপ্লব ঘটিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ নারী সমাজ।

উন্নয়নশীল দেশের জন্য দারিদ্র্য মোকাবিলা করা একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ এ চ্যালেঞ্জ দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করে যাচ্ছে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর যুগান্তকারী পদক্ষেপের কারণে দারিদ্র্যের হার অনেক কমে এসেছে। ইতোমধ্যে সরকারের সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে চলেছে। এসব পরিকল্পনার মূল লক্ষ্যই হচ্ছে অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং দারিদ্র্য বিমোচন। তৃণমূল পর্যায়ে সরকারের বাস্তবায়িত উন্নয়ন কার্যক্রমের ফলে দারিদ্র্য যেমন হ্রাস পেয়েছে, তেমনি শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি খাতে উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্জিত সাফল্য দেশ-বিদেশে প্রশংসিত হয়েছে।

আমাদের দেশের নারীদের এক বিশাল অংশ এখন আত্মকর্মসংস্থানে নিয়োজিত। দিন দিন তা আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। কৃষিপণ্য উৎপাদন, গাভী পালন, মৎস্য চাষ, হাঁস-মুরগি পালন, সবজি বাগান, মৃৎশিল্প, বসতবাড়ির আশপাশে বৃক্ষরোপণ এবং বাঁশ ও বেতভিত্তিক শিল্পপণ্য ইত্যাদি কাজের সঙ্গে নারীরা সরাসরি জড়িত। সরকারি প্রণোদনার অংশ হিসেবে গ্রামীণ নারীরা বিনা সুদে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে নিজেরাই উদ্যোক্তা তৈরি করছে। বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ নিয়ে যেমন সেলাই প্রশিক্ষণ, মৎস্য ও পশুপালনে প্রশিক্ষণ নিয়ে গ্রামীণ নারীরা আজ স্বাবলম্বী হচ্ছেন। ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পে কর্মরত শ্রমিকের প্রায় ৩৪ শতাংশই নারী। শহরকেন্দ্রিক শ্রমনির্ভর শিল্প, বিশেষত পোশাকশিল্পের ৮০ শতাংশ কাজ নারীরাই করে থাকেন। কাপড় সেলাই, নকশা, বাটিক, বুটিক ও এমব্রয়ডারি ইত্যাদি উপার্জনমূলক কর্মের সঙ্গে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারী জড়িত। কাজেই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ যে দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে মোট দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ৫১ শতাংশ সাব-সাহারা অঞ্চলে এবং ৩৪ শতাংশের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয়। এই তথ্যের বিপরীত অবস্থানে রয়েছে এখন বাংলাদেশ। পাশের দেশ ভারত, পাকিস্তান ও ভুটানের চেয়েও এগিয়ে আছে বাংলাদেশ। ২০০৫ সালে দেশে যেখানে অতিদরিদ্রের হার ছিল ৪৩ শতাংশ, বর্তমানে তা কমে ১২ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে এসেছে। বিশ্বের খুব কম দেশই এ সাফল্য অর্জন করতে পেরেছে। ফলে বর্তমান বিশ্বে বাংলাদেশ এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রেসিডেন্ট বান কি মুন বলেছিলেন, বিশ্বের অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের উচিত কীভাবে দারিদ্র্য দূর করতে হয়, তা বাংলাদেশের কাছ থেকে শেখা। তার মতে, টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে এ দেশ অনন্য এবং উন্নয়নশীল দেশের কাছে অনুকরণীয় হতে পারে। বাংলাদেশের এই ‘উন্নয়ন বিস্ময়’ নজরে এসেছে জাতিসংঘেরও। দারিদ্র্যের হার কমিয়ে আনার সাফল্যের রহস্য বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এটি আমাদের জন্য একটি অনন্য অর্জন বলা যায় নিঃসন্দেহে।

বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশে ধারাবাহিকভাবে অতিদরিদ্রের হার কমেছে। এই প্রবণতাকে বাংলাদেশের একটি বড় অর্জন হিসেবে মনে করে বিশ্বব্যাংক। মূলত শিক্ষা ক্ষেত্রে লিঙ্গসমতা ও সফল পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি বাস্তবায়ন এ দেশের দারিদ্র্য বিমোচনে বড় ধরনের সহায়তা করেছে। কয়েক বছর ধরে সরকারের নেওয়া সমন্বিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার কারণে এ সাফল্য এসেছে। সরকার গত ছয় বছরে সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলপত্রের আওতায় নেওয়া কর্মসূচি ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছে। পাশাপাশি সারা দেশে সড়ক নেটওয়ার্কের ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। গ্রাম-উপজেলা-জেলাসহ সব ক্ষেত্রে সড়ক অবকাঠামোর ব্যাপক উন্নতি হওয়ায় এর সুফল পাচ্ছে সাধারণ জনগণ। এখন গ্রামের সাধারণ কৃষক তার উৎপাদিত পণ্য খুব সহজে শহরে আনতে পারছে। গ্রামীণ নারীরা বিভিন্ন ধরনের আয়বর্ধক কাজ করে নিজেদের ভাগ্যের উন্নয়ন করছে। এসব কারণে বাংলাদেশে অতিদরিদ্র মানুষের সংখ্যা অনেকটাই কমে এসেছে। মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নেও এসব কর্মসূচি ভূমিকা রাখছে।

দারিদ্র্য ও ক্ষুধামুক্ত সমাজ গড়তে এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে নারীর ক্ষমতায়নের বিকল্প নেই। মৌলিক ও মানবিক চাহিদাগুলো পূরণের ক্ষেত্রে আমাদের দেশের নারীরা এখনও কিছু কিছু ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে। সাংবিধানিকভাবে নারীর অধিকার ও নারী উন্নয়নের কথা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকলেও কিছু প্রতিকূলতা এবং কিছু ক্ষেত্রে সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি এগিয়ে যাওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাই বাংলাদেশের নারীদের প্রাপ্য অধিকার অর্জনে এখনও খানিকটা পথ পাড়ি দিতে হবে।

দারিদ্র্য মোকাবিলায় নারীশিক্ষা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার সঙ্গে জাতীয় উন্নয়নের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। বিভিন্ন গবেষণা থেকে এটা আজ সুস্পষ্ট যে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে নারী শিক্ষার ভূমিকা ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী। একজন শিক্ষিত নারীশ্রমিক আর একজন সাধারণ নারীশ্রমিকের মধ্যে পারিশ্রমিকের যেমন পার্থক্য রয়েছে, তেমনি কাজের গুণগত মানেরও তফাত রয়েছে। তাই অধিক উপার্জন ও কাজের গুণগত মানোন্নয়নের জন্য নারীদের শিক্ষিত হওয়া প্রয়োজন। এ বাস্তবতা অনুধাবন করে সরকার কারিগরি শিক্ষাকে গুরুত্ব দিচ্ছে। ডিগ্রি পর্যায় পর্যন্ত অবৈতনিক করার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নারীদের দক্ষ করে গড়ে তোলা হচ্ছে।

দেশ ও সমাজের উন্নতির জন্য আলেয়াদের মতো নারীরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইচ্ছা ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলে নারীদের এগিয়ে চলা থামানো সম্ভব নয়। তারা আর পিছিয়ে থাকবে না। মনে রাখতে হবে, দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে দারিদ্র্য মোকাবিলা সম্ভব নয়। সরকার গৃহীত উন্নয়নমূলক কর্মসূচিতে নারীরা যাতে যুক্ত হতে পারে, সে সম্পর্কে তাদের সচেতন করতে হবে। গ্রামীণ নারীদের উন্নয়নের মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে সরকারের পাশাপাশি পুরুষদেরও এগিয়ে আসতে হবে। তাহলেই আমাদের নারী সমাজ দেশের উন্নয়নের চালিকাশক্তি হিসেবে পুরুষদের সঙ্গে সমান তালে এগিয়ে যেতে সক্ষম হবেন।

পিআইডি প্রবন্ধ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়: শিক্ষার্থীদের

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..