ফারুক রহমান, সাতক্ষীরা : কৃষিজমিতে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করিয়ে চিংড়ি ও কাঁকড়া চাষের ফলে ফসলি জমি নষ্ট হচ্ছে। মাটির উর্বরতা কমছে। খাদ্য উৎপাদন কমে যাচ্ছে। কৃষিনির্ভর জনগোষ্ঠী দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির মুখে পড়ছে। স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এই ভয়ংকর পরিণতি থেকে বাঁচতে সুনির্দিষ্ট দাবিতে মানববন্ধন করেছে সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার সাধারণ মানুষ। গতকাল রোববার শ্যামনগর উপজেলার নওয়াবেঁকি বাজারে এই মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। কোস্ট ফাউন্ডেশন ও উদয়ন বাংলাদেশ যৌথভাবে এ মানববন্ধনের আয়োজন করে।
মানববন্ধন থেকে বক্তারা বলেন, জীবন-জীবিকা ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষিজমিতে লবণ, চিংড়ি ও কাঁকড়া চাষ বন্ধ করা জরুরি। কৃষিজমিতে লবণাক্ত পানি প্রবেশ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে। ফসলি জমিতে চিংড়ি ও কাঁকড়া চাষ নিষিদ্ধ করতে কার্যকর আইন প্রয়োগ করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য বিকল্প আয় ও পুনর্বাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় জনগণের সম্মতি ছাড়া ভূমি ব্যবহার পরিবর্তন বন্ধ করতে হবে। লবণ চাষ থেকে কৃষিতে ফিরতে হবে।
কোস্ট ফাউন্ডেশনের হেড অব ক্লাইমেট চেঞ্জ এম এ হাসানের সঞ্চালনায় সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন উদয়ন বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক শেখ আসাদ। মানববন্ধনে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেনÑশ্যামনগর প্রেস ক্লাবের সভাপতি সামিউল ইসলাম মনির, সাবেক ইউপি সদস্য এম এম শওকত হোসেন, উন্নয়নকর্মী ইমরান পারভেজ, গণচেতনা ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শিবু প্রসাদ বৈদ্য, ভুক্তভোগী জনগোষ্ঠীর নারী প্রতিনিধি নাজমা ও ঝরনা খাতুন প্রমুখ।
মানববন্ধনে এম এ হাসান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছাড়াও চিংড়ি বা কাঁকড়ার ঘের এ অঞ্চলকে কৃত্রিমভাবে লবণাক্ত করে তুলছে এবং পরিবেশগত বিপর্যয় বাড়াচ্ছে। কৃষিজমিতে লবণাক্ত পানি ঢুকিয়ে লবণ, চিংড়ি ও কাঁকড়া চাষ কিছু মানুষের লাভজনক হলেও, এটা জীববৈচিত্র্যকে ধ্বংস করছে এবং বহু মানুষের জমি, খাদ্য, জীবিকা ধ্বংস করে তাদের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ফসলি জমিতে লবণাক্ততা স্থায়ীভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় জমিগুলো বহু বছর ধরেই চাষের অযোগ্য থেকে যাচ্ছে। কৃষিজমি সংরক্ষণ আইন ২০০০-এ বলা হয়েছে যে যদি কোনো কৃষিজমি শিল্প, আবাসিক বা অন্য কোনো অকৃষি ব্যবহারের জন্য রূপান্তর করতে চায়, তাহলে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন বাধ্যতামূলক, আমরা আইনের কঠোর বাস্তবায়ন দেখতে চাই।
উদয়ন বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক শেখ আসাদ বলেন, শ্যামনগর ও সাতক্ষীরার চিংড়ি ও কাঁকড়ার ঘেরের লবণাক্ততার কারণে কৃষির উৎপাদন ও জমির গঠন হুমকির মুখে পড়েছে, যা স্থানীয় কৃষি ও জীবিকাকে সরাসরি প্রভাবিত করছে। কৃষিকাজের জমিগুলো দীর্ঘমেয়াদে জন্য অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে অনেক কৃষক নিজের বসতভিটা এবং কৃষিকাজ ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন, জীবিকার সন্ধানে তারা অন্যত্র মাইগ্রেশন বা স্থানান্তর হচ্ছেন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য মাসিক ভাতা, স্বল্পমেয়াদি ঋণ বা নতুন ব্যবসা শুরু করার জন্য সাহায্য গুরুত্বপূর্ণ।
শ্যামনগর প্রেস ক্লাবের সভাপতি সামিউল ইসলাম মনির বলেন, অবৈধভাবে দেওয়া খালের ইজারা বাতিল করতে হবে, অবৈধ বালি উত্তোলনের ফলে নদী ভাঙন তীব্র হচ্ছে; অবৈধ বালি উত্তোলন বন্ধ করতে হবে। আমাদের কৃষিতে ফিরে যেতে হবে; আমাদের জমি এক ফসলি জমিতে পরিণত হয়েছে, আমাদের সেগুলোকে তিন ফসলি জমিতে পরিণত করতে হবে এবং খাদ্যে স্বয়ং সম্পূর্ণতা অর্জনে আমাদের ধান ও সবজির উৎপাদন বাড়াতে হবে।
গণচেতনা ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শিবু প্রসাদ বৈদ্য বলেন, এমনিতেই পুরো উপকূলীয় অঞ্চলজুড়ে খাবার পানির তীব্র সংকট। যেখানেই চিংড়ি, কাঁকড়া চাষ বেশি সেখানেই খাবার পানির সংকট তীব্রতর। অবাধে চিংড়ি ও কাঁকড়া চাষকে যদি এখনই কঠোর নীতিমালার আওতায় আনা না হয়, তাহলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পরিবেশ, প্রকৃতি ও অর্থনীতি আরও বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। কৃষিজমিতে লবণ, চিংড়ি ও কাঁকড়া চাষের আগ্রাসন বন্ধ বরতে হবে।
উন্নয়নকর্মী ইমরান পারভেজ বলেন, পানীয় জলের তীব্র ঘাটতি রয়েছে, সরকারকে এটি মোকাবিলায় কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে, জলবায়ু-অভিযোজিত কৃষি ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে, কৃষকদের এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে এবং তাদের জন্য প্রণোদনা বৃদ্ধি করতে হবে।
সাবেক ইউপি সদস্য এম এম শওকত হোসেন বলেন, ‘সিডর ও আইলার পর থেকে আমাদের অঞ্চল লবণাক্ততার ঝুঁকিতে পড়েছে, কৃষি উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে, পানীয় জলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে এবং লবণাক্ততার কারণে আমাদের জমির উর্বরতা কমেছে। আমরা এ থেকে মুক্তি পেতে সরকারের যথাযথ পদক্ষেপ আশা করছি।’
ভুক্তভোগী জনগোষ্ঠীর নারী প্রতিনিধি ঝরনা খাতুন বলেন, ‘লবণাক্তার প্রভাবে আমরা নারীরা রয়েছি মারাত্নক ঝুঁকিতে, আমাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি দিন দিন বেড়েই চলেছে, কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়ায় স্থানীয়ভাবে খাদ্য সংকট তৈরি হচ্ছে, কৃষিনির্ভর পরিবারগুলো নিজেদের খাবার নিজেরা উৎপাদন করতে না পারছে না; বাজারের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে, দারিদ্র্য ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে চাহিদা অনুযায়ী জোগান না থাকায় পরিবারগুলো বিশেষ করে নারী, শিশুরা অপুষ্টির শিকার হচ্ছে। কৃষি উৎপাদন প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বেকারত্ব বেড়েছে, কাজের সন্ধানে মানুষ শহরমুখী হচ্ছে। ফলে পুরুষশূন্য পরিবারগুলোতে নারীদের নিরাপত্তার ঘটিতি, বহুবিবাহ, বাল্যবিয়েসহ নানা সামাজিক অপরাধের মাত্রা বেড়েছে। টেকসই সমাধানের জন্য সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post