প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

দুই অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের পাচার ৮৯০ কোটি টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক

পোলট্রি ফিডের ক্যাপিটাল মেশিনারি আমদানির ঘোষণা দেওয়া হয়, কিন্তু আমদানি করা হয় নিষিদ্ধ সিগারেট ও মদ এবং আমদানিনিয়ন্ত্রিত এলইডি টেলিভিশন ও ফটোকপিয়ার। একটি-দুটি নয়, ৭৮টি কনটেইনার-ভর্তি এসব পণ্য আমদানি করেছে দুটি প্রতিষ্ঠান। জালিয়াতির মাধ্যমে দুটি প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে মিথ্যা ঘোষণায় এসব পণ্য খালাসও নিয়েছে। পণ্য আমদানির আড়ালে প্রতিষ্ঠান দুটি প্রায় ৮৯০ কোটি টাকার অর্থপাচার করেছে।

ব্যাংক, বন্দর ও কাস্টমসের এত তদারকির পরও কীভাবে দুটি প্রতিষ্ঠান এমন জালিয়াতি করেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জালিয়াতি করে আসা দুটি প্রতিষ্ঠানেরই (হেনান আনহুই এগ্রো এলসি ও এগ্রো বিডি অ্যান্ড জেপি) অস্তিত্ব নেই। কীভাবে সম্ভব, সে রহস্য উদ্ঘাটন করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর। দুটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পৃথক ১৫টি মামলা করা হয়েছে। গতকাল মানি লন্ডারিং আইনে পল্টন থানায় এসব মামলা করা হয়। এছাড়া রফতানির নামে অর্থপাচারের অভিযোগে এসবি এক্সিম বাংলাদেশ নামে আরও একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। কাস্টমস গোয়েন্দা সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

তথ্যমতে, মিথ্যা ঘোষণায় আমদানির মাধ্যমে হেনান আনহুই এগ্রো এলসি ৪৪০ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, এগ্রো বিডি অ্যান্ড জেপি ৪৩৩ কোটি ৬২ লাখ টাকা ও এসবি এক্সিম বাংলাদেশ ৯২ কোটি ১০ লাখ টাকা পাচার করেছে। এর মধ্যে হেনান আনহুই এগ্রো এলসির ১১ জনের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে ছয়টি বিল অব এন্ট্রি অনুযায়ী পৃথক ছয়টি মামলা করা হয়েছে। ছয়টি বিল অব এন্ট্রি অনুযায়ী চারটি মামলায় পৃথক ৬৮ কোটি ৮৫ লাখ টাকা ও দুটি মামলায় পৃথক ৮২ কোটি ৬২ লাখ টাকা। মামলার বাদী কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা বিটন চাকমা।

এগ্রো বিডি অ্যান্ড জেপির ৯টি বিল অব এন্ট্রি অনুযায়ী পৃথক ৯টি মামলা করা হয়েছে। মামলায় আসামি ১১ জন। তবে হেনান আনহুই আর এগ্রো বিডির মামলায় আসামিরা একই। ৯টি বিল অব এন্ট্রির মধ্যে আটটিতে পৃথক ৪৭ কোটি ১৩ লাখ টাকা করে এবং একটিতে ৫৬ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। পাঁচটি মামলার বাদী কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা আছমা বেগম এবং চারটি মামলার বাদী সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা শামসুন নাহার। এছাড়া এসবি এক্সিম বাংলাদেশের ১০ ব্যক্তি ও তিন সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের মালিকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। মামলার বাদী সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মো. মাহবুব এ খোদা।

হেনান আনহুই এগ্রো এলসি ও এগ্রো বিডি অ্যান্ড জেপির মামলার আসামিরা হলেনÑদুটি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী আবদুল মোতালেব, মেসার্স রাবেয়া অ্যান্ড সন্স সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের স্বত্বাধিকারী জালাল উদ্দিন, কাস্টমস জেটি সরকার মো. আরিফুজ্জামান, মোহাম্মদ রুকনুজ্জামান, মো. এনামুল হক, ফররুখ আহাম্মদ, মো. রওশন আলম, আইএফআইসি ব্যাংক নয়াপল্টন শাখার এলসি ওপেনিং পরিদর্শন কর্মকর্তা মো. মেহেদি হোসেন, ব্রাঞ্চ ম্যানেজার কাজী নওশাদুজ্জামান, ব্যাংক হিসাব খোলার সময় আবদুল মোতালেবকে খোরশেদ আলম হিসেবে পরিচয় ও শনাক্তকারী শহীদুল আলম, মিরর ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী দিদারুল আলম টিটু প্রমুখ। ১৫টি পৃথক মামলায় ১১ জনকে আসামি করা হয়েছে।

এসবি এক্সিম বাংলাদেশের মামলার আসামিরা হলেনÑপ্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী মো. শাহজাহান বাবলু, বাংলাদেশ কর্মাস ব্যাংক লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুহুল কুদ্দুস মোহাম্মদ ফোরকান, অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাফর আলম, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী মো. রেজাউল করিম, সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও শাখা ব্যবস্থাপক আফজাল হোসেন খান, সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও বিভাগীয় প্রধান ফকির নাজমুল আলম, সিনিয়র এক্সিকিউটিভ অফিসার মো. রফিকুল ইসলাম, মো. শাহিনুজ্জামান, অফিসার মোহাম্মদ জামাল হোসেন, সামেয়া ট্রেডিং করপোরেশন সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের স্বত্বাধিকারী মুহাম্মদ আশরাফুল মাওলা চৌধুরী, জামান এন্টারপ্রাইজ সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের স্বত্বাধিকারী শেখ আসাদুজ্জামান মিন্টু ও সৈকত এন্টারপ্রাইজ সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের স্বত্বাধিকারী মো. নুর হোসেন।

হেনান ও এগ্রো বিডির পৃথক মামলার এজাহারে বলা হয়, ২০১৬ ও ২০১৭ সালে মেসার্স হেনান আনহুই এগ্রো এলসি ও মেসার্স এগ্রো বিডি অ্যান্ড জেপি নামে দুটি প্রতিষ্ঠানের নামে ১৭টি চালানে ৯০টি কনটেইনারে পণ্য আমদানি করা হয়। কনটেইনারে মূলধনি যন্ত্রপাতি ঘোষণা দেওয়া হলেও কায়িক পরীক্ষা করে সিগারেট, এলইডি টেলিভিশন, ফটোকপিয়ার মেশিন ও মদ পাওয়া যায়। এর মধ্যে হেনান আইনহুই’র ঠিকানা দেওয়া হয় ঢাকার খিলক্ষেত, ডমুনি এবং এগ্রো বিডি ঢাকার ঠিকানা দেওয়া হয় কেরানীগঞ্জের আবদুল্লাহপুর।

তদন্তে দেখা যায়, এ দুটি ঠিকানায় পোলট্রি ফিড উৎপাদনকারী কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব নেই। এছাড়া দুটি প্রতিষ্ঠান গত তিন বছরে ১৫টি এলসির মাধ্যমে ৭৮টি কনটেইনারে পণ্য আমদানি করেছে। তবে কী পণ্য আমদানি করেছে, তার তথ্য পাওয়া যায়নি। এগ্রো বিডি প্রতিষ্ঠানের সুপারভাইজার খোরশেদ আলমের নামে ২০১৬ ও ২০১৭ সালে ৯টি এলসিতে ৪৬টি কনটেইনারে পণ্য আমদানির আড়ালে ৪৩৩ কোটি ৬২ লাখ টাকা পাচার করা হয়েছে। আর হেনান আনহুই ২০১৬ ও ২০১৭ সালে ছয়টি এলসির মাধ্যমে ৩২টি কনটেইনার পণ্য আমদানির আড়ালে পাচার করেছে ৪৪০ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। দুই প্রতিষ্ঠানের যেমন অস্তিত্ব নেই, তেমনি এলসি খোলা থেকে শুরু করে পণ্য খালাস প্রতিটি পর্যায়ে জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। ব্যাংক হিসাব খোলা থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রে ব্যাংক কর্মকর্তাদের সহায়তায় এ জালিয়াতি করা হয়েছে বলে এজাহারে বলা হয়।

এসবি এক্সিম বাংলাদেশের মামলার এজাহারে বলা হয়, ঝিনাইদহের প্রতিষ্ঠানটি কমার্স ব্যাংকের সহায়তায় মাটির তৈরি টেরাকোটা রফতানির নামে প্রায় ৯২ কোটি ৪৩ লাখ টাকা পাচার করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি রফতানির উদ্দেশ্যে এলসি ব্যাংকে এলসি খোলে, কিন্তু পণ্য রফতানি করেনি। ভুয়া রফতানির কাগজপত্র তৈরি করে। রফতানির নামে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তা বিভিন্ন ব্যাংককে জমা ও সহযোগী প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করে। এছাড়া জালিয়াতি করে রফতানি বিলের বিপরীতে ১৯৮ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। পরে এসব টাকা অন্য প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করেছে। u

সর্বশেষ..