দিনের খবর প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

দুই বছরে খোলাবাজারে বন্ডের কাঁচামাল বিক্রি ৪৯৬ প্রতিষ্ঠানের

রহমত রহমান: গাজীপুরের কোনাবাড়ী এলাকার পোশাক খাতের প্রতিষ্ঠান এআরএইচ নিট কম্পোজিট লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি ২০১৪ সালে বন্ড লাইসেন্স পায়। কাঁচামাল (কাপড়) আমদানি করলেও কোনো পণ্য রপ্তানি করা হয়নি। বছরের পর বছর এসব কাঁচামাল খোলাবাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। এমনকি প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব নেই। সরেজমিন পরিদর্শনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

## বন্ডেড সুবিধা অপব্যবহারের তালিকায় শীর্ষে ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত গাজীপুরের খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি ২০১৮ সালে পরিদর্শনে দেখা যায়, বন্ডেড ওয়্যারহাউসে কাঁচামাল নেই। সব কাঁচামাল খোলাবাজারে বিক্রি করে দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এর মাধ্যমে ১৪ কোটি টাকার শুল্ককর ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। শুধু এআরএইচ নিট কম্পোজিট আর খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড নয়, দুই অর্থবছরে ৪৯৬টি প্রতিষ্ঠান বন্ড সুবিধার কাঁচামাল দেশীয় বা খোলাবাজারে বিক্রি করে দিয়েছে। সম্প্রতি এনবিআরের শুল্ক: রপ্তানি ও বন্ড শাখার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটি এনবিআর থেকে অর্থমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হয়েছে।

এনবিআর সূত্র জানায়, রপ্তানিকে উৎসাহ দিতে মূলত বন্ডেড সুবিধা দিচ্ছে সরকার। পণ্য রপ্তানি করার শর্তে পোশাক, সুতা, এক্সেসরিজসহ কয়েকটি খাতের প্রতিষ্ঠানকে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান শর্ত ভঙ্গ করে শুল্কমুক্ত সুবিধার কাঁচামাল দেশীয় বাজার বা খোলাবাজারে বিক্রি করে দিচ্ছে। বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে আসছে। এনবিআরের দুই বন্ড কমিশনারেট ২০১৮-১৯ ও ২০১৯-২০ অর্থবছর ৪৯৬টি প্রতিষ্ঠানের খোলাবাজারে কাঁচামাল বিক্রির প্রমাণ পেয়েছে। এর মধ্যে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা, লাইসেন্স সাময়িক স্থগিত, অর্থদণ্ড এমনকি লাইসেন্স বাতিলও করা হয়েছে।

## দুই বছরে অপব্যবহারের দায়ে ৪৭৫টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৮-১৯ ও ২০১৯-২০ অর্থবছর বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা ব্যবহার করে আমদানি করা কাঁচামাল দেশীয় বাজারে বিক্রি করে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে ৪৯৬টি। এর মধ্যে ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট ৪১৮টি প্রতিষ্ঠানের দেশীয় বাজারে কাঁচামাল বিক্রির রহস্য উদ্ঘাটন করেছে। এর মধ্যে ২০১৮-১৯ অর্থবছর ১১৯টি ও ২০১৯-২০ অর্থবছর ২৯৯টি। চট্টগ্রাম কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট ৭৮টি প্রতিষ্ঠানের দেশীয় বাজারে কাঁচামাল বিক্রির রহস্য উদ্ঘাটন করেছে। এর মধ্যে ২০১৮-১৯ অর্থবছর ৪৩টি ও ২০১৯-২০ অর্থবছর ৩৫টি।

২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০ শনিবার দৈনিক শেয়ার বিজ পত্রিকার লিড নিউজ

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বন্ডের কাঁচামাল খোলাবাজারে বিক্রির দায়ে দুই অর্থবছরে ৪৭৫টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের ৪০৭টি প্রতিষ্ঠান, যার ২৫টি ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ও ৩৮২টি ২০১৯-২০ অর্থবছরে। চট্টগ্রাম কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের ৬৮টি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে ২০১৮-১৯ অর্থবছর ৪১টি ও ২০১৯-২০ অর্থবছর ২৭টি প্রতিষ্ঠান। 

## ৩৭৮টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে, আর নিষ্পত্তি হয়েছে ১৫৭টি

এনবিআর সূত্রমতে, বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান বন্ড সুবিধায় কাঁচামাল আমদানি করে পণ্য উৎপাদন না করেই সরাসরি খোলাবাজারে বিক্রি করে দিয়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠান কাস্টমস হাউস থেকে খালাস নেওয়ার পর সরাসরি খোলাবাজরে বিক্রি করে দিয়েছে। আবার কিছু প্রতিষ্ঠান নিজস্ব বন্ডেড ওয়্যারহাউস থেকে খোলাবাজারে বিক্রি করে দেয়। অনেক প্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল রাস্তা থেকে, আবার কিছু কাঁচামাল বিক্রি করে দেওয়ার সময় বন্ড কমিশনারেট হাতেনাতে আটক করেছে। আবার অনেক প্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষা করে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠান যে পরিমাণ কাঁচামাল আমদানি করেছে সে পরিমাণ পণ্য রপ্তানি করেনি। কাঁচামাল খোলাবাজারে বিক্রির মাধ্যমে অপব্যবহারের দায়ে এসব প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিস জারি, বিআইএন লক, লাইসেন্স সাময়িক স্থগিত করা হয়েছে। অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। আবার কিছু প্রতিষ্ঠানকে শুল্ককর পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সেক্ষেত্রে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই অর্থবছর ৩৭৪টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের দায়ে মামলা করা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের ২৯৬টি প্রতিষ্ঠান। যার মধ্যে ২০১৮-১৯ অর্থবছর ৯০টি ও ২০১৯-২০ অর্থবছর ১০৬টি প্রতিষ্ঠান। চট্টগ্রাম কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের ৭৮টি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে ২০১৮-১৯ অর্থবছর ৪৩টি ও ২০১৯-২০ অর্থবছর ৩৫টি প্রতিষ্ঠান। ৩৭৪টি মামলার মধ্যে ১৫৭টি মামলা ফাঁকি দেওয়া রাজস্ব ও জরিমানা পরিশোধ করার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়েছে। ২১৭টি মামলা চলমান রয়েছে। নিষ্পত্তি করা মামলার মধ্যে ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটে ২০১৮-১৯ অর্থবছর ২৭টি ও ২০১৯-২০ অর্থবছর ৭৩টি। আর চট্টগ্রাম কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটে ২০১৮-১৯ অর্থবছর ৩০টি ও ২০১৯-২০ অর্থবছর ২৭টি। চলমান ২১৭টি মামলার মধ্যে ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটে ২০১৮-১৯ অর্থবছর ৬৩টি ও ২০১৯-২০ অর্থবছর ১৩৩টি। চট্টগ্রাম কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটে ২০১৮-১৯ অর্থবছর ১৪টি ও ২০১৯-২০ অর্থবছর সাতটি।

এ বিষয়ে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা শেয়ার বিজকে বলেন, খোলাবাজারে কাঁচামাল বিক্রির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থা নেওয়া হয়েছে। অভিযান জোরদার করা হয়েছে। গত দুই বছর বহু প্রতিষ্ঠানের ওয়্যারহাউস ও রাস্তা থেকে বন্ডেড কাঁচামাল জব্দ করা হয়েছে। লাইসেন্স সাময়িক স্থগিত, বিআইএন লক, জরিমানা এমনকি লাইসেন্স বাতিলও করা হয়েছে। ফলে গত দুই বছরে খোলাবাজারে বন্ডেড কাঁচামাল কিছুটা হলেও কমেছে বলে জানান তিনি।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..