প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

কৌশলগত অংশীদারে আগ্রহী নয় কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠান

মুস্তাফিজুর রহমান নাহিদ ও পলাশ শরিফ: বিশ্বের বিভিন্ন স্টক এক্সচেঞ্জ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে ভিনদেশি ও খ্যাতনামা ব্যবসায়িক গ্রুপ বা অন্য কোনো স্টক এক্সচেঞ্জকেই সঙ্গে নিয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম দেখা যায়। দুই স্টক এক্সচেঞ্জের কোনোটির প্রতিই আগ্রহী নয় বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো। বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সাড়া না পেয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ‘ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ’ (আইসিবি)-কে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে বেছে নিয়েছে ‘চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ’ (সিএসই)। অন্যদিকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কৌশলগত অংশীদার খুঁজে না পেয়ে বিএসইসির কাছে আরও এক বছর সময় চেয়েছে ‘ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ’ (ডিএসই)।

তথ্যানুসন্ধানে মিলেছে, প্রতিবেশী দেশ ভারতের ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ অব ইন্ডিয়ার (এনএসই) কৌশলগত অংশীদার যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানি ‘সিএমই গ্রুপ’। ওই ব্যবসায়িক গ্রুপের শিকাগো মার্কেন্টাইল এক্সচেঞ্জ (সিএমই), কানসাস সিটি বোর্ড অব ট্রেড, শিকাগো বোর্ড অব ট্রেড, নিউইয়র্ক মার্কেন্টাইল এক্সচেঞ্জ ও এসঅ্যান্ডপি ডাও জোনস ইনডিকসেসসহ পাঁচটি কোম্পানি পুঁজিবাজারকেন্দ্রিক ফাইন্যান্সিয়াল ইনডেক্স, ডেরিভেটিভ, ফিউচার ও অপশন মার্কেট এবং ক্লিয়ারিং কার্যক্রম পরিচালনার সঙ্গে জড়িত। ভারতের মুম্বাই স্টক এক্সচেঞ্জের কৌশলগত অংশীদার ‘ইউরেক্স গ্রুপ’। ওই গ্রুপের ছয় কোম্পানি ইউরেক্স এক্সচেঞ্জ, ইউরোপিয়ান এনার্জি এক্সচেঞ্জ (ইইএক্স), ইউরেক্স ক্লিয়ারিং, ইউরেক্স বন্ড ও ইউরেক্স রেপোও পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত। মুম্বাই স্টক এক্সচেঞ্জের পাশাপাশি ইউরেক্স গ্রুপ ভিয়েনা, তেল-আবিব, আইরিশ স্টক এক্সচেঞ্জের কৌশলগত অংশীদার হিসেবেও কাজ করছে।

অন্যদিকে চীনের সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জের (এসএসই) কৌশলগত অংশীদার ফ্রান্সে স্টক মার্কেট পরিচালনাকারী ‘ইউরোনেক্সট গ্রুপ’। ‘ইউরোনেক্সট প্যারিস’ নামে পরিচিত ওই মার্কেটে ইক্যুইটি ও ডেরিভেটিভস প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোম্পানি তালিকাভুক্ত। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নাসডাক স্টক এক্সচেঞ্জ ২০১৩ সালে ইস্তানবুলের স্টক এক্সচেঞ্জের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে (ইস্তানবুল বোরসে) চুক্তি করে। চুক্তির মূল লক্ষ্য ছিল, ইস্তানবুল স্টক এক্সচেঞ্জকে শক্তিশালী একটি মার্কেটে পরিণত হতে প্রয়োজনীয় সহায়তা করা। অন্যদিকে ইস্তানবুল বোরসে তাজিকিস্তানের তাজিকিস্তান স্টক এক্সচেঞ্জের কৌশলগত অংশীদার হিসেবে কাজ করছে।

শুধু ওই চারটি নয়, পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি স্টক এক্সচেঞ্জেই কৌশলগত অংশীদার হিসেবে বহুজাতিক কোম্পানি কিংবা অপর স্টক এক্সচেঞ্জকে বেছে নিয়েছে, যাতে উভয়পক্ষ যৌথভাবে কাজ করে স্টক এক্সচেঞ্জকে তথ্যপ্রযুক্তিসহ সবদিক দিয়ে এগিয়ে রাখতে পারে।

কৌশলগত অংশীদার ইস্যুতে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) মালিকানা থেকে ব্যবস্থাপনা পৃথক (ডি-মিউচুয়ালাইজেশন) করার পরবর্তী তিন বছরের মধ্যে কৌশলগত বিনিয়োগকারী খুঁজে বের করার কথা ছিল। এজন্য দায়িত্ব নেয় যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আর্নেস্ট অ্যান্ড ইয়ং (ইঅ্যান্ডওয়াই)। এরই মধ্যে ডিএসইর কৌশলগত অংশীদার হতে বিশ্বের অন্যতম প্রধান পুঁজিবাজার নাসডাক, বিশ্বব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি), কমনওয়েলথ ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন (সিডিসি), সুইডেনভিত্তিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ব্রামার্স অ্যান্ড পার্টনার্স, জার্মানিভিত্তিক কেএফডব্লিউ, হংকংভিত্তিক কিংসওয়ে ক্যাপিটাল ও দেশীয় প্রতিষ্ঠান স্কয়ারের সমন্বয়ে গঠিত কনসোর্টিয়াম আগ্রহ প্রকাশ করে। কিন্তু তারপরও নির্ধারিত সময়ে প্রক্রিয়াটি শেষ হয়নি। শেষ মুহূর্তে এসে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে আরও এক বছর সময় চেয়েছে ডিএসই।

এ বিষয়ে সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ শেয়ার বিজকে বলেন, ‘যোগ্য কৌশলগত অংশীদার খুঁজে না পেলে ডি-মিউচুয়ালাইজেশন পূর্ণতা পাবে না; বরং এর মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। তাই ডিএসইকে সতর্কতার সঙ্গে অংশীদার খুঁজতে হবে। তবে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতি আস্থা সংকটের কারণে বিদেশিরা আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর আস্থা অর্জনে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও বাজারের দুর্বল দিকগুলো চিহ্নিত করে তা কাটিয়ে উঠতে হবে। কারণ আস্থা না ফিরলে যোগ্য কৌশলগত অংশীদার পাওয়া যাবে না।’

উল্লেখ্য, ডিএসইর বর্তমান পরিশোধিত মূলধন এক হাজার ৮০৩ কোটি টাকা। সেই হিসাবে কৌশলগত অংশীদারদের কাছে প্রায় ৪৫১ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করবে ডিএসই। অন্যদিকে সিএসই অভিহিত মূল্যে প্রায় ১৫৮ কোটি ৬৩ লাখ টাকার শেয়ার কৌশলগত অংশীদার আইসিবির কাছে বিক্রি করবে। এর বাইরে উভয় স্টক এক্সচেঞ্জ আরও ৩৫ শতাংশ শেয়ার তালিকাভুক্তির মাধ্যমে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করবে।

অন্যদিকে তিন বছর ধরে চেষ্টা করেও বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সাড়া পায়নি সিএসই। বাধ্য হয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান আইসিবি-কেই বেছে নিয়েছে সিএসই। চলতি বছরের নভেম্বরে কৌশলগত বিনিয়োগকারী হতে আগ্রহীদের কাছ থেকে আগ্রহপত্র চেয়ে বিজ্ঞাপন দিয়েছিল সিএসই। পাশাপাশি বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগও করেছে স্টক এক্সচেঞ্জটি। শেষ মুহূর্তে আইসিবির সঙ্গে চুক্তি করেছে সিএসই। আইসিবির বোর্ডসভায় অনুমোদনের পরই বিষয়টি চূড়ান্ত হবে।

এ বিষয়ে আলাপকালে সিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুর রহমান মজুমদার শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আমি মনে করি দেশি প্রতিষ্ঠান আমাদের দেশের পুঁজিবাজার, অর্থনৈতিক গতিপ্রকৃতি ও মানি মার্কেটের সার্বিক অবস্থা ভালো বুঝবে। সেক্ষেত্রে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের চেয়ে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এগিয়ে রয়েছে। তাছাড়া বাইরের কোনো প্রতিষ্ঠান কৌশলগত বিনিয়োগকারী হলে তারা যে কোনো সময় মুনাফা করে অর্থ নিয়ে চলে যেতে পারে। সেই অর্থটাও আমাদের অর্থনীতিতে কোনো ভূমিকা রাখবে না।’