প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

দুধের বাজারে এখনও নেতৃত্বে মিল্ক ভিটা

নিজস্ব প্রতিবেদক :১৯৭৩ সালে যাত্রা শুরু, এরপর পেরিয়ে গেছে ৪৮ বছর। তবে দেশের দুধের বাজারে এখনো নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে গড়ে ওঠা মিল্ক ভিটা। রাষ্ট্রায়ত্ত বিভিন্ন সংস্থা বেসরকারি খাতের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে পিছিয়ে পড়লেও এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হয়ে আছে মিল্ক ভিটা। দেশের বাজারে প্রায় ৭০ শতাংশ তরল দুধ সরবরাহ করে ধরে রেখেছে শীর্ষস্থান।

মূলত স্বাধীনতার পরে দেশের কৃষক-শ্রমিকদের ভাগ্যোন্নয়নে ও দুধের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিতে ভারতের ‘আমুল’-এর পদ্ধতি অনুসরণে বাংলাদেশে দুগ্ধশিল্প গড়ে তোলার জন্য নির্দেশনা প্রদান করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার নির্দেশের পর জাতিসংঘ উন্নয়ন সংস্থা (ইউএনডিডি) ও ডেনমার্কের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন এজেন্সি ড্যানিডার সহায়তায় দুই পরামর্শক যথাক্রমে মি. ক্যাসট্রপ ও মি. নেলসন কর্তৃক এ দেশের দুগ্ধশিল্প নিয়ে স্টাডি করা হয়।

‘সমবায় দুগ্ধ প্রকল্প’ নামে ১৯৭৩ সালে একটি দুগ্ধশিল্প উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। দুগ্ধ উৎপাদনকারী কৃষকদের স্বার্থ সংরক্ষণ করে দুগ্ধ উৎপাদন বৃদ্ধির নিমিত্তে সরকারের ১৩ কোটি ১২ লাখ টাকা ঋণ সহায়তায় দেশের পাঁচটি দুগ্ধ এলাকায় দুটি মৌলিক আদর্শ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কারখানা স্থাপন করা হয়। পরে নাম পরিবর্তন করে ১৯৭৭ সালে ‘বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় ইউনিয়ন লিমিটেড’ নামকরণ করা হয়।

খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, দুগ্ধ খাতে এক দশক আগেও কোম্পানি ছিল হাতে গোনা কয়েকটি। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ডেইরি শিল্পে ১৫টি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ এসেছে দেড় হাজার কোটি টাকারও বেশি। তবে দেশে দুধের বাজারে শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে এখনো মিল্ক ভিটার চাহিদা অন্য কোম্পানিগুলোর তুলনায় অনেক বেশি।

মিল্ক ভিটা ছাড়াও বাজারে যে কোম্পানিগুলো রয়েছেÑব্র্যাক ডেইরি অ্যান্ড ফুড প্রজেক্টের আড়ং ডেইরি, আকিজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজের ফার্ম ফ্রেশ মিল্ক, প্রাণ ডেইরির প্রাণ মিল্ক, জিহান মিল্ক অ্যান্ড ফুড প্রসেসিংয়ের জিহান, রংপুর ডেইরির আরডি, শিলাইদহ ডেইরির আল্ট্রা, ইগলু ডেইরির ইগলু, আফতাব মিল্ক অ্যান্ড মিল্ক প্রডাক্টসের আফতাব, ইছামতি ডেইরি অ্যান্ড ফুড প্রডাক্টসের পিউরা, পূর্ব বাংলা ডেইরি ফুড ইন্ডাস্ট্রিজের আকরান, ড্যানিশ ডেইরি ফার্মের আইরান, আমেরিকান ডেইরির মুউ, উত্তরবঙ্গ ডেইরির মিল্ক ফ্রেশ ও ওয়ান মিল্ক প্রভৃতি। তবে মিল্ক ভিটা এখনো শীর্ষে।

তথ্যমতে, মিল্ক ভিটার নিজস্ব জমির পরিমাণ ৯৯ দশমিক ৩০ একর। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির দুগ্ধ শীতলীকরণ কেন্দ্র রয়েছে ৫৬টি, আর প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা রয়েছে তিনটি। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন এক হাজার ৯০৭ জন। আর কেন্দ্রীয় সমিতি ৮১টি, প্রাথমিক সমিতি রয়েছে তিন হাজার ৪৭৪টি এবং এসব সমিতির সদস্য এক লাখ ৩১ হাজার ৩৬৮ জন। এছাড়া মিল্ক ভিটার আরও ১৮টি দুগ্ধ-শীতলীকরণ কারখানা প্রস্তাবিত রয়েছে।

মিল্ক ভিটা একটি জাতীয় সমবায় সমিতির অর্থ-উপার্জনকারী উদ্যোগ। এতে সরকারের ভাগ ৫৫ শতাংশ এবং ৪৫ শতাংশ সমবায়ীদের। ৪১টি জেলার ১৩৭টি উপজেলার ৪৯০টি ইউনিয়নের দুই হাজার ৩১৯টি গ্রামে মিল্ক ভিটার কার্যক্রম সম্প্র্রসারিত। ইউরোপে তৈরি দামি মেশিনের সাহায্যে আধুনিক পন্থায় দুধ প্রক্রিয়াজাতকরণ, শীতলকরণ, কোয়ালিটি কন্ট্রোল এবং প্যাকেটজাত করা হয়। দুগ্ধজাত খাবারগুলো তৈরি করা হয় আধুনিক মেশিন ব্যবহার করে এবং অত্যন্ত স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে। দুধ ও দুধজাত পণ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাত ও বাজারজাতকরণের মাধ্যমে দেশের ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষকদের আর্থসামাজিক উন্নয়ন করাই মিল্ক ভিটার প্রধান উদ্দেশ্য। পাশাপাশি ভোক্তার পুষ্টিমানের নিশ্চয়তা দেয়ার বিষয়টি সবসময়ই বিবেচনায় থাকে। গত অর্থবছর মিল্ক ভিটার সমিতি বিভাগের দুগ্ধ সংগ্রহের পরিমাণ ছিল চার কোটি ১১ লাখ লিটার।

বর্তমানে মিল্ক ভিটার তিনটি প্রকল্পের কাজ চলছে। এগুলো হলো সিরাজগঞ্জ বাঘাবাড়িঘাটে গুঁড়োদুধ উৎপাদন কারখানা স্থাপন প্রকল্প, দুগ্ধ উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে চট্টগ্রামের পটিয়ায় দুগ্ধ কারখানা স্থাপন প্রকল্প এবং বৃহত্তর ফরিদপুরের চরাঞ্চল ও পার্শ^বর্তী এলাকায় গবাদিপশুর জাত উন্নয়ন ও দুগ্ধের বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিতকরণ কারখানা স্থাপন প্রকল্প। আরও নতুন ছয়টি প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

পাস্তুরিত দুধ ছাড়া মিল্ক ভিটার অন্যান্য পণ্যের কারখানাও রয়েছে। এর মধ্যে পাউডার প্লান্ট (গুঁড়োদুধ উৎপাদন), ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট, কনডেন্সড মিল্ক প্লান্ট, ইউএইচটি মিল্ক প্লান্ট, ক্যান্ডি ও চকোলেট প্লান্ট ও লাবাং উৎপাদন কারখানা উল্লেখযোগ্য।