প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

দুবছরের মধ্যে সর্বনিম্ন দর গ্রামীণফোনের

বকেয়া নিয়ে বিটিআরসির সঙ্গে টানাপড়েন

পলাশ শরিফ: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত টেলিযোগাযোগ খাতের একমাত্র কোম্পানি গ্রামীণফোন। পাওনা নিয়ে টেলিকম খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) সঙ্গে পুঁজিবাজারের সবচেয়ে বড় পুঁজির বহুজাতিক ওই কোম্পানিটির টানাপড়েন চলছে। এর জেরে কোম্পানিটির লাইসেন্স বাতিলের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এ কারণে কয়েক মাস ধরেই দর হারাচ্ছে গ্রামীণফোন। সর্বশেষ গত তিন কার্যদিবস ধরে টানা দর কমছে কোম্পানিটির, যার প্রভাব ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) দৈনিক লেনদেনের ওপরেও পড়ছে।
তথ্যমতে, ডিএসইতে চলতি বছরের ৪ আগস্ট গ্রামীণফোনের প্রতিটি শেয়ার ৩৩৭ টাকা ১০ পয়সায় লেনদেন হয়েছিল। গতকাল ওই কোম্পানির প্রতিটি শেয়ার ৩১০ টাকায় লেনদেন হয়েছে। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে কোম্পানিটির শেয়ারদর ২৭ টাকা ১০ পয়সা বা আট শতাংশের বেশি কমেছে। শুধু সর্বশেষ এক মাসেই নয়, গত তিন মাসে প্রায় ১৩ শতাংশ দর হারিয়েছে কোম্পানিটি। চলতি বছরের এপ্রিলের প্রথম কার্যদিবসে ৪১৭ টাকায় উঠেছিল গ্রামীণফোনের শেয়ারদর। এরপর থেকেই কোম্পানিটির শেয়ারদর আশঙ্কাজনক হারে কমছে। গত চার মাসে প্রায় ২৫ শতাংশ দর হারিয়েছে কোম্পানিটি। আর এর মধ্য দিয়ে ডিএসইতে গ্রামীণফোনের শেয়ারদর এখন দুবছরের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে।
চলতি বছরের এপ্রিলে বড় অঙ্কের বকেয়ার তথ্য সামনে আসার পর থেকেই পুঁজিবাজারে গ্রামীণফোন নিয়ে টানাপড়েন শুরু হয়। এরপর থেকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিভিন্ন পদক্ষেপের খবরে দর হারাচ্ছে কোম্পানিটি। বকেয়া পরিশোধ না করলে গ্রামীণফোনের লাইসেন্স বাতিল হতে পারে এমন খবরে কয়েক সপ্তাহ ধরে গ্রামীণফোনের শেয়ারদর আশঙ্কাজনক হারে কমছে। আর বড় পুঁজির কোম্পানির দরপতনের প্রভাব পড়ছে পুঁজিবাজারের লেনদেন-সূচকের ওপর।
গত ১ এপ্রিল ডিএসইতে মোট প্রায় ৪২৩ কোটি ৯৭ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছিল। এর বিপরীতে গতকাল ডিএসইর মোট লেনদেন ছিল প্রায় ৩৩২ কোটি ৪০ লাখ টাকা। অর্থাৎ চার মাসের ব্যবধানে ডিএসইর লেনদেন ২১ দশমিক ৫৯ শতাংশ কমেছে। একইভাবে বাজার সূচকেও নেতিবাচক প্রবণতা দৃশ্যমান। এপ্রিলের প্রথম কার্যদিবসের ডিএসই’র সার্বিক সূচক সাড়ে পাঁচ হাজার পয়েন্টে অবস্থান করছিল। চার মাসের ব্যবধানে ওই সূচক ৪৩২ পয়েন্ট বা সাত দশমিক ৫৮ শতাংশ কমে পাঁচ হাজার ৭০ দশমিক ৬৮ পয়েন্টে নেমেছে। সরকারের তরফ থেকে বেশকিছু প্রণোদনার পরও পুঁজিবাজারে নেতিবাচক চিত্রের জন্য গ্রামীণফোনের দরপতনকেও অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পুঁজিবাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আবু আহমেদ শেয়ার বিজকে বলেন, ‘২০০৯ সালে গ্রামীণফোন পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে। এরপর আর কোনো বহুজাতিক কোম্পানি পুঁজিবাজারে আসেনি। পুঁজিবাজারে গ্রামীণফোনের অবস্থানও বেশ শক্ত। পুঁজিবাজারের গতিবিধিও অনেক সময় ওই কোম্পানির ওপর নির্ভর করে। তাই গ্রামীণফোনের বিরুদ্ধে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিটিআরসির পক্ষ থেকে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির সঙ্গে পরামর্শ করা উচিত ছিল। এ বিষয়ে আইনি বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। তারপরও বিটিআরসি একতরফাভাবে পদক্ষেপ নেওয়ায় পুঁজিবাজারের ওপর তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। দুই নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতায় কোম্পানিটির ৪০ থেকে ৫০ হাজার সাধারণ বিনিয়োগকারী যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকেও খেয়াল রাখা দরকার ছিল।’
প্রাপ্ত তথ্যমতে, বিটিআরসির পক্ষ থেকে নিরীক্ষক নিয়োগ দিয়ে গ্রামীণফোনের কার্যক্রম নিরীক্ষার পর গত এপ্রিলে প্রায় ১২ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা বকেয়া পরিশোধের জন্য গ্রামীণফোনকে নোটিস দেয় বিটিআরসি। বকেয়া অর্থ পরিশোধের জন্য অপারেটরটিকে দুই সপ্তাহ সময় বেঁধে দেয় বিটিআরসি। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবি করা পাওনা পরিশোধ না করায় গত ২২ মে কমিশন বৈঠকে কোম্পানিটির বিরুদ্ধে অপারেশনাল ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয় বিটিআরসি। যার অংশ হিসেবে বিটিআরসি থেকে এনওসি বন্ধ করে দেওয়া, এমএনপি পোর্ট ইন বন্ধ বা সীমিত করা, নতুন গ্রাহক নেওয়া বন্ধ বা সীমিত করে দেওয়া, ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে বা আইজিডব্লিউ প্রান্ত থেকে ব্যান্ডউইড্থ বন্ধ বা সীমিত করা, আইজিডব্লিউ প্রান্ত থেকে ইনকামিং বা আউটগোয়িং কল বন্ধ বা সীমিতকরণ, ইন্টার কানেকশন এক্সচেঞ্জের (আইসিএক্স) মাধ্যমে বন্ধ বা সীমিত করে দেওয়া, নেটওয়ার্ক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম বা এনএমএসের মাধ্যমে সারা দেশ বা নির্দিষ্ট এলাকায় থ্রিজি ও ফোরজি নেটওয়ার্ক বন্ধের বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। নির্ধারিত সময়ে পাওনা টাকা না পেয়ে প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে গত ৪ জুলাই অপারেটরটির ব্যান্ডউইড্থ সীমিত করে দেয় বিটিআরসি। পরে ওই আদেশ প্রত্যাহার করে নতুন প্যাকেজ চালুর অনুমোদন (এনওসি) বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে গ্রামীণফোনের লাইসেন্স কেন বাতিল করা হবে না, তার ব্যাখ্যা চেয়ে বিটিআরসির পক্ষ থেকে নোটিস পাঠানোর বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন
ট্যাগ »

সর্বশেষ..