প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

দুর্লক্ষণের মাঝেও প্রাপ্তির তালিকা বড়

 

ইসমাইল আলী: বছরের শুরুর দিকেই বড় ধাক্কা হয়ে আসে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির খবর। বছরের শেষ পর্যন্ত আলোচনার কেন্দ্রেই ছিল এ বিষয়টি। পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের আরও কিছু অনিয়মও উঠে আসে এ বছর। তবে ‘মর্নিং সোজ দ্য ডে’ কথাটা মিথ্যা প্রমাণ করে বছরের মাঝামাঝি সামষ্টিক অর্থনীতিতে মেলে সুখবর। প্রথমবারের মতো লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি হারে অর্জন হয় জিডিপি প্রবৃদ্ধি। আর বছরের শেষ ভাগে এসে দারিদ্র্যবিমোচনে মেলে বিশ্বব্যাংকের স্বীকৃতি। সব মিলিয়ে ২০১৬ সালের আর্থসামাজিক চিত্র সরকারের জন্য সন্তোষ বয়ে আনে।

সাফল্যের মাঝেও বছরের শেষভাগে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রক্রিয়ায় ব্যবসায়ী ও সাধারণ জনগণের মধ্যে অসন্তোষ ছড়ায়। এছাড়া বহু আলোচনার পরও জ্বালানি তেলের দাম আশানুরূপ না কমায় ভোক্তারা বঞ্চিত হন। আর রেকর্ড উৎপাদনের পরও বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার সামঞ্জস্যহীন উন্নয়নে কমেনি লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি। নতুন বছরে এসব বিষয় অর্থনীতির জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন ব্যবসায়ীরা।

এদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও তেজিভাব দেখা গেছে বছরজুড়েই। তবে রেমিট্যান্সে কিছুটা উত্থান-পতন ভবিষ্যতের জন্য কিছুটা শঙ্কা হিসেবেই দেখছেন অর্থনীতিবিদরা।

২০১৬ সালকে মিশ্র অবস্থার বছর বলে মনে করেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরী। তিনি শেয়ার বিজকে বলেন, ২০১৬ সালে কিছু ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেলেও কিছু ক্ষেত্র আগের জায়গাই রয়ে গেছে। মূলত সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকগুলো ২০১৫’র দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠায় কিছুটা শক্তিশালী মনে হয়েছে। তবে মূলভিত্তি এখনও আগের অবস্থায় রয়েছে। রফতানি, রেমিট্যান্স ওঠানামা করেছে। তবে বিনিয়োগে বিশেষত বেসরকারি খাত অনেক পিছিয়ে আছে। অবকাঠামো দুর্বলতাও রয়ে গেছে। সর্বোপরি ইতিবাচক অবস্থা থাকলেও উচ্ছ্বসিত হওয়ার সময় এখনও আসেনি।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, অর্থনীতির সামগ্রিক চিত্রে সবচেয়ে বড় অর্জনের বছর হয়ে আছে ২০১৬ সাল। কারণ গত পাঁচ অর্থবছরে কোনো বারই প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। তবে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৭ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয় ৭ দশমিক ১১ শতাংশ। আর চলতি অর্থবছর প্রবৃদ্ধির ৭ দশমিক ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা ধরা হলেও তা সাড়ে ৭-এ গিয়ে ঠেকবে বলে ধারণা করছে পরিকল্পনা  মন্ত্রণালয়। যদিও প্রবৃদ্ধির হার ও এর প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। কারণ প্রবৃদ্ধি বাড়লেও কর্মসংস্থানে তার প্রভাব নেই।

প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি মূল্যস্ফীতিতেও সুখবর ছিল বছরজুড়েই। নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের পর তা লাগামছাড়া হওয়ার ধারণা করেছিল অনেকেই। তবে সে ধারণা ভুল প্রমাণ করে গত জুন শেষে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় ৬ শতাংশের কাছাকাছি। নভেম্বর শেষে তা আরও কমে নেমে গেছে সাড়ে ৫-এ।

চলতি বছর উন্নয়নের দিকেও সরকার গুরুত্বসহকারে নজর রাখে। এজন্য চলতি বছর প্রকল্প অনুমোদন রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ব্যয়ের প্রকল্প পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ রয়েছে। রাশিয়ার অর্থায়নে এটি বাস্তবায়নে ব্যয় হবে প্রায় এক লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা।

এদিকে ২০২১ সালে রফতানি ৬০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রায় মোটামুটি ভালোভাবেই এগোচ্ছে বাংলাদেশ। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৯ দশমিক ৭২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি করে এ খাত। চলতি অর্থবছরের শুরুতে কিছুটা হোঁচট খেলেও গত দুই মাসে রফতানির প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক ধারায় ফিরেছে। নভেম্বর শেষে রফতানি প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৩ শতাংশ। এছাড়া আমদানি বৃদ্ধির ধারাও অব্যাহত রয়েছে চলতি বছরে।

২০১৫-১৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল (সংশোধিত) দেড় লাখ কোটি টাকা। তবে অর্জন এটিকে ছাড়িয়ে দাঁড়ায় এক লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকার বেশি। আর চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি হয় ১৮ শতাংশ। তবে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কিছুটা পিছিয়ে আছে রাজস্ব আদায়।

এত কিছুর পরও অর্থনীতিতে কিছু মলিন বিষয় উঠে আসে বছরজুড়েই। এর মধ্যে অন্যতম ছিল চলতি হিসাবে ঘাটতি। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে এ ঘাটতির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০ কোটি ৪০ লাখ ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ চার হাজার কোটি টাকার বেশি। যদিও গত বছর এ হিসাবে উদ্বৃত্ত ছিল। এর সঙ্গে জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে যুক্ত হয়েছে বাণিজ্যে ঘাটতি, যার পরিমাণ ছিল ২৩৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার। ফলে সার্বিকভাবে লেনদেন ভারসাম্যে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

৩২ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ স্বস্তি দিলেও চলতি বছর রেমিট্যান্স নিয়ে দুশ্চিন্তা বেড়েছে। গত আগস্ট থেকে ধারাবাহিকভাবে তা কমছে। নভেম্বরে রেমিট্যান্স প্রবাহ ১০০ কোটি ডলারের নিচে নেমে আসে।

সামষ্টিক অর্থনীতির চিত্র ভালো হলেও ব্যাংকিং খাতে বছরজুড়েই দেখা গেছে মুদ্রার উল্টো দিক। গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ ৮১ মিলিয়ন ডলার চুরি হয়। সাইবার অপরাধের ইতিহাসে যা ছিল নজিরবিহীন। মার্চে এটি প্রকাশের পর নানামুখী চাপে পদত্যাগ করেন তৎকালীন গভর্নর। এছাড়া ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতির কয়েকটি ঘটনা ঘটে এ বছর। তবে ব্যাংকঋণের সুদ হার কমে যাওয়ায় শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীরা এ খাত নিয়ে অনেকটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন।

ঋণের পাশাপাশি বছরজুড়ে কমেছে আমানতের সুদের হারও। এতে ব্যাংকের সঞ্চয়ের প্রতি আগ্রহ কমেছে কিছুটা আর বেড়েছে পুঁজিবাজারে। এতে জুনের পর থেকে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যায় বাজারে। গতকাল ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক পাঁচ হাজার পয়েন্ট ছাড়িয়ে গেছে। পাশাপাশি লেনদেনও বাড়ছে, গতকাল যা এক হাজার ২০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়।

তবে অর্থনীতিতে বড় শূন্যতা বিনিয়োগ না বাড়া ও অর্থ পাচারকে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ এ সময়ে বিনিয়োগ বাড়েনি আশানুরূপ। অথচ বিদেশে টাকা পাচার অনেক বেড়েছে। সর্বশেষ হিসাবে দেশ থেকে এক বছরে অর্থ পাচার হয়েছে প্রায় হাজার কোটি টাকা।

এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সাবেক সভাপতি ও স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন চৌধুরী বলেন, গত কয়েক বছরের তুলনায় ২০১৬ সাল অনেকটাই মসৃণ ছিল। রাজস্ব দুর্বলতা কাটিয়ে উঠে গত বছর সামগ্রিকভাবে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ইতিবাচক ছিল। তবে অবকাঠামোগত কিছু প্রতিবন্ধকতা আছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও জমি সমস্যাও দূর করা যায়নি। এক্ষেত্রে সরকারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার গতি আরও বাড়ানো প্রয়োজন। তা না হলে অর্থ পাচারকে বন্ধ করা কঠিন হবে।

বছরজুড়েই আন্তর্জাতিক বাজারে নিত্যপণ্যের দাম ছিল অনেক কম। চাল, গম, চিনি, চা, কফি, ভোজ্যতেল, লোহাসহ নিত্যপণ্যের দাম কমে পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনি¤œ পর্যায়েও নামে। কিন্তু ভোক্তারা এর কোনো সুফল পায়নি। দেশের বাজারে নিত্যপণ্যের দাম কমেনি বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেড়েছে।

অর্থনীতিতে সবচেয়ে হতাশা ছড়ায় জ্বালানি তেলের দাম। আন্তর্জাতিক বাজারে এর দাম কমেছে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি, যা ১১ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। তবে দেশে কমেছে নামমাত্র। ফলে সাধারণ মানুষ এর কোনো সুফল পায়নি। বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতেও বছরজুড়ে কোনো সুখবর ছিল না। বড় কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে আসেনি। জ্বালানিতেও নতুন কোনো উৎস যোগ হয়নি। অথচ আগস্টে গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু করা হয়, যা আগামী বছর কার্যকর করা হবে।

এদিকে কয়েক বছর ধরে কমছে দারিদ্র্যের হার। সাফল্যের এ স্বীকৃতি মেলে গত অক্টোবরে। এ উপলক্ষে ঢাকায় আসেন বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট কিম ইয়ং জিম। সে সময় আয়োজিত এক সম্মেলনে জানানো হয়, দারিদ্র্য পরিমাপে বিশ্বব্যাংকের নতুন মাপকাঠি ১ দশমিক ৯০ ডলার হিসেবে বাংলাদেশের দারিদ্র্য হার ১২ দশমিক ৯০ শতাংশ।

পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য ও জ্যেষ্ঠ সচিব ড. শামসুল আলম মনে করেন, ২০১৬ সালে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি সুস্থির, স্থিতিশীল ও ভালোভাবেই এগিয়েছে। তিনি বলেন, প্রবৃদ্ধি ও রিজার্ভ ভালো অবস্থায় ছিল। দারিদ্র্যবিমোচনে সাফল্য অব্যাহত আছে। মূল্যস্ফীতিও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ছিল। ফলে অর্থবছর হিসেবে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার প্রথম বছর বেশ ভালো অগ্রগতি হয়েছে।

তবে কিছু চ্যালেঞ্জ এখনও রয়ে গেছে বলে মনে করেন ড. শামসুল আলম। এর মধ্যে অন্যতম কৃষিতে বড় ধরনের রূপান্তর। এক্ষেত্রে উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি উৎপাদনের প্রতি ঝুঁকতে হবে। বড় আকারের খামার স্থাপন ও কৃষিভিত্তিক শিল্প স্থাপনে নজর দিতে হবে। এজন্য সরকার ও বেসরকারি খাত উভয়ের এগিয়ে আসা দরকার। তা না হলে কৃষিতে ভবিষ্যতে খুব বেশি উন্নতি করা যাবে।