সারা বাংলা

দূষণে ম্লান পদ্মার সৌন্দর্য

আসাদ নূর, রাজশাহী: ‘সর্বনাশা পদ্মা নদী, তোর কাছে শুধাই; বল আমারে তোর কি রে আর কূল কিনারা নাই …’। এককালে মানুষের বুক ভাঙার খেলায় সর্বনাশা তকমা লেগেছিল পদ্মার নামে। তখন আব্দুল লতিফের লেখা গানটি আব্দুল আলীমের কণ্ঠে জনপ্রিয় হয়েছিল।

পাল্টে গেছে সে দৃশ্যপট। পদ্মার সর্বনাশে উঠেপড়ে লেগেছে মানুষ। পদ্মাকে আর স্রোতস্বীনি বলা যায় না। পদ্মার সে রূপ আর নেই। পানি শুকিয়ে জেগেছে বিস্তীর্ণ চর। প্লাস্টিক, পলিথিন ও আবর্জনায় দূষিত হচ্ছে এর পরিবেশ। পদ্মা যেন এখন ময়লার ভাগাড়!

রাজশাহী শহরসংলগ্ন পদ¥ার পাড়ে প্রতিদিন ভিড় জমে হাজারো মানুষের। শহুরে জীবনের ক্লান্তি দূর করতে ও বুক ভরে নির্মল বাতাস নিতে মানুষ ছুটে যান পদ্মাপাড়ে। এটি রাজশাহীর অন্যতম বিনোদনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

পদ্মাপাড়কে বিনোদনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে উদ্যোগ নিয়েছে রাজশাহী সিটি করপোরেশন (রাসিক)। শহররক্ষা বাঁধজুড়ে বসার বেদি ও বিভিন্ন স্থাপনায় সাজানো হয়েছে পদ্মাপাড়। সম্প্রতি নগরীর সাহেববাজার-সংলগ্ন পাড়ে দুটি ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে। এর ওপর তৈরি করা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন গ্রাফিটি। নান্দনিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি পদ্মার পাড় ঘেঁষে হাঁটার সুবিধা বেড়েছে। এতে করে পদ্মামুখী হয়েছে বিনোদনপ্রেমীরা।

পদ্মাপাড়ে মানুষের এমন সমাগম কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে ছোট-বড় শত মুখরোচক খাবারের দোকান। পড়ন্ত বিকালে খোলামেলা পরিবেশে এসব দোকানের মুখরোচক খাবারের সঙ্গে প্রকৃতির নির্মল বাতাস নিতে প্রতিদিন দর্শনার্থীদের ভিড় জমে। মুখর হয় পুরো পদ্মাপাড়।

এসব মুখরোচক খাবার দোকানের বর্জ্য, দর্শনার্থীদের ব্যবহার করা প্লাস্টিক ও পলিথিন যথাস্থানে ফেলা বা সংরক্ষণ করা হয় না। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে যেখানে-সেখানে। এ কসময় এগুলোর জায়গা হয় পদ্মার বুকে। এছাড়া নগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ড্রেনের পানির সঙ্গে আসে প্লাস্টিক-পলিথিন। সেগুলো জমাট বাঁধে পদ্মার পানিতে। এতে করে মারাত্মক বিপর্যস্ত হচ্ছে পদ্মার পরিবেশ। ফলে দূষণে ম্লান হয়ে পড়ছে পদ্মার সৌন্দর্য।

সরেজমিনে দেখা গেছে, পদ্মায় যতটুকু পানি অবশিষ্ট রয়েছে সেগুলো কচুরিপানায় ছেয়ে গেছে। কচুরিপানার ফাঁকে ভাসে প্লাস্টিক-পলিথিনের আবর্জনা। আর নদীর পাশে দিয়ে স্তূপ আকারে পড়ে আছে পলিথিন, কাগজ, প্লাস্টিকের আবর্জনা আর মুখরোচক খাবারের উচ্ছিষ্ট।

কথা হয় পদ্মাপাড়ের দর্শনার্থী আব্দুল হাকিম ও বদরুদ্দোজার সঙ্গে। তাদের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জে হলেও থাকেন রাজশাহীতে। তারা বলেন, একটু নির্মল বাতাসের জন্য আমরা পদ্মার পাড়ে ছুটে আসি। বন্ধুরা মিলে প্রায়ই ঘুরতে আসি। কিন্তু পদ্মার পরিবেশ নষ্ট হতে বসেছে। বাতাসের সঙ্গে এখন দুর্গন্ধ নাকে লাগে। মুখরোচক খাবারের দোকানের উচ্ছিষ্টগুলো যত্রতত্র ফেলার জন্যই এমন দুর্গন্ধ। পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশের কথা না ভেবে প্রতিদিন এভাবে যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলা হয়।

স্থানীয়রা জানান, নগরের পদ্মা গার্ডেন থেকে শুরু করে আই-বাঁধ পর্যন্ত শহররক্ষা বাঁধের কয়েক কিলোমিটারজুড়ে গড়ে উঠেছে শত দোকান। এগুলোতে ভিড় করে হাজারো মানুষ। সবাই মিলে পরিচ্ছন্নতার নিয়ম করলেও তা মানে না কেউই।

পরিবেশবিদরা বলছেন, প্লাস্টিক বা পলিথিন পচনযোগ্য নয়। দীর্ঘদিন অক্ষত থাকে। বাংলাদেশের আবহাওয়া ও মাটির গুণাগুণের কারণে একটা বীজ মাটিতে দিলে গাছ হয়ে যায়। অন্য দেশে তা সম্ভব নয়। কিন্তু মাটির নিচে এসব পলিথিনের ওপরে গাছ বড় হতে পারে না। মরে যায়, যা পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে।

আর প্লাস্টিক দূষণের কারণে মাছসহ নদীর অন্য জীবের অস্তিত্ব সংকটে। এমনিতে নগরায়ণ ও বৈশ্বিক দূষণে পরিবেশের উপকারী ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র উদ্ভিদ ও প্রাণী হারিয়ে যাচ্ছে। এখনই পরিবেশের দূষণ রোধ করা না গেলে হুমকিতে পড়বে এখানে জীববৈচিত্র্য।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. গোলাম সাব্বির সাত্তার বলেন, প্লাস্টিক ও পলিথিন ডিগ্রেডেবল না। এটি পানি ও মাটি দূষিত করে। এর দূষণ জলচক্র ও খাদ্যচক্রের ভেতরে প্রবেশ করে। সেখান থেকে মাছের মাধ্যমে আমাদের দেহে প্রবেশ করছে। ফলে আমরা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছি।

তিনি আরও বলেন, পদ্মারপাড়ে দোকানিরা উচ্ছিষ্ট, ময়লাগুলো যত্রতত্র ফেলে রাখে। এতে করে আমাদের পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে। ফেলে রাখা প্লাস্টিক-পলিথিনগুলো নদীর পানিতে মিশে শুকিয়ে গেলে চাষাবাদের জন্য ক্ষতিকর হবে।

রাজশাহী পরিবেশ অধিদপ্তরের সিনিয়র কেমিস্ট মিজানুর রহমান বলেন, প্লাস্টিক-পলিথিন পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। আমরা পলিথিন ব্যবহারে মানুষকে নিরুৎসাহিত করি। পলিথিনের ব্যবহার কমিয়ে দূষণ কমানো সম্ভব। এজন্য আমরা বিভিন্ন অভিযানও পরিচালনা করি। আমরা শিগগিরই পদ্মাপাড় পরিদর্শনে যাবে।

রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা শেখ মো. মামুন বলেন, নদীর দূষণরোধে প্রয়োজন জনসাধারণের সচেতনতা বৃদ্ধি। তারা যেন প্লাস্টিক-পলিথিন নদী ও ড্রেনে না ফেলেন সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে। এজন্য সিটি করপোরেশন নানা উদ্যোগ নিয়েছে। ইতোমধ্যে উš§ুক্ত সভা করা হয়েছে। রাতারাতি সবকিছুর বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। ধীরে ধীরে গৃহীত কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ সমস্যা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে বলে আশা করেন তিনি।

পদ্মা নদী দূষণরোধে নগরবাসীকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন রাসিক মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন। একই সঙ্গে মেয়র নগরীর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও পদ্মাপাড়ের সৌন্দর্য বজায় রাখতে নগরবাসীর সহযোগিতা কামনা করেন।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..