মত-বিশ্লেষণ

দেশের অর্থনীতিতে শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা

আবু জাফর মো. সালেহ্ : পরিবর্তনশীল পৃথিবীর সর্বকালের মানুষের জন্য ইসলামে রয়েছে সব বিষয়ের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা ও সমাধান। পৃথিবীর মৌলিক বিষয়গুলোর মধ্যে জীবনজীবিকা তথা মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড মানবজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। ইসলাম এ ব্যাপারে শুধু দিকনির্দেশনামূলকই নয়, এর অবকাঠামোগত দিকও সবিস্তারে উপস্থাপন করেছে। আল্লাহ্ বলেন, ‘বিচরণশীল প্রতিটি প্রাণীর জীবিকার দায়িত্ব মহান আল্লাহ্ নিজের ওপর ন্যস্ত করে নিয়েছেন। (সুরা হুদ-৬)’ তিনি আরও বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা পবিত্র ও হালাল বস্তুসামগ্রী আহার করো, যা আমি তোমাদের রিজিক হিসেবে দান করেছি এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর আল্লাহর, যদি তোমরা তারই ইবাদত করে থাকো (বাকারাহ্-১৭২)।’ মানুষের অর্থনৈতিক জীবন যাতে নিরাপদ, পবিত্র ও হালাল থাকে এ জন্য ‘ব্যবসা-বাণিজ্যকে আল্লাহ্ হালাল করেছেন আর সুদকে করেছেন হারাম। (সুরা বাক্বারাহ্-২৭৫)’ আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন, ‘তিনটি জিনিসের মধ্যে বরকত রয়েছে ১. মুদারাবার (একজনের পুঁজি ও অন্যজনের শ্রম) মাধ্যমে বিনিয়োগ, ২.বাই-মুয়াজ্জালের (বাকিতে কেনাবেচা) মাধ্যমে লেনদেন এবং ৩. নিজে খাওয়ার জন্য গমের সঙ্গে যব মেশানো (ইবনে মাজাহ)।’ ব্যবসা-বাণিজ্যসম্পর্কিত আরও অনেক আয়াত ও হাদিস রয়েছে।

পবিত্র কোরআনে এ ধরনের আয়াত ও হাদিসের আলোকে মানবজীবনাচারকে শুদ্ধ ও পবিত্র রাখতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রাচীনকাল থেকেই সুদমুক্ত হালাল ব্যবসা-বাণিজ্য এবং পরবর্তী সময়ে শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের উদ্ভব হয়েছে।

দেশের মানুষকে একটি হালাল ও গতিশীল অর্থনৈতিক জীবন উপহার দেওয়ার জন্য এ দেশে শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের যাত্রা শুরু ১৯৮৩ সালে। এর পর থেকে খুব দ্রুতই ইসলামি ব্যাংকিংয়ের বিকাশ ঘটেছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে। ক্রমেই সর্বস্তরের মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণে ক্রমবর্ধমান এক শিল্পের মর্যাদা লাভ করে ইসলামি ব্যাংকিং। অল্প সময়েই সব শ্রেণির গ্রাহকের কাছে তা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, যে কারণে মাত্র তিন দশকের মধ্যে দেশে আটটি পূর্ণাঙ্গ শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংক ও দুটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। ব্যাপক জনপ্রিয়তার কারণে অনেক কনভেশনাল ব্যাংকও ইসলামি ব্যাংকিং শাখা বা উইন্ডো খুলে ব্যাপক সাড়া পেয়েছে। বর্তমানে ৯টি কনভেনশনাল ব্যাংকের রয়েছে ১৯টি ইসলামি ব্যাংকিং ব্রাঞ্চ। আর সাতটি কনভেনশনাল ব্যাংকের রয়েছে ২৫টি উইন্ডো। ২০১৮ সাল শেষে দেশের সব ব্যাংকের সর্বমোট শাখা ছিল প্রায় ১০ হাজার ২৮৬টি। এ ছাড়া দুটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামিক ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের (আইএফআইএল) আটটি, হজ ফাইন্যান্সের তিনটি মিলিয়ে আরও ৯টি শাখা রয়েছে। রিলায়েন্স ফাইন্যান্সও ইসলামিক উইন্ডো খোলার অনুমতি পেয়েছে। সম্প্রতি পূবালী ব্যাংক লি. বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক নতুন করে আরও ১৫টি এবং সোনালী ব্যাংক ৪৭টি  ইসলামি ব্যাংকিং উইন্ডোর অনুমোদন পেয়েছ। এ ছাড়া আরও অনেক কনভেনশনাল ব্যাংক পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকে রূপান্তরিত হওয়ার জন্য বা ইসলামি শাখা ও উইন্ডো খোলার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদন করে রেখেছে। আশা করা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন সাপেক্ষে এ সংখ্যা ক্রমেই আরও বাড়বে। অন্যদিকে জানুয়ারি-মার্চ (২০১৯) পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের রিপোর্ট অনুযায়ী দেশের সর্বমোট ব্যাংকের ডিপোজিট ছিল প্রায় ১০,২৩,২০৬.২০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ইসলামি ব্যাংকগুলোর সর্বমোট ডিপোজিট ২,৪২,১১৮.৮০ কোটি টাকা। মোট ডিপোজিট সংগ্রহে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের অংশগ্রহণ ২৩.৬৬ শতাংশ। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সব ব্যাংকের বিনিয়োগ ছিল ৯,৮১,৯৮০ কোটি টাকা। মোট বিনিয়োগে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের অংশগ্রহণ ২,৩৭,২৭৯ কোটি টাকা বা ২৪.১৬ শতাংশ। সুতরাং বাংলাদেশে ইসলামিক ব্যাংকিংয়ের অবদান এখন অনস্বীকার্য এবং অর্থনীতিতে মোট ব্যাংকিং সেক্টরের প্রায় এক-চতুর্থাংশ। উল্লেখ্য, ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে প্রায় ৪৩ শতাংশ রেমিট্যান্স আসে, ২০১৮ সালে যা ছিল প্রায় ১৩,০৭৫ কোটি টাকা।

দেশের অর্থনীতিতে শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিপুল অংশগ্রহণের এ চমকপ্রদ পরিসংখ্যান শুধু দেশেই স্বীকৃত নয়, বিশ্বব্যাপী ইসলামি ব্যাংকিংয়ের জন্য অনুপ্রেরণার বিষয় হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক শরিয়াহ্ স্কলার ড. ইউসুফ আল কারদাভি বাংলাদেশকে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের মডেল বলে উল্লেখ করেছেন। ওআইসি ফিক্বহ্ একাডেমির সাবেক চেয়ারম্যান বিচারপতি আল্লামা তাকি উসমানী বলেছেন, বাংলাদেশ বিশ্বের শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করছে।

মূলত ইসলামি ব্যাংকিং বা ফাইন্যান্সের এই অর্জন সম্ভব হয়েছে পবিত্র কোরআন, হাদিস, ইজমা ও কিয়াস-নিঃসৃত শরিয়াহ্ভিত্তিক নীতি ও পদ্ধতি অনুশীলন এবং পরিপালনের কারণে। ইসলামি ব্যাংক বা ফাইন্যান্স মুদারাবা পদ্ধতিতে আমানত সংগ্রহ করে। আমানতের অর্থ মুশারাকা, ইজারা, বাই-মুরাবাহা, বাই-মুয়াজ্জাল, হায়ার পার্চেজ শিরকাতুল মিলক, বাই সালাম ও বাই ইস্তিসনা প্রভৃতি শরিয়াহ্ অনুমোদিত বিনিয়োগ পদ্ধতিতে বিনিয়োগ করে। এ থেকে অর্জিত মুনাফা ‘ওয়েটেজ’ বা ‘ইনকাম শেয়ারিং রেশিও’ পদ্ধতির ভিত্তিতে আমানত গ্রহীতা ও শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে বণ্টন করা হয়। এখানে টাকার বিনিময়ে টাকার লেনদেন করা হয় না, কারণ টাকা নিজে কোনো ভোগ্য জিনিস নয়, বরং ভোগ্য জিনিস প্রাপ্তির মাধ্যম মাত্র। এজন্য টাকার বিপরীতে কোনো পণ্য ক্রয়, উৎপাদন বা ভাড়ার অস্তিত্ব না থাকলে মূলধনের অতিরিক্ত দেওয়া-নেওয়াকে ইসলাম সমর্থন করে না। তাই ইসলামি বিনিয়োগ পদ্ধতিতে গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী তার কাক্সিক্ষত মালামাল ক্রয়ে বা উৎপাদনে অর্থায়ন করা হয়। অথবা ভাড়ায় বাড়ি, ফ্ল্যাট, মেশিনারিজ ও গাড়ি প্রভৃতিতে বিনিয়োগ করা হয়। এতে সহজেই বিনিয়োগ করা পণ্যের চাহিদা বাড়ে। একই সঙ্গে নতুন করে উৎপাদনের চাহিদার সৃষ্টির বিষয়টি অব্যাহত থাকে। এভাবে অর্থনীতির গতিপথ উৎপাদনমুখী হয়ে ওঠে। আর উৎপাদনমুখী অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতির সুযোগও কমে যায়, যে মুদ্রাস্ফীতি দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় সমস্যা। শরিয়াহ্ভিত্তিক অর্থায়নের ক্রমবর্ধমান চর্চা না থাকলে মুদ্রাস্ফীতির এই হার আরও আশঙ্কাজনকভাবে ঊর্ধ্বমুখী থাকত।

শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ যে পদ্ধতিতেই হোক তাতে যদি শতভাগ শরিয়াহ্ কমপ্লায়েন্স বা শরিয়াহ্ পরিপালন থাকে, তাহলে সেক্ষেত্রে মন্দ বিনিয়োগ বা ঋণখেলাপি হওয়ার শঙ্কা অনেকটা কমে যায়। এ কারণে শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় খেলাপি বিনিয়োগের মাত্রা অনেক কম।

বিনিয়োগ যদি মুশারাকা বা অংশিদারিত্বের ভিত্তিতে হয়, তাহলে মূলধনের রেশিও অনুযায়ী অংশীদারদের মধ্যে লাভ-ক্ষতি বণ্টিত হয়। সে ক্ষেত্রে তো ঋণখেলাপি হওয়ার শঙ্কা প্রায় নেই বললেই চলে। তবে পরিপার্শ্বিক অবস্থার কারণে মুদারাবা বা মুশারাকায় খুব বেশি বিনিয়োগ করা যায় না। সেটা করা গেলে দেশের অর্থনীতির চিত্র একেবারেই পাল্টে যেত। এরই মধ্যে দেশে মুদারাবা নীতিতে পরিচালিত ইসলামিক বন্ড ধীরে ধীরে মুদ্রাবাজারে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। আইনের অনুকূলতা পেলে সুক্বুক বা বন্ড সংকটময় পরিস্থিতিতে তারল্য প্রবাহের এক কার্যকর মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।

শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, বিনিয়োগের ওপর আরোপিত মুনাফায় চক্রবৃদ্ধির কোনো সুযোগ নেই। এতে কনভেনশনাল ব্যাংকের তুলনায় ইসলামি ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান মুনাফা লাভে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিনিয়োগ পদ্ধতি যদি বাই-মুয়াজ্জাল বা বাকিতে পণ্য বিক্রির বিষয় হয়, সে ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করা পণ্যের জন্য একটা বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। নির্ধারিত সময়ে গ্রাহক তা পরিশোধ করতে না পারলে অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান বিক্রয়মূল্যের অতিরিক্ত কোনো মুনাফা গ্রাহকের কাছ থেকে আদায় করতে পারে না, তবে ক্ষতিপূরণ স্বরূপ কিছু আদায় করতে পারে। কিন্তু সেটাও কোম্পানির মূল আয়ে নেওয়া যায় না। জনকল্যাণমূলক কাজে সেটা ব্যয় করতে হয়।

আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা যেতে পারে যে, টাকার বিনিময়ে টাকার লেনদেন করতে পারে না বলে শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান ‘কলমানি মার্কেট’ থেকে প্রতিযোগিতামূলক মুনাফায় টাকা বা আমানত নিতে পারে না। শরিয়াহ্ভিত্তিক কোনো পদ্ধতি একে সমর্থন করে না। এতে প্রচলিত ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান আমানত সংগ্রহে বেশ পিছিয়ে থাকে। এ জন্য শরিয়াহ্ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে একটি আন্তঃবাজার সম্পর্ক স্থাপন করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান ঢালাওভাবে অর্থায়ন করতে পারে না। শুধু শরিয়াহ্সম্মত পদ্ধতি ও প্রজেক্টে অর্থায়ন করতে পারে। এ ধরনের সীমাবদ্ধতা কনভেনশানাল ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নেই।    

বিশেষ করে শরিয়াহ্ভিত্তিক দুটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামিক ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড ও হজ্জ ফাইন্যান্সের জন্য বাজার প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা আরও বেশি চ্যালেঞ্জিং, কারণ আর্থিক প্রতিষ্ঠান হওয়াতে আমানত গ্রাহকদের ডিপোজিটের মুনাফা ব্যাংক থেকে বেশি দিতে হয়। আবার বিনিয়োগ গ্রাহক থেকেও মুনাফা নিতে হয় বেশি। ব্যাংকের তুলনায় আর্থিক প্রতিষ্ঠনগুলোর শাখার সংখ্যাও অনেক কম। অন্যান্য সীমাবদ্ধতা তো আছেই। এত সীমাব্ধতা ও চ্যালেঞ্জের মধ্যেও শরিয়াহ্ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান দুটি বাজারে বেশ ভালোভাবেই টিকে আছে। বিশেষ করে ইসলামিক ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড প্রথম শরিয়াহ্ভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা নিয়ে বাংলাদেশের প্রথম সারির আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অবস্থান করছে এবং প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিকভাবে দেশসেরা আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও উদ্ভাবনী শরিয়াহ্ পরিপালনে শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতিলাভসহ চারটি ইন্টারন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ডও পেয়েছে।   

এতসব সীমাদ্ধতার পরও শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশেই নয়, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দারুণ অগ্রসরমাণ ও সবচেয়ে সম্ভাবনাময় এক শিল্পের মর্যাদায় সগৌরবে বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত হচ্ছে। আজ মুসলিম সংখ্যালঘু দেশেও শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংকিং জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। অমুসলিম মালিকানাধীন ব্যাংক বা ফাইন্যান্সিয়াল কোম্পানিও শরিয়াহ্ভিত্তিক উইন্ডো বা শাখা খুলছে। যেমন স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ও এইচএসবিসি। ব্রিটেনে ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় ইসলামি ব্যাংক অব ব্রিটেন। লন্ডন, বার্মিংহাম ও ম্যানচেস্টারে এর শাখা রয়েছে। জার্মানির ম্যানহাইম শহরেও খোলা হয়েছে ইসলামি ব্যাংক। শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের এই অগ্রসরমাণ অবস্থার প্রতি লক্ষ রেখে স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড পুওরস মন্তব্য করেছে, ‘ইসলামি ব্যাংকিং এরই মধ্যে প্রচলিত ব্যাংক ব্যবস্থার প্রকৃত বিকল্প হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। মূলত চলমান বৈশ্বিক আর্থিক সংকটে বিপর্যস্ত প্রচলিত অর্থায়ন পদ্ধতির যোগ্যতম বিকল্প হিসেবে ইসলামি অর্থায়ন শিল্প আত্মপ্রকাশ করেছে।’ 

দেশে ইসলামি শরিয়াহ্-পরিপালিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বিকাশ আরও ব্যাপক আকারে হলে যে সুফলগুলো অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করবে, তার মধ্যে অন্যতম হলোÑসামগ্রিকভাবে হালাল জীবিকা নিশ্চিত হবে, অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতি কমাবে, সমাজে সাম্য ও সমতা আনার মাধ্যমে বৈষম্য বিদূরিত হবে, আয় বা সম্পদবণ্টনে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে, ঋণখেলাপি বা মন্দ বিনিয়োগের প্রবণতা কমে যাবে, মুষ্টিমেয় লোকের হাতে সম্পদ কুক্ষিগত হওয়ার মাত্রা ক্রমেই কমতে থাকবে, মজুতদারি ও ফটকাবাজির মতো কারবারের পথ সংকুচিত হয়ে আসবে এবং ভোগবাদিতার অসম ও অসৎ প্রতিযোগিতা নিরুৎসাহিত হবে।

বাংলাদেশ অপার সম্ভাবনার দেশ। এ দেশের অধিকাংশ মানুষ ধর্মপ্রাণ ও হালাল রুজিতে বিশ্বাসী। স্বাভাবিকভাবেই দেশের মানুষের মনন ও চিন্তা ইসলামি ব্যাংকিংয়ের এক উর্বর ক্ষেত্র। প্রয়োজন শুধু দেশীয়ভাবে সবাইকে এর সঙ্গে সম্পৃক্ত করা, এর সেবাকে মাঠপর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। এর জন্য দরকার পরিপূর্ণ ইসলামি ব্যাংকিং আইন। মালয়েশিয়া, তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশে ইসলামি ব্যাংকিং চালু করার আগে ইসলামি ব্যাংকিং আইন চালু করা হয়। থাইল্যান্ডে ইসলামি ব্যাংকিং চালু হয় ২০০৩ সালে। আর ইসলামি ব্যাংকিং আইন পাস করা হয় ২০০২ সালে।

বর্তমানে বিশ্ব অর্থব্যবস্থায় শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা অত্যন্ত জনপ্রিয় ব্যাংকিং ব্যবস্থার মর্যাদা পাচ্ছে। অর্থনীতিতে এর উপযোগিতা ও পদ্ধতিগত দৃষ্টিভঙ্গির জন্য এটি বিশ্বব্যপী দ্রুত বর্ধনশীল ব্যাংকিং ব্যবস্থা হিসেবে স্বীকৃত হচ্ছে। বিশ্বের সব শ্রেণির মানুষের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির মতো সামাজিক সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত করতে ভূমিকা রাখছে ইসলামি ব্যাংকিং। মূলধারার অর্থনীতিতে গ্রামীণ তথা প্রত্যন্ত অঞ্চলের পিছিয়ে পড়া মানুষদের লেনদেনে অন্তর্ভুক্তি এবং ধর্মপ্রিয় মানুষদের জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য ও সুদমুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলার কারণে শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংক ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আকর্ষণ বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। এখন প্রয়োজন গতিশীল নেতৃত্বের মাধ্যমে সঠিক অভিন্ন পূর্ণাঙ্গ আইন ও বিধিবিধানের অধীনে বাংলাদেশের ইসলামিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার শক্ত কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা। অবশ্য ২০১১ সালে অর্থ মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি ইসলামি ব্যাংকগুলোর বিষয়ে একটি বৈঠকে  এ-সংক্রান্ত আইনের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করেন। এ-সংক্রান্ত পরিপূর্ণ আইন পাস হলে শরিয়াহ্ভিত্তিক আর্থিক কার্যক্রম সব সীমাবদ্ধতাকে ছাপিয়ে শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্ব অর্থনীতিতে এক নতুন ইতিহাসের সৃষ্টি করবে ইনশাআল্লাহ্।

ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইসলামিক ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন
ট্যাগ »

সর্বশেষ..